Bartaman Logo
১ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বিরোধিতা নয়, স্তাবকতাই যখন লক্ষ্য

‘সব থেকে আগে যেটা বলব, উনি যে এফর্ট নিয়েছেন, যেভাবে দৌড়াচ্ছেন সারা দিন-রাত, যেভাবে প্রত্যেকটা জায়গায় পৌঁছে যাচ্ছেন, যেভাবে প্রবলেমগুলো ফেস করছেন, এটা হয়তো আমিও কোনো দিন করিনি

বিরোধিতা নয়, স্তাবকতাই যখন লক্ষ্য
  • ১ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

তন্ময় মল্লিক: ‘সব থেকে আগে যেটা বলব, উনি যে এফর্ট নিয়েছেন, যেভাবে দৌড়াচ্ছেন সারা দিন-রাত, যেভাবে প্রত্যেকটা জায়গায় পৌঁছে যাচ্ছেন, যেভাবে প্রবলেমগুলো ফেস করছেন, এটা হয়তো আমিও কোনো দিন করিনি। সেই জন্য ওঁকে ধন্যবাদ।’ বক্তার নাম ফিরহাদ হাকিম, রাজ্যের প্রাক্তন পুরমন্ত্রী। যাঁর উদ্দেশে এই প্রশস্তি তিনি ফিরহাদ সাহেবের উত্তরসূরি, রাজ্যের বর্তমান পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। 

Advertisement

ফিরহাদ সাহেব যে বিজেপি সরকারের কাজে বিগলিত, তা এই বক্তব্যেই স্পষ্ট। তবে, বলার সময় ফিরহাদকে থামানোর চেষ্টা করেন বিজেপি বিধায়ক তথা মন্ত্রী পূর্ণিমা চক্রবর্তী। তাতে অবশ্য ফিরহাদ সাহেব বিরক্ত হননি। উলটে হাসিমুখে মন্ত্রীকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন। বললেন, ‘আমি সমালোচনা করছি না তো। আপনাদের সমর্থন করে বলার চেষ্টা করছি। আপনি আমাকে জোর করে বিরোধী বানাচ্ছেন।’
ছাব্বিশের ভোটে মন্ত্রীকে হারিয়েছেন পূর্ণিমাদেবী। মন্ত্রীও হয়েছেন। তবে, রাজনীতির মারপ্যাঁচ এখনও ঠিকমতো রপ্ত করতে পারেননি। বিধানসভায় বিরোধী বেঞ্চে বসেছেন বলে ফিরহাদ সাহেবকে সরকার বিরোধী ঠাওরেছেন। কিন্তু ‘ভালো তৃণমূল’-রা যে বিজেপি বিধায়কদের থেকে সরকারের বেশি অনুগত, সেটা পূর্ণিমাদেবী এখনও বুঝে উঠতে পারেননি। অবশ্য ‘ভালো তৃণমূলে’র বিধায়করা যেভাবে বিধানসভার লবিতে ঘাড় ঝোঁকাচ্ছেন, মন্ত্রীদের প্রশংসা করছেন, তাতে বাস্তবটা খুব তাড়াতাড়িই বুঝে যাবেন।
তবে, ফিরহাদ সাহেবকে পূর্ণিমাদেবী বিরোধী ভেবে বসায় প্রাক্তন পুরমন্ত্রী খুব কষ্ট পেয়েছেন। ভবিষ্যতে কেউ যাতে ভুলেও সেই ভুলটা না করেন তারজন্য তিনি নিজের ব্যর্থতা স্বীকার করে উত্তরসূরির সাফল্য কামনা করেছেন। বলেছেন, ‘যে কাজটা আমি সত্যি সত্যি করতে পারিনি, সেই কাজটা যদি উনি করেন, আমিও তারজন্য গর্বিত হব।’ ভাবা যায়? 
ফিরহাদ সাহেবের এই ভাষণ বিধানসভার মিনিটসের খাতায় জ্বল জ্বল করবে। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘আজি হতে শতবর্ষ পরে/ কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতাখানি কৌতূহলভরে’। বিরোধী বেঞ্চে বসেও ফিরহাদ সাহেব যেভাবে সরকার এবং মন্ত্রীর স্তুতি করেছেন তাতে হয়তো আজি হতে শতবর্ষ পরে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা কৌতূলহলভরে তার কারণ খুঁজবেন। তাঁরা অনুসন্ধান করবেন, বিজেপি সরকার তৈরির দু’ মাসের মধ্যে পুরমন্ত্রী কী এমন করেছিলেন যারজন্য বিরোধী দলের নেতার মুখ থেকে নিঃসৃত হয়েছিল এহেন প্রশংসাবাণী! 
বহু দলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভিন্ন মতের, ভিন্ন আদর্শের মানুষ থাকবে, সেটাই স্বাভাবিক। সরকার যত ভালো কাজই করুক না কেন, সবাই তাকে কিছুতেই সমর্থন করবে না। সেই কারণে বিরোধীরা প্রচুর ভোট পায়। ছাব্বিশের নির্বাচনে বিজেপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। ভোট পেয়েছে প্রায় তিন কোটি। কিন্তু প্রধান বিরোধী দল তৃণমূলও প্রায় ২কোটি ৬০ লক্ষ ভোট পেয়েছে। বিজেপি প্রায় ৪৬ শতাংশ ভোট পেয়েছে। এর অর্থ, ৫৪ শতাংশ ভোটার বিজেপিকে শাসক হিসাবে দেখতে চাননি। এরমধ্যে যাঁরা তৃণমূলকে ভোট দিয়েছিলেন তাঁরা মনে করেছিলেন, বিজেপিকে রুখতে ফিরহাদ সাহেবরা দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করবেন। উলটে তাঁরা বিজেপি সরকারের স্তুতি করছেন। এমন প্রশংসা করছেন যে বিজেপি নেতানেত্রীদেরও তা হজম করতে সমস্যা হচ্ছে।
ফিরহাদ হাকিম, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়রা কেন ‘ভালো তৃণমূল’ হয়েছেন, সেটা আম জনতা বুঝে গিয়েছে। কিন্তু, আগ বাড়িয়ে বিজেপির এত প্রশংসা কেন? অনেকে বলছেন, চরম অনিশ্চয়তায় ভুগছে ‘ভালো তৃণমূল’ শিবির। রাজ্যসভার তৃণমূল সাংসদরা সরাসরি বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। লোকসভার ২০জন বিদ্রোহী সাংসদ এখনও বিজেপিতে যোগ দিতে পারেননি। কিন্তু, শরিকের মর্যাদা পেয়েছেন। খোদ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একই সারিতে বসার সুযোগ পাচ্ছেন। বাদল অধিবেশন মিটলেই হয়তো বিদ্রোহী সাংসদরা বিজেপি হয়ে যাবেন। কিন্তু, ভালো তৃণমূল বিধায়কদের কপালে কয়েকটি প্রশাসনিক বৈঠকে আমন্ত্রণ ছাড়া কিছুই জোটেনি। এখনও তাঁদের বিক্ষোভ ও ডিম থেরাপির মুখে পড়তে হচ্ছে। তা নিয়ে ‘ভালো তৃণমূলে’র অন্দরে ক্ষোভ বাড়ছে। কেউ কেউ প্রকাশ্যেই ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে কালীঘাট থেকে বিদ্রোহী বিধায়কদের দূরে রাখতে গেলে বিজেপির পরোক্ষ মদতে কাজ হবে না। চাই সক্রিয় সমর্থন। তার একটাই পথ, বিজেপিতে যোগদান। 
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একুশে জুলাইয়ের শহিদ স্মরণের সভা ভালো তৃণমূল শিবিরের রক্তচাপ বাড়িয়ে দিয়েছে। সরকারের ‘নেক নজরে’ থাকায় তারা স্মরণসভা করার জন্য সবচেয়ে ভালো জায়গাটি পেয়েছিল। আবেদনের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই মিলেছিল সভার অনুমতি। ফলে সভার স্থান নিয়ে কোনো বিভ্রান্তি ছিল না। অন্যদিকে কালীঘাটপন্থী তৃণমূল হাইকোর্ট থেকে অনুমতি পেয়েছে প্রায় শেষমুহূর্তে। তারপরেও ভিড়ের নিরিখে কালীঘাটপন্থীরা ‘ভালো তৃণমূল’-কে গোলের মালা পরিয়ে দিয়েছে। ‘ভালো তৃণমূলে’ যতজন বিধায়ক আছেন তাঁরা প্রত্যেকে ১০০জন সমর্থককে নিয়ে গেলেও এত অস্বস্তির মুখে পড়তে হত না। ভালো তৃণমূলের অবস্থা অনেকটা ‘মাথা ভারী প্রশাসনে’র মতো। নেতা প্রচুর, কিন্তু কর্মী নেই। প্যান্ডেলে চেয়ার রয়েছে প্রচুর। কিন্তু, চেয়ার ভরতি করার লোক নেই।
‘ভালো তৃণমূলে’র কী হাল, সেটা বিজেপি নেতারাও জানেন। কোনো দলীয় প্রতীক ছাড়া ভোটে দাঁড়ালে জেতা তো দূরের কথা, অনেক বিদ্রোহী তাঁর পরিবারের সব সদস্যের ভোটও হয়তো পাবেন না। বিজেপি নেতৃত্বের কাছে তাঁরা ‘ইউজ অ্যান্ড থ্রো’ পেনের মতো। আপাতত বুক পকেটে জায়গা পেয়েছেন। কিন্তু কালি ফুরলেই যেতে হবে ডাস্টবিনে। সেই আশঙ্কা থেকেই তাঁরা একটা ডাল ধরে ঝুলে থাকতে চাইছেন। ঢালাও প্রশংসা করে বিজেপিতে যোগদানের রাস্তা মসৃণ করতে মরিয়া। সুযোগ পেলেই বিজেপির নেতা-মন্ত্রীদের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছেন, গা ঘেঁষাঘেঁষি করে ছবি তুলছেন। 
আন্তর্জাতিক সম্পর্কে ‘বাফার স্টেট’ বলে একটি শব্দ আছে। দুই শক্তিধর এবং প্রতিপক্ষ দেশের মধ্যে থাকা নিরপেক্ষ ও দুর্বল প্রকৃতির রাষ্ট্রটি হল ‘বাফার স্টেট’। একটা সময় চীন ও রাশিয়ার মধ্যে বাফার স্টেট ছিল মঙ্গোলিয়া। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে জার্মানি ও ফ্রান্সের মধ্যে বেলজিয়াম ছিল বাফার স্টেট। একইভাবে ভারত ও চীনের মধ্যে বাফার স্টেট নেপাল ও ভুটান। বাফার স্টেট সাধারণত দুই প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রের মধ্যে একটা ‘অদৃশ্য পাঁচিল’ হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিপক্ষ সরাসরি আক্রমণ করার সুযোগ পায় না। তারজন্য শক্তিধর রাষ্ট্র তাদের নানান সুবিধা দেয়। অনুদান এবং সহযোগিতার পরিমাণ বাড়ালে বাফার স্টেট তার আকাশপথ এমনকি, বিমান ও নৌবন্দর ব্যবহারের অনুমতি দেয়। তবে, সীমাহীন আনুগত্যে নষ্ট হয় নিজস্বতা। তখন ‘বাফার স্টেট’ আক্ষরিক অর্থেই কাঠের পুতুল। যেমন নাচায় তেমনি নাচে।
অনেকে বলছেন, বঙ্গ রাজনীতিতে বিজেপি ও কালীঘাট তৃণমূলের মধ্যে ‘বাফার স্টেট’-এর দায়িত্ব পালন করছে ‘ভালো তৃণমূল’। কালীঘাট তৃণমূলকে নাস্তানাবুদ করার জন্য ‘ভালো তৃণমূলে’র জমি ব্যবহার করছে বিজেপি। কখনো তাদের দিয়ে কালীঘাট তৃণমূলকে আক্রমণ করাচ্ছে, আবার কখনো সরকারি কাজের ভূয়সী প্রশংসা করিয়ে নিচ্ছে। শাসকের অঙ্গুলি হেলনে  বিরোধী দল ওঠবস করছে, সরকারের পক্ষে বিবৃতি দিচ্ছে। 
শুধু বিধানসভার অন্দরে নয়, বাইরেও শাসক দলের হয়ে ব্যাট ধরেছে ‘ভালো তৃণমূল’। নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে জেন-জির আন্দোলন যখন কেন্দ্রীয় সরকারের রক্তচাপ বাড়াচ্ছে ঠিক তখনই আন্দোলনকারীদের কটাক্ষ করলেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি এটাকে ছাত্র আন্দোলন বলে মানতেই রাজি নন। তাঁর দাবি, ‘এটা এনার্কি, হুলিগানিজিম’। শাসকের সুর যখন বিরোধীর গলায় বাজে তখন বুঝতে হয়, সরকারকে ধাক্কা দেওয়া নয়, চোখের মণির মতো রক্ষা করাই তাদের উদ্দেশ্য।
এতদিন বিরোধী বললে চোখের সামনে কোন ছবি ভেসে উঠত? মুষ্টিবদ্ধ হাত আর গলার শিরা ফুলিয়ে সরকারকে পদে পদে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ার ছবি। তা দেখে মানুষ বুঝতে পারত কে শাসক, কে বিরোধী। কিন্তু, ‘ভালো তৃণমূল’ জন্ম নেওয়ার পর সব বদলে গিয়েছে। এখন বিরোধিতা মানে শাসকের চোখে চোখ রেখে ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে লড়াই নয়। এখন বিরোধিতা মানে কাঁধে কাঁধ রেখে সহযোগিতা। এখন বিরোধিতা মানে সমালোচনা নয়, শাসক বন্দনা। অর্থাৎ ‘ভয় আউট ভরসা ইন’। শাসকের কাছে বিরোধী শিবির এখন ভয়ের নয়, বরং ভরসার। এটাই ভালো তৃণমূল কা গ্যারেন্টি।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ