Bartaman Logo
১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

দ্বিতীয় সন্তান এলে প্রথম সন্তান যেন অবহেলিত না হয়

পরিবারে দ্বিতীয় সন্তান আসা নিঃসন্দেহে আনন্দের। প্রথমবার যে ভয় ও উদ্বেগ কাজ করে, দ্বিতীয়বার তা যেন অনেকটা সহজ হয়ে যায় দম্পতির কাছে। তবে বড়ো সন্তানের কাছে সেটি একেবারে নতুন অভিজ্ঞতা।

দ্বিতীয় সন্তান এলে প্রথম সন্তান যেন অবহেলিত না হয়
  • ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

ভাই বা বোন হলে প্রথম সন্তানের জন্য মা-বাবার সময় খানিক কমে। তবে শিশুটির যেন মনে না হয় সে অবহেলিত। কীভাবে সামলাবেন পরিস্থিতি? পরামর্শে বিশিষ্ট সাইকোলজিস্ট তথা ফ্যামিলি থেরাপিস্ট অনন্যা সেনগুপ্ত

Advertisement

পরিবারে দ্বিতীয় সন্তান আসা নিঃসন্দেহে আনন্দের। প্রথমবার যে ভয় ও উদ্বেগ কাজ করে, দ্বিতীয়বার তা যেন অনেকটা সহজ হয়ে যায় দম্পতির কাছে। তবে বড়ো সন্তানের কাছে সেটি একেবারে নতুন অভিজ্ঞতা। এতদিন বাবা-মাকে সে কেবল নিজের বলে ভাবত। হঠাৎ তাঁদের ভালোবাসা, সময় ও মনোযোগ ভাগ করে নিতে হবে— এই ভাবনা থেকেই তৈরি হয় নিরাপত্তাহীনতা, অভিমান বা রাগ। তাই দ্বিতীয় সন্তান আগমনের পাশাপাশি প্রথম সন্তানকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করাও অত্যন্ত জরুরি। কীভাবে তৈরি করবেন বড়ো সন্তানকে? 

 অনুভূতি বুঝুন
ভাই বা বোন আসছে শুনে বড়ো সন্তান ভীষণ আনন্দ পায়। ‘আমি দাদা বা দিদি হব’, ‘ওর সঙ্গে খেলব’, ‘ওকে আমি দেখে রাখব’... এমন নানা চিন্তাভাবনা ওদের মাথায় চলতে থাকে। তেমনই ভয়ও তৈরি হতে পারে। মনে হতে পারে, ‘বাবা-মা আমাকে আর আগের মতো ভালোবাসবে না’, ‘মা আমাকে সময় দেবে না’, বা ‘আরেকটা বেবি কেন আমাদের সঙ্গে থাকবে?’ অনেক শিশুর ক্ষেত্রে দেখা যায় হঠাৎ ছোটোদের মতো করে কথা বলছে, অতিরিক্ত বায়না করছে, বিছানায় প্রস্রাব করে দিচ্ছে, বেশি কাঁদছে বা মনোযোগ আকর্ষণের জন্য নানা আচরণ করছে। এই সময় ওদের সঙ্গে কথা বলুন। শিশুর মতামতকে গুরুত্ব দিন। 

 গুরুত্বপূর্ণ সদস্য
জন বোলবির তত্ত্ব অনুযায়ী, শিশুর সঙ্গে পরিবারের বন্ডিং যেন ভালো হয়। বাচ্চাটি যেন বাড়িতে নিরাপদ অনুভব করে। তাহলেই নতুন সদস্যকে গ্রহণ করা তার জন্য তুলনামূলক সহজ হয়। দ্বিতীয় সন্তান আসার আগে প্রথম সন্তানকে বোঝাতে হবে, নতুন ভাই বা বোন এলেও তার জায়গা বদলাবে না। কখনো বলবেন না, ‘তুমি তো বড়ো হয়ে গিয়েছ, এখন থেকে সবকিছু ছোটোটাকে দিতে হবে।’ কারণ কয়েকদিন আগে সে নিজেই পরিবারের ছোটো সদস্য ছিল। একদিনে তাকে বড়ো হয়ে যাওয়ার দায়িত্ব দেওয়া যায় না। বরং বলা যায়, ‘তুমি আমাদের কাছে ছোটোই থাকবে। তোমার ভাই বা বোন তোমাকে পেয়ে ভাগ্যবান।’ তাকে বোঝান, সেও পরিবারের এক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। 

ছোটো ছোটো সিদ্ধান্ত নিক 
ভাই বা বোনের জামা, খেলনা বা প্রয়োজনীয় জিনিস কেনার সময় বড়ো সন্তানের সাহায্য নিন। ‘নীল জামা নাকি লাল, কোনটা নেব?’ এই ধরনের প্রশ্ন করুন তাকে। ওর মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করবেন। ভাই বা বোনের বোতল এগিয়ে দেওয়া, উপহার বাছাইয়ে সাহায্য করা, এমন ছোটো ছোটো দায়িত্ব ওকে দেওয়াই যায়। তবে দায়িত্ব যেন কখনো বোঝা না হয়ে ওঠে। সাহায্য করলে ওকে ধন্যবাদ দিন, প্রশংসা করুন। 

 সময় দিন
সদ্যোজাতকে নিয়ে মা ব্যস্ত থাকবেন, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই সময় প্রথম সন্তান যেন ক্রমাগত উপেক্ষিত না হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে। প্রতিদিন অল্প হলেও তার সঙ্গে কথা বলা, গল্প করা, খেলার সময় রাখা জরুরি। বড়ো সন্তান কাঁদলে ‘তুমি তো বড়ো, বাচ্চাদের মতো কাঁদছ কেন?’ বলবেন না। বরং তার অনুভূতিকে গুরুত্ব দিন। বলুন, ‘আমি বুঝতে পারছি, তোমার মনখারাপ।’ ভাই বা বোনের জন্য বড়ো সন্তানকে বারবার চুপ করিয়ে না দিয়ে বলা যায়, ‘চলো, আমরা অন্য ঘরে গিয়ে একটু খেলি।’ মনে রাখবেন, মায়ের মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকলে তার প্রভাব দুই সন্তানের উপরই পড়ে। তাই বিশ্রাম নেওয়া, স্বামীর সঙ্গে সময় কাটানো ও পরিবারের সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি। 

 বাবা ও পরিবারের অন্যদের ভূমিকা 
সন্তানকে বড়ো করা শুধু মায়ের দায়িত্ব নয়। বাবা বাড়ি ফিরে কিছুটা সময় ছোটো শিশুর দায়িত্ব নিলে মা বড়ো সন্তানের সঙ্গে সময় কাটাতে পারেন। বাবারও বড়ো সন্তানের সঙ্গে আলাদা সময় কাটানো উচিত। ঠাকুরমা, ঠাকুরদা বা পরিবারের অন্য সদস্যরাও পড়াশোনা, খেলাধুলা বা দৈনন্দিন কাজে প্রথম সন্তানকে সময় দিতে পারেন। ‘ভাই বা বোন হয়েছে বলে ওর পড়াশোনা খারাপ হয়েছে’, এই ধরনের মন্তব্য করা উচিত নয়।

 শাস্তি নয় 
দ্বিতীয় সন্তান আসার পর বড়ো সন্তানের আচরণে কিছু পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। এই সময় বকাঝকা বা শাস্তি দিয়ে তা বন্ধ করবেন না। ওই মুহূর্তে ওকে শান্ত করুন। প্রয়োজনে জড়িয়ে ধরুন, চোখে চোখ রেখে কথা বলুন, ডিপ ব্রিদিং করান। শান্ত হওয়ার পর বোঝানো যায়, ওর আচরণে কী সমস্যা হয়েছে। ফিজিক্যাল পানিশমেন্ট সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলা উচিত। বাবা-মা নিজেরাই যদি রাগের সময় চিৎকার, মারধর বা আগ্রাসী আচরণ করেন, শিশুও সেটাই শিখবে। তাই সন্তানদের সামনে বাবা-মায়ের সংযত থাকাই বাঞ্ছনীয়। দ্বিতীয় সন্তানের সঙ্গে অতিরিক্ত তুলনাও করবেন না। 

 প্রতিযোগিতা নয়
‘মা ভাইকে বেশি ভালোবাসে’, ‘দেখ, ও কত ভালো রেজাল্ট করছে’— এমন মজা বা তুলনা থেকেই ভবিষ্যতে সিবলিং রাইভলরি বাড়ে। পরিবারে যেন দু’জনেই সমান গুরুত্ব পায়। একে অপরের কাজে দু’জনকেই যুক্ত করুন। যে কোনো জিনিস শেয়ার করতে শেখান। 

 কখন দ্বিতীয় সন্তানের পরিকল্পনা করবেন না? 
বড়ো সন্তানের স্কুল পরিবর্তন, উঁচু ক্লাসে ওঠা বা অন্য কোনো পরিবর্তনের সময় তার মানসিক চাপ এমনিতেই বেশি থাকে। সেই সময় নতুন সন্তান এলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। একইভাবে পড়াশোনায় হঠাৎ অবনতি, মনোযোগের সমস্যা, অতিরিক্ত চঞ্চলতা দেখা গেলে আগে সেগুলি সামলানো জরুরি। দুই সন্তানের জন্মের মধ্যে পর্যাপ্ত ব্যবধান রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় দুই থেকে তিন বছরের ব্যবধান শিশুর যত্ন এবং মায়ের শারীরিক-মানসিক সুস্থতার জন্য প্রয়োজন। 

দ্বিতীয় সন্তান আসার পর প্রথম সন্তানের যেন মনে না হয়, তার জায়গাটি কেউ কেড়ে নিয়েছে। ওকে বোঝাতে হবে ভালোবাসা ভাগ হয় না। এই দায়িত্ব অভিভাবকের। পরিবারের। 
শান্তনু দত্ত 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ