মৃণালকান্তি দাস: যে কোনও ইস্যুতে কূটনৈতিক ফায়দা তোলার অপেক্ষায় থাকে ইসলামাবাদ। ৯ সেপ্টেম্বর কাতারে ইজরায়েলের বোমাবর্ষণ আবার সেই সুযোগ করে দিয়েছে। আরব দুনিয়ায় নিজের ‘ইসলামিক ভ্রাতৃত্ববোধ’ দেখাতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন পাক প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ।
মৃণালকান্তি দাস: যে কোনও ইস্যুতে কূটনৈতিক ফায়দা তোলার অপেক্ষায় থাকে ইসলামাবাদ। ৯ সেপ্টেম্বর কাতারে ইজরায়েলের বোমাবর্ষণ আবার সেই সুযোগ করে দিয়েছে। আরব দুনিয়ায় নিজের ‘ইসলামিক ভ্রাতৃত্ববোধ’ দেখাতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন পাক প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ।
৯ সেপ্টেম্বর হামাস নেতাদের টার্গেট করে ইজরায়েলের বিমানবাহিনীর বোমাবর্ষণে কেঁপে উঠেছিল কাতারের রাজধানী দোহা। মাত্র ৭২ ঘণ্টার মধ্যে আরও কয়েকটি দেশে হামলা চালায় ইজরায়েল। সেই তালিকায় ছিল পশ্চিম এশিয়ার লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন এবং উত্তর আফ্রিকার তিউনিশিয়া। একইসঙ্গে প্যালেস্টাইনের গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ চালায় তেল আভিভের সেনাবাহিনী। এই পরিস্থিতিতে ইজরায়েলি ‘আগ্রাসন’ ঠেকাতে এককাট্টা হয়ে ওঠে আরব দুনিয়া। গত ১৫ সেপ্টেম্বর মুসলিম দেশগুলির মহাসম্মেলনের আয়োজন করে উপসাগরীয় দেশ কাতার। সংশ্লিষ্ট বৈঠকে ওঠে ন্যাটোর আদলে ‘ইসলামিক সামরিক জোট’ তৈরির প্রসঙ্গ। ন্যাটো এমন সামরিক জোট, যেখানে কোনও সদস্যের উপর আক্রমণ বা হামলাকে জোটের উপর হামলা হিসেবে দেখা হয়। আর এর প্রস্তাবক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘ব্যবসায়িক মিত্র’ ইসলামাবাদ।
সংবাদসংস্থা আল জাজিরার দাবি, দোহার সম্মেলনে ‘ইহুদি সন্ত্রাসবাদ’ দমন এবং শহরে যুদ্ধে পারদর্শী বাহিনী তৈরির প্রস্তাবও দিয়েছে কয়েকটি মুসলিম দেশ। কেউ কেউ আবার চাইছেন ‘অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কান্ট্রিজ’ বা ওআইসি সংগঠনের ছত্রছায়ায় থাকা একটি সামরিক বাহিনী। এই গোষ্ঠীতে রয়েছে মোট ৫৭টি মুসলিম দেশ। তবে এই ব্যাপারে সবাই একমত নয়। গোটা বিষয়টিতে ইরানের ভূমিকা কী হবে, তা নিয়েও ধোঁয়াশা রয়েছে। ইহুদিদের পাশাপাশি ইরানের সঙ্গেও আরব দেশগুলির সম্পর্ক ‘সাপে-নেউলে’। কারণ, তেহরান মূলত শিয়া ধর্মাবলম্বী। আর তাই এতদিন সাবেক পারস্য দেশকে শত্রু হিসেবে দেখে এসেছে কট্টর সুন্নিপন্থী সৌদি আরব-সহ পশ্চিম এশিয়ার অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্র। ইসলামিক দেশগুলি বহু বার নানা কারণে ইরানের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে। এ ছাড়া ইন্দোনেশিয়া এবং পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকার মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলির ইজরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক আরব রাষ্ট্রগুলির মতো আদায় কাঁচকলায় নয়।
ওআইসির সদস্য হওয়া সত্ত্বেও আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে রয়েছে দীর্ঘ সীমান্ত বিবাদ। কাবুল এবং ইসলামাবাদের সম্পর্কও মোটেই মধুর নয়। অনেকের মতে, আরব-ইসলামিকও যদি এ ধরনের কোনও জোট তৈরি করে, তবে তা থেকে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করবে পাকিস্তান। কাশ্মীর সমস্যা বা পাকিস্তানের মাটিতে জঙ্গিদমনের মতো ভারতের পদক্ষেপকে ‘হামলা’ হিসাবে আন্তর্জাতিক মহলে তুলে ধরার চেষ্টা অব্যাহত রাখবে ইসলামাবাদ। এ ছাড়াও, তেল আভিভের সঙ্গে নয়াদিল্লির সুসম্পর্ক বজায় রাখার পদক্ষেপকে ভারতের বিরুদ্ধেই কাজে লাগানোর চেষ্টা চালাতে পারে ইসলামাবাদ, এমন আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছে না ওয়াকিবহাল মহল। এত জটিলতার মধ্যে শেষ পর্যন্ত মুসলিম রাষ্ট্রগুলি আদৌ ‘আরব ন্যাটো’ তৈরি করতে পারে কি না সেটাই প্রশ্ন!
তবে ‘আরব ন্যাটো’ নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও, সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি সেরে ফেলেছে পরমাণু শক্তিধর পাকিস্তান। চুক্তির পর দু’পক্ষের তরফে জানানো হয়েছে, কোনও এক পক্ষের উপর হামলা হলে তা উভয়ের উপর আঘাত হিসাবেই ধরা হবে। চুক্তির ভাষা দেখলে মনে হতেই পারে, অনেকটা ন্যাটোর মতো। রিয়াধ এবং ইসলামাবাদের এই কাছাকাছি আসা নতুন কোনও অক্ষ তৈরির সম্ভাবনা উস্কে দিচ্ছে কি না, তা নিয়ে জল্পনা ছড়িয়েছে। এই প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে হিসেব–নিকেশ শুরু করেছে তিন রাজধানী— ওয়াশিংটন, তেল আভিভ ও তেহরান। কারণ, পাকিস্তান তার পরমাণু ছাতা সৌদি আরব পর্যন্ত সম্প্রসারণের ইঙ্গিত দিয়েছে। ১৯৭০-এর দশকে সৌদি আরব গোপনে পাকিস্তানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে অর্থ ঢেলেছিল। সেটা ছিল ইরানি বিপ্লব ও আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসনের প্রতিক্রিয়ায় নেওয়া পদক্ষেপ। সেই নিরাপত্তা বিনিয়োগের ফল এখন ফলতে শুরু করছে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি আটকাতে গিয়ে পারমাণবিক ক্ষমতা বিস্তারের নতুন ফ্রন্ট খুলে ফেলেছে আমেরিকা-ইজরায়েল।
এটা সেই ধ্রুপদি উদাহরণ, যাকে প্রয়াত হেনরি কিসিঞ্জার ‘পারমাণবিক বিস্তারের প্যারাডক্স’ বলেছিলেন। তাঁর মতে, ‘পারমাণবিক বিস্তার রোধ করার চেষ্টা অনেক সময় এমন অস্থিরতা তৈরি করে, যা শেষ পর্যন্ত বিস্তারের সম্ভবনাকে আরও দ্রুত বাড়িয়ে দেয়।’ ইসলামাবাদের কাছে শুধু পারমাণবিক বোমা আছে তা নয়, আছে আব্দুল কাদির খানের সেই ভয়ঙ্কর উত্তরাধিকারও। যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কীভাবে একসময় পারমাণবিক তথ্য সীমান্ত পার হয়ে বিক্রি হতো। যদিও এখনও পাকিস্তান দাবি করে, পারমাণবিক কর্মসূচির উপর তাদের কঠোর নিয়ন্ত্রণ আছে। কিন্তু পাকিস্তানের সেই ইতিহাস বিশ্বাসঘাতকতার! সৌদি আরবে তাদের সামরিক সহযোগিতা শেষ পর্যন্ত গোপনে পারমাণবিক সহযোগিতায় রূপান্তর হতে পারে। এই আশঙ্কাই সবচেয়ে বেশি। আর ইরানের দোহাই দিয়ে সৌদিও চাইবে পারমাণবিক ক্ষমতায় শক্তিশালী হতে!
অন্যদিকে রিয়াধের সাহায্য পেলে, সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতিতে কোনও জ্বালানি সঙ্কটেও পড়তে হবে না ইসলামাবাদকে। পশ্চিম এশিয়ায় আমেরিকার অন্যতম নির্ভরযোগ্য মিত্র সৌদির হাতে বিপুল অত্যাধুনিক মার্কিন ও ইউরোপীয় যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। যা পাকিস্তানের হাতে এলে উপমহাদেশে সামরিক ভারসাম্যে বিঘ্ন ঘটতে পারে। এই প্রসঙ্গে ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল স্পষ্ট বার্তা দিয়ে বলেছেন, ‘ভারত এবং সৌদি আরবের মধ্যে একটি বিস্তৃত কৌশলগত অংশীদারিত্ব রয়েছে, যা গত কয়েক বছরে যথেষ্ট গভীর হয়েছে। আমরা আশা করব, এই কৌশলগত অংশীদারির বিষয়টি পারস্পরিক স্বার্থ এবং সংবেদনশীলতার দিকগুলি নজরে রাখবে।’
প্রশ্ন হল, ভারতের সঙ্গে ভবিষ্যতের কোনও যুদ্ধে সৌদি আরব কি পাকিস্তানকে সরাসরি সাহায্য করতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তরের শুরুতেই মনে রাখা জরুরি, মুসলিম বিদ্বেষের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান দিয়েছিল এই সৌদি সরকার। শুধুমাত্র ২০২৪ সালেই সৌদি আরব ভারত থেকে ২২৫ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র কিনেছে। সৌদিদের দ্বিতীয় প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার দেশ ভারত। সৌদিতে বসবাস করা ভারতীয়র সংখ্যা প্রায় ২৭ লাখ। এ রকম আরও তথ্য দেওয়া যায়, যা ভারত-সৌদি আরব সম্পর্কের গভীরতার কথা স্পষ্ট হয়।
অন্যদিকে বহুকাল ধরে সৌদি আরবের সামরিক বাহিনীকে পাকিস্তানই মূলত প্রশিক্ষণ দেয়। সশস্ত্র বাহিনীর দক্ষতা ও আকারে সৌদি আরবের চেয়ে তারা অনেক এগিয়ে। কিন্তু ইয়েমেনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ যুদ্ধে পাকিস্তানসহ অনেক শক্তির সহযোগিতা সত্ত্বেও সৌদিরা প্রত্যাশিত জয় পায়নি। পিছু হঠতে হয়েছে। তবে চাইলে সামরিক বাজেটে সৌদি আরব পাকিস্তানকে সাহায্য করতে পারে। ফলে নয়া প্রতিরক্ষা চুক্তি এই অর্থে পাকিস্তানের জন্য লাভজনক হতে পারে, যদি সৌদি আরব বড় অঙ্কের অর্থ দিয়ে সাহায্য করে। এর বাইরে এই চুক্তি বরং ভবিষ্যতে সৌদি আরবের নিরাপত্তায় পাকিস্তানের বাড়তি ভূমিকার ইঙ্গিত দেয়। আরব দেশগুলিতে ইজরায়েলের লাগামহীন আগ্রাসনের মুখে পারমাণবিক শক্তিধর একটি দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করে সৌদি আরব নিজের ভরসার পরিসর বরং কিছুটা বাড়িয়েছে। এতে ইজরায়েলের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক খারাপেরও ঝুঁকি আছে। বিশেষ করে পাকিস্তান তার পারমাণবিক অস্ত্র দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে ছায়া বিস্তারের চেষ্টা করলে সেটা ইজরায়েল সহজভাবে নেবে না। প্রশ্ন হল, পাকিস্তান মধ্যপ্রাচ্যে সেই রকম ভূমিকা রাখবে কি না? দ্বিতীয় প্রশ্ন হল, এই চুক্তি কি তবে সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের স্বার্থেই? সেক্ষেত্রে পাকিস্তান শুধুমাত্র ‘ভাড়াটে সেনা’ জোগানের কাজ করে যাবে? পাকিস্তানের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও আরব দেশগুলির মধ্যে যথেষ্ট আপত্তি রয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, টাস্ক ফোর্স তৈরির নামে বিদেশের মাটিতে সন্ত্রাসবাদী সংগঠন তৈরি করতে পারে ইসলামাবাদ, যার কুপ্রভাবে নষ্ট হতে পারে অপরিশোধিত খনিজ তেলের ব্যবসা। তা ছাড়া কট্টরপন্থা বৃদ্ধি পাওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি, এতে সম্পর্ক খারাপ হতে পারে ভারতের সঙ্গে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি এবং বাহরিন তা করতে নারাজ।
অনেকে অবশ্য মনে করছেন, ভারত নয়, বরং পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে আসলে ইজরায়েলকে বার্তা দিতে চাইল সৌদি। পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলির মধ্যে একমাত্র ইজরায়েল পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী। পরমাণু অস্ত্রধর পাকিস্তানকে চুক্তিতে বেঁধে নিয়ে শক্তি বাড়ল সৌদি আরবের। দীর্ঘদিন ধরে অঘোষিত পারমাণবিক শক্তিধর ইজরায়েলের জন্য এটা বড় চ্যালেঞ্জ। পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্র বা তার নিয়ন্ত্রণ যদি আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীর হাতে চলে যায়, তাহলে শক্তির ভারসাম্য পুরোপুরি বদলে যাবে। ইরানের জন্য বার্তাটি আরও স্পষ্ট— তেহরান একে অস্তিত্বগত হুমকি হিসেবে দেখবে এবং মনে করবে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য তার বিপক্ষে চলে গিয়েছে। ফলে তারা দ্রুত নিজস্ব পারমাণবিক কর্মসূচি ত্বরান্বিত করতে চাইবে। এবং বিপজ্জনক অস্ত্র প্রতিযেগিতা শুরু হতে পারে। এই কৌশলগত পরিবর্তনের কারণেই আমেরিকা এখন কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, জন্মলগ্ন থেকেই ইজরায়েলকে আগলে রেখেছে আমেরিকা। পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন আধিপত্য বজায় রাখতে ইহুদি রাষ্ট্রটিকে কোনও অবস্থাতেই দুর্বল হতে দিতে নারাজ আমেরিকা। ফলে ‘আরব ন্যাটো’র প্রস্তাবে জল ঢালতে ওয়াশিংটন যে সর্বশক্তি প্রয়োগ করবে, তা সময়ের অপেক্ষা। এক্ষেত্রে সবচেয়ে লম্ফঝম্ফ করছে যে দেশ, সেই পাকিস্তান নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের অবস্থান কী হবে? তবে কি ফের আরব দুনিয়ায় পরমাণু তথ্য বেচা শুরু করবে ইসলামাবাদ? পরমাণু অস্ত্র সম্ভার নিয়ে পাকিস্তানের এই জুয়া খেলাকে রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিয়ন্ত্রণাধীন ‘ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি এজেন্সি’ বা আইএইএ কী চোখে দেখছে?
এসব প্রশ্নে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাকে এখনই চেপে ধরার সুযোগ সাউথ ব্লক কি হাতছাড়া করবে?