হঠযোগীর ধ্যেয় জ্যোতি এবং লয়যোগীর ধ্যেয় বিন্দু
  • ৯ নভেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

নাদের দেহই হইল জ্যোতি ও বিন্দু। হঠযোগীর ধ্যেয় জ্যোতি এবং লয়যোগীর ধ্যেয় বিন্দু। এ বিন্দুদর্শনের জন্য চেষ্টা করিতে হয় না। নাদ শুনিতে শুনিতে সুক্ষ্মাতিসূক্ষত্র বিন্দু স্বয়ং আবির্ভূত হন, পুস্তকাদি পাঠকালে বা লিখিবার সময়ও সে বিন্দু বাহিরে দৃষ্টিগোচর হয়—এত সুক্ষ তাহা বর্ণনা করা যায় না, কিন্তু দেখা যায়। নির্বাণ-শ্রুতিতে কথিত হইয়াছে—‘শ্মশানে অনাহতাঙ্গী।’ শ্মশান শব্দের অর্থ সুষুম্না। অনাহত মন্ত্র। অনাহতনাদই যতির শেষ সম্বল, তিনিই যতিকে পরম পদ দান করেন। মণ্ডলব্রাহ্মণ-শ্রুতিতে জ্যোতি আকাশ প্রভৃতি কথিত হইয়াছে।

Advertisement

শিষ্য। জ্যোতির কথা কি বলিয়াছেন?
গুরু। ভীষণ সংসার-সাগর হইতে উত্তীর্ণ হইবার জন্য সূক্ষ্মমার্গ অবলম্বন করিয়া-সত্ত্বাদিগুণানতিক্রম্য তারকমবলোকয়েৎ। ভ্রমধ্যে সচ্চিদানন্দ-তেজঃকূটরূপং তারকং ব্রহ্ম।
সত্ত্বাদিগুণ অতিক্রম করত তারক অবলোকন করিবে। ভ্রূমধ্যে সচ্চিদানন্দ তেজগিরিশৃঙ্গবৎ নিশ্চল—তাহাই তারকব্রহ্ম। মূলাধার হইতে ব্রহ্মরন্ধ্র পর্য্যন্ত সূৰ্য্যসদৃশপ্রভাবিশিষ্টা তন্মধ্যে মৃণালতন্তুসূক্ষ্মা জ্যোতির্ময়ী কুণ্ডলিনী। যে স্থানে তমোনিবৃত্তি,—তাহার দর্শনে সর্ব্বপাপের নিবৃত্তি হইয়া থাকে। অন্তর্লক্ষ্য সুষুম্না প্রভৃতি, বহিল'ক্ষ্য নাসাগ্রে জ্যোতিদর্শন। মস্তকের উপর দ্বাদশাঙ্গুলি পরিমাণ জ্যোতিদর্শনে অমৃতত্ব লাভ। মধ্যলক্ষ্য আকাশাদির কথা বলিয়াছেন।
মুত্তি অমূর্ত্তি ভেদে তারক দুই প্রকার—যাহা ইন্দ্রিয়ান্ত তাহা মুত্তি-তারক, যাহা ভ্রুযুগাতীত তাহা অমুর্ত্তি তারক। অমা, পূর্ণিমা, প্রতিপৎ-তিন প্রকার দৃষ্টির কথা উল্লেখ করিয়াছেন। নিমীলিত দৃষ্টি অমাদৃষ্টি, অর্দ্ধোন্মীলিত প্রতিপৎ, সর্ব্বোল্মীলন পূর্ণিমা। পূর্ণিমা অভ্যাস করা কর্ত্তব্য—তাহার লক্ষ্য নাসাগ্র।
শিষ্য। জ্যোতির স্বরূপ কি?
গুরু। তদা পশ্চিমাভিমুখ প্রকাশঃ স্ফটিক-ধুম্র-বিন্দু নাদ-কলা-নক্ষত্র-খদ্যোত-দীপ-নেত্র-সবর্ণ নবরত্নাদিপ্রভা দৃশ্যন্তে। তদেব প্রণবস্বরূপম্।
তখন মেরুদণ্ডস্থিত সুষুম্নার স্ফটিকমণি (কাচ) ধুম্রবিন্দু (চন্দ্রকলার ন্যায় জ্যোতি) নাদ (“দীপশিখাবৎ জ্যোতিঃ”) কলা (“বিদ্যুদ্‌রেখাবৎ জ্যোতিঃ”) নক্ষত্র জোনাকী দীপনের সুবর্ণ নবরত্ন প্রভৃতি আকারের জ্যোতি দেখা যায়—তাহাই প্রণবের স্বরূপ। ষন্মুখীকরণ-মুদ্রার দ্বারা অর্থাৎ দুই করাঙ্গুলির দ্বারা কর্ণরন্ধ্র নিরোধপূর্বক প্রণবধ্বনি শুনিবার কথাও বলিয়াছেন।
শিষ্য। প্রণব জ্যোতি নাদ—ইঁহারা তো অভিন্ন পদার্থ?
গুরু। নিশ্চয়, তবে কোন কোন সাধক অগ্রে জ্যোতি, পরে নাদ প্রাপ্ত হন। কেহ বা অগ্রে নাদ লাভ করেন। জ্যোতি যে নাদের রূপ—একথা মনে আছে তো?
শ্রীগুরুপ্রকাশন থেকে প্রকাশিত ‘শ্রী ওঙ্কারনাথ-রচনাবলী’ থেকে