সংসদীয় গণতন্ত্রের সৌন্দর্য বহুলাংশে নির্ভর করে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে ভোটগ্রহণের উপর। যোগ্য জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের নিষ্কলুষ প্রক্রিয়াটি শুরু হতে পারে স্বচ্ছ ভোটার তালিকা তৈরি দিয়েই। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের পছন্দের সরকারটি গঠিত হয় সবার শেষে। মানুষের দ্বারা মানুষের জন্য সরকার গঠনের এটাই মূল মন্ত্র। এই প্রথা ভঙ্গ হলে গণতন্ত্র কোনো আশাব্যঞ্জক সরকার উপহার দিতে পারে না। বিষয়টি ভারতের মতো সুবিশাল দেশের পক্ষে আরও বেশি করে ভাবা দরকার। তাই সার্বিক সাবধানতা নিয়েই ভোটার তালিকা তৈরি করা চাই। ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ নির্বাচন প্রক্রিয়ার গোড়ার গলদ তবেই দূর হতে পারে। এজন্য পুরানো তালিকা থেকে মৃত, বিদেশি, স্থানান্তরিত এবং ডুপ্লিকেট ভোটারদের নাম বাদ দিয়েই নতুন তালিকা প্রস্তুত করতে হবে। ওইসঙ্গে যোগ করতে হবে নতুন কিছু যোগ্য ভোটারের নাম, বিশেষ করে ন্যূনতম বয়সের বিচারে যাঁরা সবেমাত্র ভোটাধিকার অর্জন করলেন। প্রক্রিয়াটি মোটেই সহজ নয়। তাই প্রতিটি স্তরে সবরকমে সতর্ক থাকা জরুরি। তবে নিয়ম মানতে গিয়ে বজ্র আঁটুনিও বিপজ্জনক। তার সঙ্গে সংকীর্ণ রাজনৈতিক মতলব যুক্ত হলে বিপদটি আরও মারাত্মক। তাতে বহু ‘জীবিত’ ভোটার কাগজেকলমে ‘মৃত’ হয়ে যেতে পারেন। আবার কিছু প্রকৃত মৃত ভোটারের নাম নতুন তালিকাতেও রয়ে যেতে পারে। দেশের কিছু প্রকৃত নাগরিক ‘বিদেশি’ তকমা নিয়ে দুর্ভোগের শিকার হতে পারেন। কিছু তরুণ-তরুণী জীবনের প্রথম ভোটদানের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন ন্যূনতম বয়সের গণ্ডি পেরিয়ে এসেও। এসআইআরের পর, এযাবৎ পশ্চিমবঙ্গসহ একাধিক রাজ্যে প্রকাশিত ভোটার তালিকায় এমন ভেলকি বিস্তর দেখার দুর্ভাগ্য হয়েছে সকলের। জাতীয় নির্বাচন কমিশন (ইসিআই) এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের (সিইসি) এই অনাচারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই সরব সারা দেশ। এই ‘অনন্য কীর্তি’র কারণে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জ্ঞানেশ কুমারের নতুন নাম দিয়েছেন ‘ভ্যানিশ কুমার’! এই নয়া নাম গণতন্ত্রপ্রেমী ভারতবাসীরও মুখে মুখে ফিরছে এখন। বহু মানুষের ধারণা, মোদি জমানায় ইসিআই তার স্বাধীন চরিত্র এবং পবিত্র মর্যাদা খুইয়ে বসেছে। বহু কষ্টার্জিত গণতন্ত্রই আজ ধ্বংসের মুখে। ‘মৃত’ বা ‘অযোগ্য’ ভোটারের নাম ভোটার তালিকায় রয়ে গেলে তাকে ‘ভূতুড়ে’ ভোটার বলে। আর ‘জীবিত’ ভোটার, তালিকা তৈরির কৌশলে ‘মৃত’ হয়ে গেলে, প্রক্রিয়াটিকে ‘ভূতুড়ে কারবার’ বলতে হবে বইকি! উভয় দিকে, ব্যবসার উপকরণ যখন ‘ভূতই’ তাকে ভূতের কারবার বললে কি খুব অন্যায় হবে? নিজ গুণে ইসিআই এখন ভূতের কারবারি!
নির্বাচন কমিশনের কাজ ভোটার তালিকার যথাযথ সংশোধন, জীবিত মানুষকে মৃত ঘোষণার মাধ্যমে গণতন্ত্রের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা নয়। অথচ রাজস্থানে এসআইআরের নামে যে বিস্ময়কর অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে, তা শুধু নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়নি, গোটা নির্বাচনি ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়েই গভীর সংশয় তৈরি করেছে। ইসিআইয়ের চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় প্রায় ৮.৭৫ লক্ষ মানুষকে মৃত দেখিয়ে বাদ দেওয়া হয়েছিল। অথচ রাজস্থানের পঞ্চায়েত নির্বাচনের জন্য রাজ্য নির্বাচন কমিশনের পৃথক ভোটার তালিকায় তাঁদের ভিতরে ১.৮২ লক্ষাধিক মানুষকে দিব্যি জীবিত অবস্থায় পাওয়া যাচ্ছে। অর্থাৎ ইসিআই যাঁদের ভোটাধিকার কার্যত নস্যাৎ করেছে, তাঁরাই রাজ্য কমিশনের তালিকায় জীবিত এবং নাগরিক হিসাবেও স্বীকৃত। এই মারাত্মক তথ্যটি ‘দ্য রিপোর্টার্স কালেকটিভ’-এর দীর্ঘ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। একে নিছক ‘ক্লারিক্যাল মিসটেক’ বলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। এই কেলেঙ্কারির জবাবদিহি জরুরি।
ইসিআইয়ের তত্ত্বাবধানে হয়েছে এসআইআর। অন্যদিকে পঞ্চায়েত ভোটের জন্য তালিকা সংশোধন করেছে রাজ্য কমিশন। দুটি প্রক্রিয়ার সময়ের ব্যবধান ছিল মাত্র কয়েকদিনের। অথচ ফলাফলের ফারাক আকাশপাতাল! স্বভাবতই ইসিআই যে মারাত্মক কেলেঙ্কারি করে বসে আছে তাতে সংশয় আর কতটুকু? অনুসন্ধানকারী সংস্থা যাবতীয় তথ্যপ্রমাণসহ ব্যাখ্যা চেয়েও সিইসির কাছে তা পায়নি। তাঁর এই নীরবতার অর্থ পরিষ্কার নয় কি? সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান কেন পূর্ণ বিশ্বাসযোগ্য এবং আরও দায়িত্বশীল হবে না? রাজস্থানের ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক ত্রুটি হিসাবে দেখার অবকাশ নেই। রাজনৈতিক তরজা ঊহ্য রেখেই এই কেলেঙ্কারির নিরপেক্ষ তদন্ত এবং তথ্যভিত্তিক জবাব চায় মানুষ। ভোটাধিকার কোনো সরকারি অনুগ্রহ নয়, মানুষের মৌলিক অধিকার। ভুলভাবে বাদ পড়া ভোটারদের নাম দ্রুত পুনর্বহাল করতে হবে। দেশজুড়ে ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ারও অডিট এখন জরুরি। অন্যথায় প্রশাসনিক খামখেয়ালের বলি হতে থাকবেন দেশবাসী।



