গত আগস্টে মোদি যেন সম্মুখসমরে! ট্রাম্পের বেনজির শুল্কযুদ্ধের জবাবে মোদির সাফ কথা ছিল, ‘কৃষকদের স্বার্থের সঙ্গে কোনোরকম আপস নয়! বাড়তি শুল্ক চাপলেও বাণিজ্যচুক্তিতে নমনীয় হবে না সরকার।’ কিন্তু সেই দৃঢ় অবস্থান কি বাস্তবে রক্ষা করতে পারল মোদির ভারত? বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে গতবছর থেকে নয়াদিল্লি এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে আলোচনা চললেও ভারতের উপর একাধিক দফায় বিপুল শুল্ক আরোপের ঘোষণা করেন ট্রাম্প। শেষমেশ ব্যাপারটা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে মার্কিন মুলুকেরও একাধিক রাজনীতিক এবং অর্থনীতির পণ্ডিত প্রমাদ গুনতে শুরু করেন। সেই আবহে মুখরক্ষার জন্য ভারতের কৃষকদের স্বার্থরক্ষার কথা বলেই একদা ‘বন্ধু’ ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বার্তা দেন নরেন্দ্র মোদি। আগেই নয়াদিল্লির একাধিক সূত্র মারফত জানানো হয়েছিল, ভারত-মার্কিন বাণিজ্যচুক্তির প্রধান অন্তরায় কৃষি। ওইসঙ্গে যোগ হয়েছিল দুগ্ধজাত দ্রব্য বিষয়ে দুই দেশের মতানৈক্য। বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে নয়াদিল্লি এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে আলোচনা চললেও ভারতের উপর দু-দফায় মোট ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা করেন ট্রাম্প। ওই আবহে কৃষকদের স্বার্থরক্ষার কথা বলে মোদি আমেরিকাকে যথোচিত বার্তা দিলেন বলেই ভাবা হয়েছিল। গত আগস্টে নয়াদিল্লিতে এম এস স্বামীনাথন শতবার্ষিকী আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ভাষণ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কৃষকদের স্বার্থ আমাদের কাছে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পেয়ে থাকে। ভারত কখনো কৃষক, গোপালক ও মৎস্যজীবীদের স্বার্থের সঙ্গে আপস করবে না।’ তারপরেই তাঁর ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্য ছিল, ‘আমি জানি, ব্যক্তিগতভাবে এর জন্য আমাকে চড়া মূল্য চোকাতে হবে। কিন্তু আমি তার জন্য প্রস্তুত রয়েছি। কৃষক, পশুপালক ও মৎস্যজীবীদের স্বার্থরক্ষায় ভারত প্রস্তুত।’
রাশিয়া থেকে তেল আমদানির অপরাধে ওইমাসে ভারতের ঘাড়ে অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক চাপানোর কথা ঘোষণা করেন ট্রাম্প। বাড়তি ২৫ শতাংশের ফলে গত ২৭ আগস্ট থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানি করার জন্য ভারতকে ৫০ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়েছে। অতঃপর ট্রাম্পের ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্য ছিল, রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখার চড়া মাশুল গুনতে হবে সংশ্লিষ্ট সমস্ত দেশকেই। সব মিলিয়ে ভারত-মার্কিন বাণিজ্যচুক্তির সামনে চীনের প্রাচীরই যেন দণ্ডায়মান ছিল সেইসময়। অবশেষে সেই বহু প্রতীক্ষিত ও বিতর্কিত চুক্তি সম্ভব হল। কিন্তু বিনিময়ে কী খোয়াতে হল ভারতকে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের কৃষকদের স্বার্থ! অন্নদাতাদের স্বার্থসুরক্ষার সেই দৃঢ়তা তাহলে কোথায় গেল? এই প্রশ্ন এখন উঠবেই। আমেরিকার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যচুক্তির অন্যতম প্রধান যে শর্ত মোদিরা মেনে নিয়েছেন তা হল, আমেরিকার কৃষিপণ্য ভারতে ঢুকবে প্রায় অবাধে! আবার একই সঙ্গে পুতিনের দেশ থেকে তেলও কেনা যাবে না এবং ট্রাম্পের দেশ থেকেই পেট্রপণ্য ক্রয়ের শর্ত মানতে হবে ভারতকে। সব মিলিয়ে ভারতের চরম স্বার্থহানির সত্যটাই স্বীকার করেছে মোদির ভারত। আরো এক মারাত্মক প্রবণতার পুনরাবৃত্তি লক্ষ করা যাচ্ছে পরিতাপের সঙ্গেই, ভারত সরকারের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দেশের প্রধানমন্ত্রী উচ্চারণ করার আগেই তা সদর্পে ঘোষণা করে দিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট!
‘অপারেশন সিন্দুর’ দুম করে থামানো দিয়েই যার শুরু। এরপর শোনা গিয়েছিল রাশিয়ার তেল ক্রয় হ্রাস প্রসঙ্গ। এবার ভারত-মার্কিন বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে ট্রাম্প একতরফাভাবে একই কাণ্ড করেছেন। সোমবার রাতে ট্রাম্প ভারত-মার্কিন বাণিজ্যচুক্তির কথা প্রথম ঘোষণা করেন। এরপর মোদি জানান যে, বাণিজ্যচুক্তি চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছে এবং এই ব্যাপারে ট্রাম্পের সঙ্গেও কথা হয়েছে তাঁর। তবে সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হল মার্কিন কৃষিসচিব ব্রুক রোলিন্সের মঙ্গলবারের বিবৃতি, ‘এই বাণিজ্য চুক্তির সুবাদে ভারতের বিপুল বাজারে এবার মার্কিন কৃষিপণ্য অবাধে প্রবেশ করতে পারবে। ২০২৪ সালে ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ১০৩ কোটি ডলার। এবার ভারতের বিরাট জনসংখ্যার বাজারে মার্কিন কৃষিপণ্য বিক্রয়ের বৈপ্লবিক সুযোগ এনে দেবে এই চুক্তি।’ আরো বিস্ফোরক সংযোজন রোলিন্সের, ‘আমেরিকার কৃষিবাণিজ্যে এত বড়ো জয় এটাই প্রথম।’ দলীয় সেনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের ট্রাম্পস্তুতি, ‘ওয়েল প্লেইড প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এবার বাকি দেশগুলিও আপনার বার্তা পেয়ে যাবে। তারাও ভারতের পথে হাঁটবে শীঘ্রই।’ এই অপমান কোনো ব্যক্তি নরেন্দ্র মোদির নয়, এই অবমাননা ভারত রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী পদের এবং অবশ্যই সারা ভারতের। এটা ট্রাম্পের কাছে নির্লজ্জ আত্মসমর্পণ বইকি! সজ্ঞানে দেশের এই সর্বনাশের বিরুদ্ধে আত্মমর্যাদাসম্পন্ন প্রতিটি ভারতীয়ের প্রতিবাদ জানানো কর্তব্য। সরকারের উচিত, অবিলম্বে দেশবাসীকে সত্যাসত্য অবগত করা।