Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

শব্দবাজির দৌরাত্ম্য, কী করবেন?

কান ফাটানো শব্দ, তীব্র ধোঁয়া ও দূষণ। কালীপুজোর রাতে চেনা ছবি নানা পাড়ায়। কোন পথে নালিশ জানাবেন? শাস্তিই বা কী কী হতে পারে?

শব্দবাজির দৌরাত্ম্য, কী করবেন?
  • ১১ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

  ঘটনা ১
বাড়ির সামনে একের পর এক বোম! কানফাটানো আওয়াজে কেঁপে কেঁপে উঠছে বাড়ির তিন মাসের একরত্তি! অসুস্থ হয়ে পড়ছেন সদ্য হার্টের অসুখ ধরা পড়া পরিবারের বয়স্ক সদস্য। বাড়ির লোক প্রতিবাদ জানালে নিগ্রহের শিকার হচ্ছেন।
 
  ঘটনা ২
ফ্ল্যাটের এককোনায় গুটিসুটি হয়ে পড়ে আছে আদরের পোষ্য। লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে চিৎকারে বাড়িটাকে যে মাথায় করে রাখে, সে আজ ঘন ঘন ঢুকে পড়ছে খাটের নীচে। অস্থির হয়ে কিছুটা ছুটোছুটি করেই ভয়ে গা ঘেঁষে আসছে আপনার। পাড়ায় কারা যেন পরপর চকোলেট বোম ফাটাচ্ছে! ছোট্ট পোষ্যের হার্টবিট বাড়ছে লাফিয়ে! 

Advertisement

না। কোনও গল্পের বা ছবির প্লট নয়। এই প্লট বাঙালির ফি বছর দীপাবলির ফ্রি গিফট। নিয়ম, শাসন, আইন, রীতিকে পেরিয়ে দেদার ফাটছে শব্দবাজি। শহর থেকে শহরতলি পুড়ছে শব্দের দাপটে। সরকারি নজরদারি, প্রতিরোধ পেরিয়ে চোরাপথে শব্দবাজি পৌঁছে যাচ্ছে গ্রাহকের কাছে।
উৎসবের নাম দীপাবলি। নামের মধ্যেই যার দীপ, সে তো আলোর বার্তাবাহক। কিন্তু বাস্তবে এই আলোর মাঝে ঘাপটি মেরে রয়েছে শব্দের তাণ্ডব। যদিও ভারতীয় সংস্কৃতিতে দীপাবলির রাতে আতসবাজি পোড়ানোর প্রচলন আছে। তবে এই রীতি বহু দশক ধরেই আর আতসবাজিতে সীমাবদ্ধ নেই। বরং শব্দবাজির হুঙ্কারে প্রতি বছরই নাজেহাল মানুষ। সরকার প্রতি বছর নানা নিয়ম বেঁধে দেয়। কড়া নজরদারি চালায়। তারপরেও চোরাগোপ্তা পথে শব্দবাজির আনাগোনা চলে। অভিযোগ জমা পড়ে। ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবু টনক নড়ে কই?

  শব্দবাজি কেন ভিলেন?
হৃদযন্ত্র ও কানের নানা সমস্যা তো আছেই, তবে শব্দবাজির ক্ষতির তালিকা এতেই শেষ হয় না। সে তালিকা বেশ দীর্ঘ। নানা গবেষণায় প্রমাণিত, শব্দবাজির প্রাবল্যে রক্তে শ্বেতকণিকার পরিমাণ বাড়ে। শর্করার মাত্রা বদলে যায়। রক্তে ক্যালশিয়ামের পরিমাণও কমে। এমনকী, ভ্রূণস্থ শিশুও এই তীব্র শব্দে অসুস্থ হতে পারে। সদ্যোজাতর ঘটতে পারে অঙ্গবিকৃতি!

  কোথায় অভিযোগ
বাড়ির সামনে বা স্কুল-কলেজ ও হাসপাতালের সামনে শব্দবাজির প্রাবল্য বাড়লে নিকটস্থ পুলিশ স্টেশনে ফোন করে অভিযোগ জানানো যায়। এছাড়াও রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের চালু করা নম্বর, কলকাতা পুলিশের নিজস্ব হেল্পলাইন নম্বরে ফোন করে অভিযোগ জানাতে পারেন। হাতের কাছে কোনও নম্বর ওই মুহূর্তে মজুত না থাকলে ১০০ ডায়াল করেও জানাতে পারেন অভিযোগ। শব্দবাজির অত্যাচার রুখতে পরিবেশকর্মীদের সংগঠন ‘সবুজ মঞ্চ’ বিগত কয়েক বছর ধরে কাজ করছে। অনেক ক্ষেত্রে পরিচয় প্রকাশ্যে আসার শঙ্কায় অনেকে অভিযোগ জানাতে চান না। নিজের নাম, পরিচয় গোপন রেখেও সবুজ মঞ্চে জানাতে পারেন আপনার বক্তব্য। অভিযোগের সময় প্রমাণ সঙ্গে রাখুন। অডিও, ভিডিও তুলে রাখলে তা প্রমাণ হিসেবে কাজে লাগবে। 

  কী কী শাস্তি
নিষিদ্ধ বাজি বহন করলে ও বিক্রি করলে এক্সপ্লোসিভ অ্যাক্ট ৯বি-র অধীনে মামলা রুজু করা যায়। পুলিশ চাইলে সুয়ো মোটো (স্বতঃপ্রণোদিত) মামলা করতে পারে। এই মামলায় গ্রেপ্তার হলে তা জামিন অযোগ্য ধারা ও তিন বছর পর্যন্ত জেল ও জরিমানা হতে পারে। এছাড়া দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের ১৯৮১-র এয়ার অ্যাক্ট ও দমকলবাহিনীর আওতায় ২০০০ সালের ওয়েস্ট বেঙ্গল ফায়ার সার্ভিস অ্যাক্ট-এর সেকশন ৫, ১১এ, ১১বি ও ১১সি ধারাতেও মামলা রুজু হতে পারে। বাজি থেকে বিস্ফোরণ ঘটা বা দূষণ ছড়ানো নিয়ে এই ধারায় আলাদা আলাদা মামলা রুজু হতে পারে। এছাড়া নিষিদ্ধ বাজি মজুত করা বা ফাটানোর ফলে কেউ মারা গেলে ভারতীয় ন্যায়সংহিতার (বিএনএস) ১০০-র অধীনে অনিচ্ছাকৃত খুনের মামলা রুজু হবে। এতে ১০ বছরের জেল ও জরিমানা হতে পারে। বাজি পোড়ানোর সময় অসাবধানতার ফলে কোনও প্রাণহানি হলে বিএনএস ১০৬ অনুসারে ১০ বছরের জেল ও জরিমানা হবে। ধরা যাক, বাজি পোড়ানোর সময় অসতর্কতার জন্য বা বাজি মজুত করার জন্য কারও প্রাণ গেল না, কিন্তু কেউ আহত হল। সেক্ষেত্রে বিএনএস ১১০-এর অধীনে মামলা রুজু হবে ও ৩ বছরের জেল ও জরিমানা হবে। জনবহুল জায়গায় আগুন জ্বালানোর অপরাধে বিএনএস ২৮৭ ধারা অনুসারে ৬ মাসের জেল ও ২০০০ টাকা জরিমানা দুই-ই হবে। বিস্ফোরক দ্রব্য নিয়ে ট্রেনে-বাসে যাওয়া, জনবহুল জায়গায় বাজি ফাটালে বিএনএস ২৮৮ ধারা অনুসারে ৬ মাসের জেল ও ৫০০০ টাকা জরিমানা হবে। অবৈধ বাজি বিক্রি, জনসমক্ষে অতিরিক্ত বারুদ জ্বালানো বা খারাপভাবে বাজি ফাটানোর জন্য পরিবেশের ক্ষতি করলে বিএনএস-এর ২৮০ ধারায় মামলা রুজু করা যাবে। এতে ১০০০ টাকা জরিমানা হতে পারে। 

তবে আইন করে ও শাস্তির ভয় দেখিয়ে শব্দবাজির প্রাবল্য রুখে দেওয়া যায় না। তার জন্য প্রয়োজন সচেতনতা। তবেই শব্দদানবের দাপট কমিয়ে সুস্থ পরিবেশ তৈরি হবে।


মনীষা মুখোপাধ্যায়

সম্পর্কিত সংবাদ