Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

এর পরের কোপটা কবে?

এমাসের গোড়ায় কেন্দ্র আশ্বস্ত করেছিল যে, গৃহস্থের রান্নার গ্যাসের দাম আপাতত বাড়বে না। কিন্তু সেই ভরসা এক সপ্তাহও স্থায়ী হল না।

এর পরের কোপটা কবে?
  • ৯ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

এমাসের গোড়ায় কেন্দ্র আশ্বস্ত করেছিল যে, গৃহস্থের রান্নার গ্যাসের দাম আপাতত বাড়বে না। কিন্তু সেই ভরসা এক সপ্তাহও স্থায়ী হল না। দ্রুত অবস্থান বদল করল মোদি সরকার। সোমবার কেন্দ্রীয় পেট্রলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী ঘোষণা করে দিলেন, ১৪.২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৫০ টাকা বাড়বে। গতকাল মঙ্গলবার থেকেই নতুন দাম কার্যকর হয়েছে। তার ফলে কলকাতায় এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বেড়ে ৮৭৯ টাকা হল। আগে বুকিং করা সিলিন্ডারের জন্যও এখন নতুন দাম চোকাতে হবে। এমনকী বিপিএল পরিবারের জন্য নির্দিষ্ট প্রধানমন্ত্রী উজ্জ্বলা যোজনার (পিএমইউওয়াই) গ্রাহকদেরও রান্না করতে হবে বর্ধিত দামে গ্যাস কিনে। আমরা জানি, মোদি সরকারই নিয়ম করেছিল, রান্নার গ্যাসের দাম ঘোষণা হবে প্রতিমাসে একবার। সেই নিয়ম মাঝেমধ্যেই ভাঙে খোদ সরকার। আর সেটা তখনই হয়, যখন দাম এক লাফে অনেকটা বাড়ানো হয়। মঙ্গলবার আগুনে ঘৃতাহুতি, নিঃসন্দেহে ওই পরম্পরারই অঙ্গ। 

Advertisement

কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর দাবি অবশ্য, যে উপকরণ বা কাঁচামালের উপর নির্ভর করে রান্নার গ্যাসের দাম স্থির হয়, সেগুলির দর ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৬৩ শতাংশ বেড়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলিকে এই দায় বইতে হচ্ছে। ‘কম’ দামে সিলিন্ডার বিক্রি করে ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে সার্বিকভাবে ৪১,৩৩৮ কোটি টাকা ক্ষতি স্বীকার করতে হয়েছে সংস্থাগুলিকে। এই অবাঞ্ছিত পরিস্থিতির মোকাবিলাতেই সিলিন্ডারের দাম অল্পই বাড়ানো হয়েছে। মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী আরও জানান, নয়া দাম কার্যকর হলে উজ্জ্বলার গ্রাহকদের জ্বালানির জন্য দৈনিক গড়ে ৬.১০ টাকা খরচ করতে হবে। এই খরচ সাধারণ গ্রাহকদের ক্ষেত্রে হবে ১৪.৫৭ টাকা। তাঁর দাবি, এই খরচ নাকি ন্যায়সঙ্গত! যদিও এই হিসেবের ব্যাখ্যা মিলছে না। বরং তিনি বলেছেন, যে-দাম বাড়ানো হল, তাতে আগামী দিনে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলির খরচের বোঝা কিছুটা কমবে কিন্তু আগের ‘ক্ষতি’ পূরণ হবে না। সেজন্য অর্থমন্ত্রকের কাছে আর্থিক সুরাহা বা বাজেট বরাদ্দ চাইবে পেট্রলিয়াম মন্ত্রক। তবে সাধারণ মানুষের আর্থিক বোঝা হ্রাসের কোনও দায়বদ্ধতার কথা শোনা যায়নি মন্ত্রী মহোদয়ের মুখে। সোমবার পেট্রল এবং ডিজেলের অন্তঃশুল্কও লিটার পিছু ২ টাকা করে বাড়িয়েছে সরকার। তবে জ্বালানি তেলের খুচরো দামের উপর তার প্রভাব পড়ছে না। আশ্বস্ত করেছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রক। কেন্দ্রীয় নির্দেশিকায় জানানো হয়েছে, শুল্ক বৃদ্ধি পেয়ে পেট্রলের ক্ষেত্রে লিটার পিছু ১৩ টাকা এবং ডিজেলে ক্ষেত্রে লিটার পিছু ১০ টাকা হচ্ছে। নতুন হারের ওই শুল্ক ধার্য হবে মঙ্গলবার থেকেই। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম অনেকটা কমেছে। অশোধিত তেলের দাম ২০২১-এর এপ্রিলের পর এখনই সবচেয়ে কম। 
সংশ্লিষ্ট মহল মনে করে, তাই আম জনতার পর্যাপ্ত সুরাহাই প্রাপ্য। কিন্তু ‘আচ্ছে দিন’-এর খোয়াব দেখানো মোদিবাবুরা সেই বাঞ্ছিত পথে হাঁটেননি। উল্টে শুল্ক বাড়িয়েই রাজকোষ ফাঁপানোর কৌশল নিয়েছেন। এই শুল্ক বৃদ্ধির হিসেব কষতে গিয়ে মন্ত্রী মশায় জানিয়েছেন, বছরে ১৬ হাজার কোটি লিটার জ্বালানি বিক্রয় সম্ভব হলে, লিটার প্রতি ২ টাকা বাড়তি শুল্কের সুবাদে কোষাগারে ঢুকবে অতিরিক্ত ৩২ হাজার কোটি টাকা। এতে তেল সংস্থাগুলির ক্ষতি নিশ্চিতভাবেই কমবে কিন্তু আম জনতার লাভটা কী হবে? দেশবাসীর অভিজ্ঞতা বলে, এ নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় নেই জনগণের ভোটে নির্বাচিত মোদি সরকারের। নভেম্বর, ২০২৫-এর আগে দেশে কোনও বিধানসভা নির্বাচন নেই। এই সুযোগটাকেই নিশ্চয় কাজে লাগাতে চাইছে চতুর সরকার। জনবিরোধী পদক্ষেপগুলির বিরূপ প্রভাব ভোটযন্ত্রে পড়ার আশঙ্কা সবসময়ই থাকে। শাসকের মাথায় নিশ্চয় আছে আগামী নভেম্বরে বিহার বিধানসভার ভোট। পরবর্তী মে মাসে নির্বাচন রয়েছে আরও চারটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে। নতুন সরকার তৈরি করতে হবে পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু, কেরল এবং অসমে। এই বড় মাপের ভোটযুদ্ধের বেশ কয়েক মাস আগেই তেল ও গ্যাসের দাম বাড়িয়ে বিপুল রাজস্ব ঘরে তোলার ফন্দি কার্যকর করা হচ্ছে। সরকার যখনই অর্থসংকটে পড়ে তখনই দাঁও মারার জন্য নজর যায় পেট্রপণ্যের দিকেই। গত এক দশকে এই জিনিস বারবারই লক্ষ করা গিয়েছে। তাই এর ভিতরে নতুনত্ব কিছু নেই। বরং আশঙ্কা রয়ে যাচ্ছে, এর পরের কোপটা কবে? তখন কি পেট্রল, ডিজেল, কেরোসিনও এই রাক্ষুসে বন্ধনীভুক্ত হবে?

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ