নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ছ’বছরের বেশি সময় ধরে স্কুলে পড়িয়ে এখন তাঁরা নিঃস্ব! বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর শহিদ মিনারের সামনে কান্নায় ভেঙে পড়লেন চাকরিহারা শিক্ষকরা। তাঁদের দাবি, যোগ্যতার সমস্ত প্রমাণ দিয়ে বৈধভাবেই তাঁরা চাকরি পেয়েছিলেন। তবুও চাকরি গেল! হাহাকারের মধ্যেই চাকরিহারাদের একাংশ দুষছে আইনজীবী তথা সিপিএম সাংসদ বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যকে। কারও মনে প্রশ্ন, ‘আবার পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে হবে। পারব তো!’ কারও কণ্ঠে শুধুই অসহায় আর্তনাদ— ‘কী করব, কিছুই বুঝতে পারছি না। সংসারের দায়িত্ব কে নেবে? বেঁচে থেকেই বা কী হবে!’
শহিদ মিনারের সামনে সদ্য চাকরিহারা এক শিক্ষকের ফোন এল। অপর প্রান্তে তাঁর মা। যুবক বলছেন, ‘মা, তুমি চিন্তা করো না। আমি কোনও অন্যায় করে চাকরি পাইনি।’ সোনারপুরের বাসিন্দা প্রতাপ রায়চৌধুরী বলছিলেন, ‘সুপ্রিম কোর্ট তো আমাদের মাইনে ফেরত চাইছে না। তার মানে আমরা দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত নই। তাহলে আমাদের চাকরি কেন গেল? কোন মুখে বাড়ি যাব বুঝতে পারছি না।’ পাশ থেকে আর একজন চাকরিহারা বলে উঠলেন, ‘বিকাশবাবুই এসব করালেন। উনি প্রথম থেকে পুরো প্যানেল বাতিলের কথা বলে গিয়েছেন।’ আশপাশের কয়েকজন তাঁকে সান্ত্বনা দিতে এগিয়ে এলেন। সোনারপুরের বাসিন্দা ইল্লাজুল রহমান চাকরি হারিয়েছেন। ধরা গলায় বলছিলেন, ‘প্রাইমারিতে চাকরি করতে করতে হাইস্কুলে চাকরি পেয়েছিলাম। আজ আমরাই ২৬-এর নির্বাচনের ইস্যু হয়ে গেলাম! আবার চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখন হয়তো অনেকে বলছেন না। আর ক’দিন পর জানা যাবে, কারও হয়তো ব্যাঙ্ক লোনের ইএমআই চলছে। কারও বাড়িতে অসুস্থ বাবা-মা। কীভাবে সবটা তাঁরা সামলে উঠবেন, কে জানে!’ চাকরিহারানো শিক্ষকরা দুপুরের দিকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাংবাদিক সম্মেলনের চোখ রেখেছিলেন। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য শোনার পর উত্তর ২৪ পরগনার বাসিন্দা সাহানি নাজনিন বলেন, ‘উনি ৭ তারিখ আমাদের ডেকেছেন। আমরা যাব। উনি কী বলেন, আমরা শুনতে চাই। আমাদের অনেকেই এখন দিল্লিতে রয়েছে। তারা এলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’ সদ্য চাকরিহারা শিক্ষকরা উচ্চ মাধ্যমিকের খাতা দেখা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। ইল্লাজুল বলছিলেন, ‘আমাদের হাতে এখন উচ্চ মাধ্যমিকের খাতা আছে। সেগুলো নিয়ে আমরা কী করব, তাও জানি না।’
এই পরিস্থিতির জন্য তাঁকে দায়ী করার প্রতিক্রিয়ায় সিপিএম সাংসদ বিকাশবাবু বলেন, ‘আমাকে যাঁরা দোষারোপ করছেন, তাঁরা আসলে অজ্ঞতার শিকার। দুর্নীতিকারীরা নিজেদের আড়াল করার জন্য আমার বিরুদ্ধে বলার চেষ্টা করছেন। আমি মামলাকারীও নই, প্রতিপক্ষও নই। আমি বঞ্চিত প্রার্থীদের হয়ে সওয়াল করেছি। সংবাবিধানের মর্যাদা রক্ষার কথা বলেছি। দুর্নীতি হয়েছে এটা প্রমাণিত। গোটা ব্যবস্থাটাকে যাঁরা দুর্নীতিগ্রস্ত করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করতে হবে।’ আরেক বাম দল এসইউসির রাজ্য সম্পাদক চণ্ডীদাস ভট্টাচার্য বলেন, ‘যাঁরা যোগ্যতা প্রমাণ করে চাকরি পেয়েছিলেন, তাঁদের চাকরি বাতিল হয়ে যাওয়া অপ্রত্যাশিত ও অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা দুর্নীতিতে জড়িত নেতা-মন্ত্রী সহ সবার কঠোর শাস্তি চাই।’