প্রীতম দাশগুপ্ত: এ এক মজার সরকার। একটা সময় ছিল যখন জন্ম থেকে মৃত্যু— প্রতিটি কাজে বলা হত ‘আধার’ মাস্ট। আধার না থাকলে জীবনটাই ছিল আঁধার। সরকার রেশন কার্ড, ভোটার কার্ড, প্যান, ড্রাইভিং লাইসেন্স বা পাসপোর্টের মতো একাধিক পরিচয়পত্রকে স্বীকৃতি দিলে কী হবে! আধার না থাকলে কোনো কাজই হত না। আপনি ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলতে যান, আধার লাগবে। মোবাইলের সিম কিনুন, আধার লাগবে। টাকা সরাসরি ট্রান্সফার করবেন? আধার লাগবে। গ্যাসের ভরতুকি নেবেন। আধার লাগবে। সরকারি প্রকল্পের সুবিধা নিতে চান, আধার লাগবে। এমনকি আপনার সন্তানের পড়ার খরচের বৃত্তি বা লোনের জন্যও আধার লাগবে। এতদিন পরে হঠাৎ করে সরকার ভাবতে শুরু করেছে, আধার তেমন একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। ওয়ান ফাইন মর্নিং কেন্দ্রীয় পঞ্চায়েতি রাজ, মৎস্য ও পশুপালনমন্ত্রী রাজীব রঞ্জন সিং ওরফে লালন সিংয়ের মনে হয়েছে, আধার রাস্তার মোড়ে মোড়ে পাঁচ মিনিটে তৈরি করা যায়। এত জাল আধার তৈরি হচ্ছে যে, সরকারি সুবিধাপ্রাপক আদৌ সঠিক কি না, তা বোঝা যাচ্ছে না। তাই এবার থেকে ভোটার কার্ড বা বায়োমেট্রিক দেখে সরকারি সুবিধা দেওয়া হবে। অর্থাৎ, এবার আধার কার্ড থাকলেই সরকারের কল্যাণমূলক প্রকল্পগুলির আর্থিক সুবিধা মিলবে না। দরকার ভোটার কার্ড।
শুনলে মনে হবে, এ আর কী আছে? নীতির পরিবর্তন তো হতেই পারে। এমন তো নয় যে, কোনো নীতি নিলে সেটাকেই আজীবন চালাতে হবে। সরকারের কাজই তো প্রতিনিয়ত নীতির পর্যালোচনা করা। যদি দেখা যায়, কোনো নীতি গ্রহণযোগ্য নয়, তবে তা পালটানো হবে। কিন্তু সবটাই যদি এত সরলরৈখিক পথে চলত, তবে আলোচনার কিছুই থাকত না। লালন সিংয়ের মন্তব্য শোনার পর ফেলুদা থাকলে নিশ্চিতভাবেই বলত, ‘আর নিশ্চিন্তে থাকা যাচ্ছে না রে তোপসে।’ আসলে আধারকে সরিয়ে ভোটার কার্ডকে কল্যাণমূলক প্রকল্পের প্রবেশদ্বার করার পিছনে একটি গভীর রাজনৈতিক অভিসন্ধি রয়েছে। সেটা কী জানতে গেলে সবার আগে বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটকে দেখতে হবে।
কারণ, সময়টাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আসলে মন্ত্রিমশাই যখন ভোটার কার্ডের গুরুত্বের কথা বলছেন, তখন দেশজুড়ে চলছে এসআইআর। ইতিমধ্যেই দেশজুড়ে প্রায় ১৪ কোটি ভোটারের নাম বাদ চলে গিয়েছে। স্রেফ বাংলাতেই বাদ গিয়েছে প্রায় ৬০ লক্ষ নাম। এর মধ্যে ৭০ শতাংশই গ্রামীণ এলাকার বাসিন্দা। সোজা কথায়, কেন্দ্র পঞ্চায়েত স্তরে ভোটার কার্ডের ভিত্তিতে পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু করলে, বাংলার প্রায় ৪১ লক্ষ মানুষ সরকারি প্রকল্পের টাকা পাওয়ার অধিকার হারাবেন। এটা শুধু বাংলার নয়, সারা দেশেরই প্রান্তিক মানুষের ‘ভাত’ মারার ছক। কমিশনের আইটি বিভাগের ডিরেক্টর জেনারেল সীমা খান্নাকে দিয়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার শ্রীযুক্ত জ্ঞানেশ কুমার ভোটারদের নাম প্রথমে কাটছেন। তারপর মন্ত্রী ঘোষণা করছেন, ভোটার তালিকায় নাম না থাকলে কোনো সরকারি সুবিধা মিলবে না। তাহলে কি বিষয়টি এতই সরল থাকল? আপনার নাম ভোটার তালিকায় নেই, মানে আপনি শুধু ভোটার নন এমনটা নয়। আপনি রেশন হারাচ্ছেন, পেনশন পাচ্ছেন না, পিএম-কিষান গেল, আবাস মিলল না। মানে আপনার সামাজিক সুবিধার প্রতিটি ক্ষেত্রই আজ প্রশ্নের মুখে পড়ে গেল। অথচ সুপ্রিম কোর্ট গত আগস্টেই বলেছিল, এসআইআর-এ নাম বাদ যাওয়া মানে নাগরিকত্ব যাওয়া নয়। নাম না থাকলেই সামাজিক প্রকল্পের সুবিধা থেকে আপনাকে সরকার বঞ্চিত করতে পারবে না।
আধার বাধ্যতামূলক করার বিরোধিতায় সুপ্রিম কোর্টেও মামলা হয়েছিল। শীর্ষ আদালতের বিচারপতিরা যখন প্রশ্ন করেছিলেন, আধার কী নিশ্ছিদ্র? নিরাপত্তার কোনো খামতি কোথাও থাকবে না তো? কেন্দ্র রীতিমতো হলফনামা দিয়ে বলেছিল, সবটাই ফুলপ্রুফ। কোথাও কোনো গলদ নেই। তাহলে এতদিন পরে যখন সরকারের মন্ত্রী বলছেন, আধার মোটেও সুরক্ষিত নয়, তখন সেটা নীতির দেউলিয়াপনা বলে থেমে থাকলে চলবে না। এটা তো আম আদমির ব্যাক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের শামিল। এতো রীতিমতো অস্বস্তিকর বিষয়। আধার যদি এতটাই অনির্ভরযোগ্য হয়, তবে গত এক দশকে হাজার হাজার কোটি টাকার আর্থিক লেনদেন এবং কোটি কোটি মানুষের বায়োমেট্রিক তথ্য কোন ভরসায় পরিচালিত হলো?
এরপরও হয়তো ভাবতে পারেন, আপনার নাম তো তালিকায় আছে। কিন্তু কে বলতে পারে, কমিশনের ওই ‘ম্যাজিক’ সফটওয়্যার কবে আপনার নামটাও বাদ দিয়ে দেবে। সীমা খান্না তো স্রেফ একটা নাম। সীমা যাবেন, নীতি তো যাবে না। চক্রান্ত তো বন্ধ হবে না। তাই কালকে আপনার নামও নতুন ঘ্যাঁচাকলে বাদ পড়ে গেলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। তখন দৌড়াতে হবে নিজেকে নাগরিক প্রমাণ করতে। পেটের ভাতে তখন আপনারও টান পড়বে। আপনি জানতেও পারবেন না কখন আপনার ভাতের থালাটাই কেড়ে নেওয়া হয়েছে। বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী তাই সঠিকভাবেই বলেছেন,এটাকে বলে ‘হক চুরি’। ‘নাম কাটা গেল—ভোট গেল। আর ভোট গেল তো, বেঁচে থাকার অধিকার (হক) গেল।’
বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র ভারতবর্ষ। সেই গণতন্ত্রে এর চেয়ে বড়ো ট্র্যাজেডি আর কী হতে পারে? মানে এতদিন মানুষ সরকার ঠিক করত। ক্ষমতায় কে বসবেন, সেটা ঠিক করত জনগণ। রাহুলের দল জিতবে নাকি মোদির দল, সেটা ঠিক করার অধিকার ছিল জনগণের। এখন হিসাব উলটে গেল। এবার মানুষ আর সরকার নির্বাচন করবে না। বরং সরকারই বেছে নেবে তার অনুগত নাগরিকদের। অর্থাৎ জনগণ ঠিক করার অধিকার এখন সরকারের হাতে। যাঁরা সরকারের নীতির বিরোধিতা করবেন অথবা সরকারের দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দেবেন, তাঁদের নাম তালিকা থেকে ছেঁটে দেওয়া হবে। তাঁদের কার্যত ‘অদৃশ্য নাগরিক’ বানিয়ে দেওয়া হবে। আজ পঞ্চায়েতি রাজের প্রকল্প দিয়ে এটা শুরু হচ্ছে। কাল এই নীতি রেশন, ১০০ দিনের কাজ, বিধবা ভাতা, কিংবা চিকিৎসার ক্ষেত্রেও প্রয়োগ হবে, এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। সেক্ষেত্রে দেশের কোটি কোটি দরিদ্র মানুষ সরকারি সহায়তা থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বেন। আমাদের সংবিধানেই বেঁচে থাকার অধিকার দেওয়া হয়েছে। সেই অধিকার এখন নির্বাচনি নথির মুখাপেক্ষী হয়ে যাচ্ছে। ভোটার কার্ডের উপর নির্ভর করছে আপনার ভাত পাওয়ার অধিকার থাকবে কি না। আপনার যেটা হক ছিল, সেটা এখন কমিশনের ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল হয়ে যাচ্ছে। তাও যদি কমিশন প্রকৃত অর্থে স্বশাসিত ও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করত, তাহলে হয়তো এত কথা উঠত না। কিন্তু কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়েই তো সবচেয়ে বড়ো প্রশ্ন উঠছে। মুখ্য কমিশনারের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন স্বয়ং অন্য দুই কমিশনার। এহেন সময়ে যদি এটা বলা যায়, সরকার যাঁরা চালাচ্ছেন, সেই মোদি-শাহই ঠিক করে দিচ্ছেন আপনার নাগরিক থাকার পূর্বশর্ত, তাহলে সেটা কি খুব একটা ভুল বলা হবে? আসলে এমন একটি ভোটার তালিকা তৈরির চেষ্টা চলছে, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিজেপির পক্ষেই থাকবে। আর সেই তালিকাই ঠিক করবে আপনি সরকারি প্রকল্পের টাকা পাবেন কি না।
বিরোধীরা এই প্রস্তাবকে কেন ‘পিছন দরজার এনআরসি’ চালুর ছক বলছেন, তা বোঝা খুব একটা কঠিন নয়। গোটা দেশে আনুষ্ঠানিক এনআরসি চালু করতে গিয়ে প্রবল গণবিক্ষোভের মুখে পড়তে হয়েছিল শাসকদলকে। ফলে সেই কাজ থমকে গিয়েছে। তাই আমলাতান্ত্রিক চোরাগলি দিয়ে সেই লক্ষ্য পূরণের এক অলিখিত রূপরেখা তৈরি হচ্ছে। সরকার এমন একটা শ্রেণি তৈরি করতে চাইছে, যাঁদের নাগরিকের সমানাধিকার নেই। এটাই ঘুরিয়ে এনআরসি চালুর প্রয়াস। এটাকে সাধারণ কোনো আমলাতান্ত্রিক প্রয়াস হিসাবে দেখলে ভুল হবে। আসলে এটা সাংবিধানিক কাঠামো ব্যবহার করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার খেলা।
আপনার বয়স ১৮ হয়েছে। ভোটাধিকার আপনার একটি পবিত্র অধিকার। এর জন্য আপনাকে একটি কার্ড দেওয়া হয়েছে। এটি ভোটার কার্ড। কোনো সরকারি প্রকল্পের কার্ড নয়। তাই এই কার্ড থাকা বা না থাকা কোনো সরকারি অনুদান পাওয়ার পূর্বশর্ত হতে পারে না। কল্যাণকর রাষ্ট্রের তো একটা ভিত্তি আছে। কল্যাণকর রাষ্ট্রে সরকার নাগরিকের রাজনৈতিক আনুগত্য বা ভোটার তালিকায় তাঁর উপস্থিতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারে? যদি রাষ্ট্র ঠিক করে বেঁচে থাকার ন্যূনতম সুযোগ পেতে গেলে আপনাকে বশংবদ হতে হবে, পুরোপুরি সরকারের অনুগত হতে হবে, তাহলে কল্যাণকামী রাষ্ট্রের ভিত্তিটাই চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। এটাকে কল্যাণমূলক সংস্কার বলা যাবে না। বরং এটি ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার এক স্থায়ী ও বিপজ্জনক দিক।
ভোট দেওয়া আর ভাত পাওয়া—এই দুইয়ের মধ্যে অযৌক্তিক এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রাচীর তুলে দেওয়ার এই প্রবণতাকে এখনই সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিরোধ করা প্রয়োজন। দেশের নাগরিক
সমাজ, বিরোধী শক্তি এবং বিচারব্যবস্থার অবিলম্বে এই অসাংবিধানিক ও জনবিরোধী ভাবনার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো উচিত। অন্যথায়, যে রাষ্ট্রের ভিত্তি ছিল প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার, তা অচিরেই পরিণত হবে নির্বাচিত কিছু ‘অনুমোদিত’ মানুষের সুবিধাবাদে।



