Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ধর্ষণ, খুন যখন রাজনীতির নিয়ন্ত্রক

ধর্ষণ, খুন যখন রাজনীতির নিয়ন্ত্রক
  • ৬ জুলাই, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

হিমাংশু সিংহ: জগৎ সংসার, সভ্যতা যতই কেতাদুরস্ত হোক, ৩৫ বছরের যুবকের নিজের বাবার নাম ভুলে যাওয়া উচিত নয়। এক ছাদের তলায় ধরা বিশ্বায়নের যুগেও। কিন্তু বামপন্থীরা নিজেদের মতো করে ইতিহাসকে হাজির করতে চিরদিনই আত্মবিস্মৃতিতে আক্রান্ত হতে ভালোবাসে। সেই সংক্রামক ‘অসুখ’কে সযত্নে ছড়িয়ে দিতে ইদানীং যখন গেরুয়া শিবিরের সঙ্গে ক্রমাগত প্রতিযোগিতা চলছে, তখন বুঝতে অসুবিধা হয় না সুবিচার চাওয়ার তুলনায় মর্মান্তিক ঘটনার ঘাড়ে চেপে একটু প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠাই দু’তরফেরই প্রধান লক্ষ্য। আর জি কর থেকে শুরু করে সাউথ ক্যালকাটা ল’ কলেজের ধর্ষণের ঘটনায় তাঁরা যখন শিরা ফুলিয়ে প্রতিবাদে শামিল হন তখন বানতলার অনীতা দেওয়ান, উমা ঘোষ কিংবা নন্দীগ্রামের রাধারানি আড়ির নৃশংস ধর্ষণ ও খুনের কাহিনি আর মনে রাখতে চান না। মনে পড়ে না সিঙ্গুরের তাপসী মালিকের কথাও। নন্দীগ্রামের ১৪ মার্চের গণহত্যার নির্মম ঘটনাও ভোলাতে মরিয়া। কিংবা আরও পিছনের সাঁইবাড়ির হত্যাকাণ্ড। সেই অত্যাচারীরাই আজকের অকিঞ্চিৎকর বিরোধী। কমতে কমতে বিধানসভায় বামেদের একজন বিধায়কও নেই। স্বভাবতই মানুষকে তাদের অতীত কীর্তিকলাপের কথা ভুলিয়ে ভেসে ওঠার শেষ চেষ্টা। নাহলে শূন্যেই থেমে থাকতে হবে চিরকাল!

Advertisement

তাদের কিছুতেই মনে পড়ে না ৭ জানুয়ারি ১৯৯৩-এর পৈশাচিক ঘটনা। এক ধর্ষিতা নারীর হয়ে প্রতিবাদ জানাতে সটান রাইটার্সে মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর ঘরের বাইরে ধর্না দিয়েছিলেন তৎকালীন বিরোধী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মাননীয় জ্যোতি বসু কর্ণপাত না করেই পুলিস দিয়ে বলপূর্বক মমতাকে সেদিন মহাকরণ থেকে টেনে হিঁচড়ে চুলের মুঠি ধরে বের করে দিয়েছিলেন। ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের উপর পুলিসের গুলিচালনা এবং তাজা তেরো যুবকের মৃত্যুবরণের অধ্যায়কেও একগঙ্গা জল ঢেলে ফিকে করতে চেষ্টার ত্রুটি নেই। বিলিতি কমিউনিস্ট জ্যোতি বসুর কাছে সবই ছিল সামান্য, ‘এরকম তো কতই হয়’ গোছের নিরামিষ! অথচ তাঁরই উত্তরসূরিরা রাজনীতিতে ভেসে থাকতে আজ পান থেকে চুন খসলেই মিছিলমুখী। এও ইতিহাসের হিসেব চোকানো নির্মম শিক্ষাই বটে! 
সুস্থ সমাজে অপরাধের কোনও রাজনৈতিক রং কোনও আমলেই বরদাস্ত হওয়া উচিত নয়। খুন ধর্ষণ লুটতরাজ যদি রাজনীতির নিয়ন্ত্রক হয় তাহলে তার আঁচ থেকে সরকার, বিরোধী কেউ বাঁচবে না। এ ধরনের যেকোনও অপচেষ্টার বিরুদ্ধে প্রশাসনকে সর্বশক্তি দিয়ে রুখে দাঁড়াতেই হবে। আপন-পর ভেদাভেদ না করে গ্রহণ করতে হবে কড়া ব্যবস্থা। এটাই চিরকালীন রাজধর্ম। কিন্তু ইতিহাসে শাসক বারবার এই ভুলটাই করে বসে ক্ষমতার দম্ভে। লাঠির জোরে। তার জন্যই একদিন বাংলায় পৈশাচিক বানতলা ঘটে যায়। তাপসী মালিকদের প্রাণ দিতে হয়। যোগীরাজ্যে হাতরাস হয়। উন্নাওয়ের ধর্ষিতা দলিত তরুণী বিচার না পেয়ে অন্ধকারে হারিয়ে যায়। তেইশ বছর আগে গুজরাত দাঙ্গার পর তৎকালীন 
প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়িকে তাঁরই দলের মুখ্যমন্ত্রীকে (পড়ুন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী) বলতে শোনা যায়, শাসকের পবিত্র রাজধর্ম যেকোনও মূল্যে পালন করতে। কিন্তু তারপরও সেই একই ঘটনা ঘটে যায় অবলীলায়। বিলকিস বানো মামলায় দোষী 
সাব্যস্তদের ‘ম্যানেজ’ করে মুক্তি দিয়ে বীরের সম্মান দিতে দেখা যায়।
এ তো গেল কট্টর হিন্দুত্ববাদীদের রাজনীতির নিষ্ঠুর ধারাভাষ্য। রামের উল্টোপিঠেই বাংলার এককালের ভাগ্যনিয়ন্তা অধুনা মিইয়ে যাওয়া বামশক্তি। সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম, নেতাই, সূচপুরের ঘটনা কীভাবে সেদিন প্রশ্রয় পেয়েছিল ‘মানবিক’ সাধারণ মানুষের নয়নের মণি বাম শাসকের! বিরুদ্ধ মত ও পথের কাউকে প্রতিবাদী হতে দেখলেই ‘ফিনিশ’ করার নিদান জারি হতো অনায়াসে। এলাকায় এলাকায় লোকাল কমিটির অফিসে প্রতিদিন সন্ধ্যায় বসত ক্যাঙারু কোর্ট! জারি হতো ফরমান। নিমেষে নিকেশ বিরুদ্ধ কণ্ঠস্বর।
এটা বলছি না যে, এই আমলে ধর্ষণ, খুন অপরাধের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামা অপরাধ। কিংবা এখন যাঁরা ক্ষমতায় তাঁদের কোনও দোষ নেই। ধোয়া তুলসী পাতা। প্রতিবাদ নিঃসন্দেহে সুস্থ গণতন্ত্রের লক্ষণ। দেশীয় সংবিধান ও সংসদীয় ব্যবস্থার জিয়নকাঠি। সেই সঙ্গে দোষীদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান করাও শাসকের প্রাথমিক দায়বদ্ধতা। ভুললে চলবে না যে, আর জি কর থেকে কালীগঞ্জে বোমার আঘাতে নবম শ্রেণির কন্যা তামান্নার মৃত্যু কিংবা ল’ কলেজ কাণ্ডে ঘটনা সামনে আসার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই আসল অপরাধীরা গ্রেপ্তার হয়েছেন। রং না দেখেই ব্যবস্থা নিয়েছে পুলিস। এনিয়ে কোথাও কোনও টালবাহানার অবকাশ ছিল না। আর জি কর কাণ্ডেও সিবিআই দীর্ঘ তদন্তের পর একচুলও আর এগতে পারেনি। কিন্তু বাম আমলের শেষপর্বে নেতাই কাণ্ডে সিপিএমের স্থানীয় নেতা ধরা পড়ে ঘটনা ঘটার অনেক পরে। রেকর্ড ভোটে জেতা হুগলির অনিল বসু তৎকালীন বিরোধী নেত্রীর বিরুদ্ধে অশ্রাব্য গালিগালাজ করেও গ্রেপ্তার হননি। হার্মাদরা দিনের পর দিন ভোট লুট চালিয়ে গিয়েছেন শাসক দলের বদান্যতায়। সাড়ে তিন দশকের বাম শাসনে সিপিএম কোথাও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লেই পাল্টা নৃশংস আক্রমণ নেমে এসেছে মুড়ি-মুড়কির মতো। খুন, ধর্ষণ, পুকুর-জমি লুট, ঘরবাড়ি ভাঙচুর করে নিরাশ্রয় করে দেওয়া সেই একচ্ছত্র দখল সংস্কৃতিরই নিরবচ্ছিন্ন অঙ্গ ছিল। গ্রাম থেকে দূরবর্তী জেলা সর্বত্র পুলিসকে নিয়ন্ত্রণ করত লোকাল কমিটির দাদারা। সাঁইবাড়ি থেকে নানুরের ঘটনা কাদের আমলে? পুলিসের হাত-পা বেঁধে সবকিছু চাপার চেষ্টা করেছিল কারা? বিমানবাবুরা জানেন না! মনীষা মুখোপাধ্যায়ের খোঁজ মেলেনি কেন? কর্পূরের মতো তাঁকে উধাও করল কারা? তারও প্রকৃত আখ্যান চাপা পড়ে আছে আলিমুদ্দিনের চার দেওয়ালের অভ্যন্তরে।
৩০ মে ১৯৯০ বাংলার রাজনৈতিক খুন ধর্ষণের ইতিহাসে আজ পর্যন্ত সবচেয়ে বর্বরোচিত ঘটনার সাক্ষী। ২০১২ সালের অভয়া কাণ্ড যেমন নাড়িয়ে দিয়েছিল গোটা দেশের বিবেককে। গত বছরের আর জি করের ঘটনা নাড়িয়ে দিয়েছিল আমাদের অস্তিত্বকে। সেদিনও মুহ্যমান হয়েছিল গোটা বাঙালি জাতি। ইউনিসেফের কাজকর্ম তদারকি সেরে এক উচ্চপর্যায়ের সরকারি প্রতিনিধিদল ফিরছিল দক্ষিণ ২৪ পরগনার একেবারে প্রান্তিক এলাকা গোসাবা থেকে। সন্ধে নাগাদ বানতলায় আক্রান্ত হন তাঁরা। অনতিদূরে সিপিএমের অফিস। বিপদ বুঝে চালক অবনী নাইয়া পাশ কাটিয়ে গাড়ি অন্যদিকে ঘোরাতে গেলে অন্ধকারে সেটি উল্টে যায়। পাশের খেতে টেনে নিয়ে গিয়ে একে একে ধর্ষণের পর অনীতা দেওয়ান ও উমা ঘোষকে খুন করা হয়েছিল। অনীতা দেবীর যৌনাঙ্গ থেকে ধাতব টর্চ উদ্ধার হয়েছিল। ভয়াবহ আরও তথ্য উঠে এসেছিল তদন্ত রিপোর্টে। গাড়ি চালক অবনীকে সঙ্কটজনক অবস্থায় এসএসকেএম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চারদিন পর তিনি মারা যান। কিন্তু কেন বানতলায় সিপিএম অফিসের অনতিদূরে রাত ৭টা-সাড়ে ৭টায় এমন ঘটনা ঘটেছিল? গোসাবার এক বাম শাসিত পঞ্চায়েতে ইউনিসেফের টাকায় কাজ চলছিল। অনীতা দেবী সেই কাজে ব্যাপক আর্থিক দুর্নীতি ধরে ফেলেছিলেন বলেই লাল পার্টির কোপে পড়ে যান। একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, বানতলার ঘটনা কোনও একজন কিংবা দু’জনের দুষ্কর্ম নয়, সে ছিল মারাত্মক সংগঠিত অপরাধ। গোটা সিস্টেম জড়িত ছিল। তার ব্যাপ্তি কোনও মতেই আর জি করের চেয়ে কম ছিল না। চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লে এ ধরনের অপরাধ সিপিএম আমলে ছিল জলভাত। আজ যারা কথায় কথায় মানবিকতার মুখোশ পরে অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে গলা ফাটান, বড় বড় কথা বলেন তাঁরা নিজেদের ট্র্যাক রেকর্ডের দিকে একবারের জন্য তাকিয়ে দেখেন না। অথচ বিগত বাম আমলে এসবই ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। ভোটের আগের দু’সপ্তাহ জেলায় জেলায় কায়েম হতো ত্রাসের রাজত্ব। সাংবাদিকরাও কোপের হাত থেকে বাঁচতেন না। আর আজ সেই বামেরাই অনেক ক্ষেত্রে রামের দোসর হয়ে নিষ্কাম সাধুর বেশে সততার নামাবলি গায়ে ময়দানে নেমেছেন। লাল আর গেরুয়া যেন একে অন্যের দোসর!
জাতীয় অপরাধ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসেব বলছে, কোভিডের বছর বাদ দিলে বছরে দেশে গড়ে ৩০ হাজারের বেশি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। কোভিডে সবকিছু বন্ধ থাকার দরুন সংখ্যাটাও বেশ কিছুটা কম ছিল। তবু এতগুলি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মধ্যে শীর্ষে কে? বাংলা? না যোগীর উত্তরপ্রদেশ। গড়ে ৩০ হাজার ধর্ষণের মধ্যে ৬০ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ১৭ থেকে ১৮ হাজার নারীনিগ্রহের ঘটনা ঘটে একা যোগীরাজ্যেই। এক দশকেরও বেশি বিজেপির শাসনে থাকা সত্ত্বেও এই পরিসংখ্যানে কোনও কমতি দেখা যায়নি। প্রতিপক্ষকে ভুয়ো এনকাউন্টারে মারা হলেও কোনও ধর্ষককে গুলি করে মারা হয়েছে বলে শোনা যায়নি। বরং, হাতরাস ও উন্নাও, মিরাটের একাধিক ঘটনায় রাজ্য প্রশাসনই তদন্ত ঠিকমতো এগিয়ে নিয়ে যেতে দেয়নি বলে অভিযোগ। পাশের রাজ্য ওড়িশায় পালাবদল হয়ে সম্প্রতি গেরুয়ারাজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মাত্র ১৭ দিনে সাত সাতটা ভয়ঙ্কর ধর্ষণের ঘটনা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে। গোপালপুরের সমুদ্রতটে যা হয়েছে, তারপর পর্যটকদের কাছে আর তা নিরাপদ নয়। একদা উত্তর ভারতের হিন্দি বলয়ের দল বিজেপি আজ ওড়িশা, অসম, ত্রিপুরা ও উত্তর-পূর্বের একাধিক রাজ্য এবং বকলমে বিহারেরও শাসক। বাকি শুধু বাংলা। মোদিজি উদগ্রীব। ৭৫ বছর বয়স হতে আর দেরি নেই, তবু বঙ্গ দখলের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাচ্ছে। আসন্ন ছাব্বিশেও সুযোগ কম। তাই রাম-বাম মিলে সামান্য অসামান্য সবকিছুকেই তিলকে তাল করার চেষ্টায় মরিয়া—যদি সান্ত্বনা পুরস্কারটা অন্তত মেলে। কিন্তু হরতন, রুইতন, ইস্কাবন — সবারই চরিত্র ও লুকনো এজেন্ডা জনগণের জানা হয়ে গিয়েছে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ