কালী-পুলিশের আধ্যাত্মিক ও আত্মিক যোগ
  • ৯ নভেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

শুভজিৎ অধিকারী: আজকের ইস্পাতনগরী দুর্গাপুর তখন শাল-পিয়ালের জঙ্গলে ঢাকা। সন্ধ্যা নামলেই শুনশান রাস্তাঘাট। গোটা দুর্গাপুর দখল নেয় দুষ্কৃতীরা। ঘটনাটির পাঁচ বছর বাদে দুর্গাপুরে গড়ে উঠবে স্টিলপ্ল্যান্ট। ধীরে ধীরে বদলে যাবে দুর্গাপুর। তার মুকুটে উঠবে ‘ইস্পাতনগরী’ পালক। ১৯৫০ সালের এমনই এক হেমন্তের সন্ধ্যায় দুর্গাপুর থানার অ-হিন্দু বড়বাবু বখতিয়ার হোসেন হঠাৎ খবর পেলেন কমলপুর জঙ্গলে সশস্ত্র ডাকাতরা জড়ো হয়েছে। থানার জরুরি কাজকর্ম ফেলে অধস্তনকে নির্দেশ দিলেন, যত দ্রুত সম্ভব ফোর্স রেডি করতে। এখনই কমলপুর জঙ্গলে যেতে হবে। 

Advertisement

ফোর্স ছেড়ে থানা সেরে বেরিয়ে গেলেন বখতিয়ার সাহেব। ইনফরমেশন ভুল ছিল না। ডাকাতি করার উদ্দেশ্যে জঙ্গলে প্রস্তুতি নিচ্ছে দুষ্কৃতীরা। সবার হাতেই আগ্নেয়াস্ত্র। পুলিশ তাদের ঘিরে ফেলতেই বেগতিক বুঝে গুলি চালাতে শুরু করে ডাকাত দলটি। পালটা গুলি চালায় বাহিনী। দীর্ঘক্ষণ চলে গুলির লড়াই। ডাকাতদের বেপরোয়া আক্রমণে রণে ভঙ্গ দেন পুলিশকর্মীরা। বখতিয়ার সাহেব গুরুতর জখম হয়ে লুটিয়ে পড়েন। অচেতন তিনি। বড়বাবু মারা গিয়েছেন ভেবে দুষ্কৃতীরা চম্পট দেয়। আর তখনই ঘটে এক অলৌকিক ঘটনা। বখতিয়ার সাহেবের সামনে আবির্ভূত হন লালপাড় সাদা শাড়ি পরিহিতা শ্যামবর্ণা এক মহিলা। কমলপুর জঙ্গলের একটি পুকুর থেকে জল এনে বখতিয়ার সাহেবের মুখে দেন তিনি। চোখে জলের ঝাপটা মারেন। জ্ঞান ফিরতেই ওই মহিলা অন্তর্হিত হয়ে যান। বড়বাবু ঘোরের মধ্যে থেকে কোনোরকমে থানায় ফিরে এলেন। কথিত, ক’দিন পর বখতিয়ার সাহেব স্বপ্ন দেখলেন, থানায় মা কালীর পুজো করার। কমলপুর জঙ্গলের জল এনে পুজোয় ব্যবহারের নির্দেশও পেলেন। বখতিয়ার সাহেব সময় নষ্ট না করে থানা চত্বরে একটি কালীমন্দির নির্মাণের নির্দেশ দেন। মন্দির সম্পূর্ণ হতেই সেখানে মা কালীর মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে ব্রাহ্মণ এনে ধূমধামের সঙ্গে পুজো করলেন। আজকের দিনে রাজ্যের প্রায় প্রতিটি থানায় কালীপুজোর যে এত ধূম, তার পিছনে জড়িয়ে রয়েছে বখতিয়ার সাহেবের সঙ্গে ঘটে যাওয়া এই অলৌকিক কাহিনি। 
তবে এমনটা নয় যে, দুর্গাপুর থানায় প্রথম মা কালীর মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে পুজোর প্রচলন হয়। ১৮৯৫ সালে তৎকালীন মেদিনীপুরের দাসপুর থানায় ব্রিটিশদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে কালীমূর্তি তৈরি করে পুজো করেছিলেন দেশীয় পুলিশকর্মীরা। অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ হয়ে বহু দেশীয় পুলিশকর্মী শাক্ত আরাধনায় মনোনিবেশ করেছিলেন। তার সঙ্গে অবশ্যই জুড়ে নিয়েছিলেন দুষ্কৃতীদের মোকাবিলা করার শক্তি সঞ্চয়ের প্রার্থনা। ২০০১ সালে এমনই এক কালীপুজোর আগে এক সাক্ষাৎকারে কলকাতা পুলিশের তৎকালীন ডিসি (সদর) বাণীব্রত বসু বলেছিলেন, পরাধীন ভারতে থানার বড়বাবুরা মূলত ব্রিটিশ ছিলেন। তাঁরা ভারতীয় অধস্তনদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতেন। সম্ভবত, ব্রিটিশদের এই আচরণ প্রতিরোধ করতে মা কালীর বাঁধাই করা ছবি টাঙিয়ে পুজো করার প্রথা শুরু হয়েছিল। তবে, সেটা করা হতো ব্রিটিশ অফিসারদের চোখ এড়িয়ে। কারণ, ব্রিটিশরা নগ্ন দেবীপুজোর এই পৌত্তলিক প্রথাকে পছন্দ করতেন না।
স্বাধীনতার পর মা কালীর সঙ্গে পুলিশের একটা নির্ভেজাল আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এর পিছনে অনুঘটকের কাজ করেছে কালীর সৃষ্টি-তত্ত্বের নানা পুরাণ আখ্যান। ‘কালীকা পুরাণ’, ‘মার্কণ্ডেয় পুরাণ’, ‘শ্রীশ্রী চণ্ডিকা’ সহ আমাদের একাধিক হিন্দু পুরাণে মা কালীকে অত্যন্ত পরাক্রমশালী দৈত্য-বিজয়িনী নারীশক্তি হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। একটি আখ্যানে বলা হচ্ছে, পুরাকালে শুম্ভ ও নিশুম্ভ নামের দুই দৈত্য ব্রহ্মাণ্ডে ভয়ংকর তাণ্ডব শুরু করে। স্বর্গলোক দেবতাদের হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার জোগাড়। বেগতিক বুঝে দেবরাজ ইন্দ্র আদ্যাশক্তি মহামায়ার তপস্যা শুরু করেন। দেবী সন্তুষ্ট হয়ে তাঁর কাছে আবির্ভূত হন। সেই দেবীই হলেন কালী। আর একটি আখ্যান মতে, রক্তবীজ নামে এক অসুরের তাণ্ডবে লন্ডভন্ড অবস্থা স্বর্গলোকের। তার চ্যালা-চামুণ্ডারা নিত্যদিন দেবতাদের উপর নির্মম অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে। রক্তবীজকে কিছুতেই দমন করা যাচ্ছে না। আসলে রক্তবীজ প্রজাপতি ব্রহ্মার আশীর্বাদে অসীম শক্তিধর। তার দেহ থেকে এক ফোঁটা রক্ত মাটিতে পড়লে সেখান থেকে জন্ম নিচ্ছিল একাধিক অসুর। দেবতাদের মানসম্মান রক্ষায় অবতীর্ণ হন দেবী দুর্গা। তিনি সব অসুরকে মেরে ফেললেও রক্তবীজকে কোনোভাবেই খতম করতে পারছিলেন না। তখন ক্রোধান্বিত হয়ে দেবীদুর্গা তাঁর ভ্রু যুগলের মাঝখান থেকে জন্ম দেন কালীকে। তাঁর ভয়াবহ রুদ্রমূর্তি। নগ্ন রূপ। রক্তবর্ণ লকলকে জিভ বের করে রক্তবীজকে অস্ত্রে বিদ্ধ করেন। এক ফোঁটা রক্তও পড়তে দিলেন না। জিভ দিয়ে পান করে ফেললেন। শেষে রক্তশূন্য রক্তবীজের দেহ শূন্যে ছুড়ে অট্টহাসিতে স্বর্গলোক কাঁপিয়ে দেন কালী। 
যাই হোক, আমরা ‘কালী’ কথাটির প্রথম উল্লেখ পাই মুণ্ডক উপনিষদে। সেখানে অগ্নির সাতটি জিহ্বার মধ্যে একটিকে কালী বলা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে কালীর রূপভেদ ঘটলেও তিনি পুরোপুরি  বৈদিক দেবী হয়ে উঠতে পারেননি। বঙ্গদেশে তাঁর উপাসনা বা শাক্ত সাধনার ব্যাপ্তি ঘটেছে তান্ত্রিক ও অবৈদিক মাতৃকা রূপে। পালযুগের ধর্মীয় ইতিহাস ঘাঁটলে আমরা দেখতে পাই, মা চামুণ্ডা অত্যন্ত জনপ্রিয় দেবী ছিলেন সেই সময়। তিনি দেবী চর্চিকা নামে পূজিতা হতেন। সেই মা চর্চিকার মূর্তিতত্ত্ব আজকের মা কালীর মূর্তিতত্ত্বের উপর প্রভাব ফেলেছে। মায়ের পায়ের তলায় শবরূপী শিব, সঙ্গে ডাকিনী যোগিনী এবং ভূত প্রেত, কণ্ঠে মুণ্ডমালিনী—এ সবই মা চর্চিকা, মতান্তরে চামুণ্ডারই মূর্তি। আজও বাংলার বহু স্থানে মা চামুণ্ডার প্রাচীন মূর্তি পূজিত হয়। বর্ধমানে মা কঙ্কালেশ্বরী কালী আসলে পাল-সেনযুগেরই নৃত্যরতা রুদ্রচামুণ্ডা। উত্তরবঙ্গে মা পেটকাটিও আসলে আদিযুগের মা চামুণ্ডা। 
হিন্দু রাজাদের শাসনকাল অস্তমিত হলে চামুণ্ডারূপী কালীর মূর্তি পুজো বঙ্গসমাজে উল্লেখযোগ্য হারে কমতে থাকে। সার্বিকভাবে সংকটেও পড়ে সনাতন ধর্ম। তার থেকে উত্তরণের দিশা দেখান শ্রীচৈতন্য। বাংলায় শুরু হয় বৈষ্ণব-বিপ্লব বা ভক্তিবাদ আন্দোলন। অন্যদিকে আবার সঙ্কুচিত হয়ে পড়ে শাক্তধারার পুনর্জাগরণের পথও। আর তখনই মা কালীকে অন্যরূপে বাঙালির কাছে নিয়ে এলেন সেই নবদ্বীপেরই শাক্ত পণ্ডিত কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ। বর্তমানে আমরা যে মা কালীর শান্তরূপ দেখছি, তাঁকে দক্ষিণাকালী, কিংবা মা ভবতারিণী রূপে চিনেছি, এসব মূর্তির রূপকার কৃষ্ণানন্দই। তারপর কালী উপাসনার ব্যাপ্তি ঘটে নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের দৌলতে। তিনি ছিলেন ঘোরতর শাক্ত। বৈষ্ণব আন্দোলনকে প্রতিহত করতে তিনি শাক্তধারার পুনরুদ্ধারে অন্যতম পৃষ্ঠপোষক হয়ে ওঠেন। নদীয়া থেকে কালীপুজো বাংলার অন্যত্র ছড়িয়ে পড়তে থাকে। উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায় কালী মন্দিরেরও। দেবী কালিকার মাহাত্ম্য প্রচারে রামপ্রসাদকে দিয়ে কৃষ্ণচন্দ্র লিখিয়ে নিলেন ‘কালিকা মঙ্গল’। এটিই বাংলার প্রথম কালীকাহিনি। তারপর সাধক বামাক্ষ্যাপা, কমলাকান্ত এবং শ্রীরামকৃষ্ণদেবের অবদানে মা কালী হয়ে উঠলেন বাংলার ঘরের মেয়ে। আবার তিনি ডাকাত-দস্যুকুলেরও আরাধ্য হয়ে থেকে গেলেন। 
বাংলার ইতিহাস বলে, অনেক জমিদার পরিবার পূর্বে দস্যু ও ডাকাত দলের পান্ডা ছিল। পরে সমৃদ্ধিশালী হয়ে দস্যুবৃত্তি ছেড়ে দেন। বড়ো ব্যবসাদার কিংবা বিশাল জমির মালিক হয়ে জমিদারে পরিণত হন। এঁরা প্রায় সবাই কালীর উপাসক ছিলেন। সেই পরম্পরা মেনে বাংলায় এক সময় চোর-ডাকাতদেরও উপাস্য হয়ে ওঠেন মা কালী। তাদের বিশ্বাস, কালীনামে লুট, হত্যা সহ সব অপরাধ থেকে মুক্তি সম্ভব। আবার শাপদসঙ্কুল পথে একমাত্র রক্ষী হয়ে উঠতে পারেন একমাত্র মা কালী। কারণ, তিনি শ্মশানবাসিনী। নিশুতি রাতের সাধনায় তিনি সাড়া দেন। এক্ষেত্রে তন্ত্র সাধনার আচারই ডাকাত-দস্যুদের কাছে অনুকরণীয় হয়ে ওঠে। আবার সেই ডাকাতদের দমন করতে কালীর চরণে আশ্রয় নিতে থাকে পুলিশও। 
তবে, পুলিশের এই ‘কালীসাধক’ হয়ে ওঠার নেপথ্যে কালীর সৃষ্টি-তত্ত্বের উপরই বেশি জোর দিয়েছেন শাস্ত্রীয় পণ্ডিতরা। সৃষ্টি-তত্ত্বে বলা হয়েছে, সমাজে যখনই অন্যায় ও অসুরের অত্যাচার বেড়েছে, মা কালী তখনই সংহার রূপ ধারণ করে দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন করেছেন। আমাদের শাসনব্যবস্থায় পুলিশের ভূমিকাও ঠিক একই রকম—সমাজ থেকে অপরাধ, অন্যায় দূর করে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা। উদ্দেশ্যটি পুলিশ ও কালীর মধ্যে একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক যোগসূত্র তৈরি করেছে। পুলিশের কালীভক্তির আর একটি উদ্দেশ্য হল, দুষ্টের দমন করতে গিয়ে নিজেকে রক্ষা করা। মা কালীর বিভিন্ন রূপের মধ্যে ‘রক্ষাকালী’ রূপটি আপদ-বিপদ থেকে সুরক্ষার প্রতীক। পুলিশও দিনরাত সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে অতন্দ্র প্রহরী হয়ে কাজ করে। রাত বিরেতে অভিযান কিংবা টহলদারির সময় সাহস জোগাতে পারেন একমাত্র রক্ষাকালী। তাই  মা কালীর সঙ্গে যুগ যুগ ধরে পুলিশের আধ্যাত্মিক ও আত্মিক যোগ ক্রমেই নিবিড় হয়েছে। 
শেষ করি কলকাতা পুলিশের উচ্চপদস্থ এক কর্তার কালী-কথা দিয়ে। তখন ভরা বাম-শাসন। সালটা সম্ভবত ২০০১। তৎকালীন ডিসি (নর্থ) ছিলেন ওই পুলিশকর্তা। এমনই এক কালীপুজোর প্রাক্কালে ঘরোয়া আড্ডায় তিনি বলেছিলেন, কালী এবং পুলিশ—দু’টি এমনই প্রাণী যাঁরা রাতে সবসময় ওঁত পেতে থাকেন। আর আমাদের দু’জন ছাড়া রাতে শ্মশানঘাটের মতো জায়গায় কে-ই বা যাতায়াত করেন? অতঃপর, আজ নতুন করে থানায় থানায় কালী উপাসনার নিদান দিয়ে এই নিবিড় যোগকে তুলে ধরারই চেষ্টা হল।