কেবল সুখ বা আনন্দই নয়, দুঃখ বিষাদ বিপদ আপদও চিরস্থায়ী হয় না। বিপর্যয় দুর্দিন প্রভৃতি আসে আবার চলেও যায় কালের নিয়মে। মানুষ তৎপর হলে দুঃসময় কেটে যায় দ্রুত। ডুয়ার্সকে ঘিরে উত্তরবঙ্গে যে প্রাকৃতিক বিপর্যয় নেমে এসেছে সেটাও কাটিয়ে উঠছি আমরা। আবহাওয়া আপাতত অনুকূল। সড়ক এবং ট্রেন যোগাযোগও স্বাভাবিক হয়ে আসছে। উত্তরবঙ্গের অর্থনীতি বহুলাংশে পর্যটন নির্ভর। তাই ওই অঞ্চলের জনজীবনে স্বাভাবিকতা ফেরাতে পর্যটনকে ছন্দে ফেরানো আবশ্যক। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে রাজ্যের মা-মাটি-মানুষের সরকার তৎপর হতেই অধিকাংশ পর্যটন কেন্দ্রও দ্রুত ছন্দে ফিরছে। বলা বাহুল্য, বিপর্যয়ের মলিন স্মৃতি কিন্তু রাতারাতি উবে যাওয়ার নয়। প্রকৃতির রোষের চার-পাঁচদিন পর তরাই ডুয়ার্সসহ বাংলার পাহাড়ি অঞ্চলে ধ্বংসের চিহ্ন বিদ্যমান। উল্লেখ্য, পাহাড়ের রানি দার্জিলিংয়েই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সর্বাধিক। প্রাথমিক হিসেব অনুযায়ী, ওই জেলায় ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছে। পাহাড়ের মানুষকে ভালোভাবে বাঁচাতে হলে এই ক্ষতি অবিলম্বে পূরণ হওয়া জরুরি। পার্শ্ববর্তী একাধিক জেলার ক্ষতি যোগ করলে অঙ্কটি আরও বিপুল!
এত বড়ো কাজ রাজ্য সরকারের একার সীমিত আর্থিক ক্ষমতায় সম্পন্ন হওয়া সম্ভব নয়। কেন্দ্রকেও এই ব্যাপারে দরাজ এবং আন্তরিক হতে হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় এই যে, বাংলার এই ভয়াবহ বিপদেও মোদি সরকার রা কাড়ছে না। দার্জিলিং লোকসভা কেন্দ্র দীর্ঘদিন কেন্দ্রের শাসক দলের দখলে। স্বভাবতই সেখানকার পীড়িত মানুষজন কেন্দ্রের আন্তরিক সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন। শুধু এটাই নজরে আসছে যে, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং রাজ্যের শাসক দলের নেতা-মন্ত্রীরা যখন দুর্গত মানুষজনকে বাঁচাতে জান লড়িয়ে কাজ করছেন, তখন বিজেপি নেমেছে সংকীর্ণ রাজনীতির খেলায়। তাদের এমপি-এমএলএ-রা ছুটছেন বিপর্যস্ত এলাকা পরিদর্শনে! সেখানে পৌঁছে যাচ্ছেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীও। বিজেপির নেতাকর্মীদের ভাবখানা এই যে, তাঁরা মানুষের পাশে দাঁড়াবার কমপিটিশনে অবতীর্ণ। কিন্তু ‘ফটোশ্যুটওয়ালাদের’ দেখে স্থানীয় মানুষ উলটে খেপে যাচ্ছেন। তাঁরা ধরে নিচ্ছেন যে তাঁদের দুর্দিনকে সামনে রেখে প্রচারসর্বস্ব গেরুয়াবাহিনী ভোটের বাজার করতে নেমে পড়েছে। ব্যাপারটাকে তাঁরা তাঁদের কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে হিসেবেই দেখছেন। এনিয়ে ইতিমধ্যে উত্তরবঙ্গের একাধিক স্থানে চরম বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়েছে। তাতে সুরাহার পরিবর্তে, রাজ্য সরকারের ত্রাণকার্যই ব্যাহত হওয়ার উপক্রম হয়। তর্কের খাতিরে ধরা গেল, গেরুয়া শিবির বা দিল্লিওয়ালারা বাংলার মানুষের পাশে দাঁড়াবার জন্য আকুল। কিন্তু তার প্রমাণ কোথায়? যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পায়ের নীচে সর্ষে, যিনি বছরভর দুনিয়া
চষে বেড়ান, উত্তরবঙ্গে বেনজির বিপর্যয়ে পড়া মানুষের পাশে
তাঁকে দেখা যাচ্ছে না কেন? বেশ, তিনি এত ব্যস্ত যে আসতে পারছেন না, কিন্তু তাঁর সরকারের অন্য মন্ত্রীরা এসেও তো উপযুক্ত আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণা করতে পারেন? তবে, গালভরা প্যাকেজ ঘোষণা কোনও কাজের কথা নয়। না আঁচালে এই সরকারের কোনও কিছুতেই বিশ্বাস নেই। কারণ কথার খেলাপে মোদি সরকার ইতিমধ্যেই একগুচ্ছ বিশ্ব রেকর্ডের অধিকারী!
তাই এখনই উপযুক্ত আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণা এবং তার দ্রুত বাস্তবায়নই প্রত্যাশা করেন পাহাড়ের মানুষ। মনে রাখতে হবে, বর্ষার বিদায় আসন্ন। বর্ষার আবহ কেটে গেলেই পাহাড় এবং সন্নিহিত অঞ্চলে ভয়ানক ঠান্ডা নেমে আসবে। তার আগে, স্বল্পকালের মধ্যেই ঘরবাড়ি নির্মাণ এবং মেরামত না-হলে পাহাড়বাসীর কষ্ট যে দুর্বিষহ হয়ে উঠবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। দার্জিলিংয়ের পাশপাশি বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছে জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার ও কোচবিহার জেলারও বিস্তীর্ণ অঞ্চল। সমগ্র উত্তরবঙ্গের সড়ক এবং সেতুগুলিকে এখনই স্বাভাবিক করে তোলা দরকার। জল ও বিদ্যুৎ সরবরাহ, হাসপাতাল, বাজার প্রভৃতির দিকেও সমান নজর দেওয়া প্রয়োজন। আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদান হওয়া উচিত সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে। ইতিমধ্যেই বিজেপি নেতারা তরজায় নেমে গিয়েছেন। তাতে রাজ্য প্রশাসনের সেবাকার্য ব্যাহত হলে মানুষের দুর্গতি বাড়বে মাত্র, ঘোলা জলে মাছ ধরার গেরুয়া মতলব কোনোমতেই সফল হবে না।