


হিমাংশু সিংহ: বাংলা ও বাঙালি ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একটা নির্বাচন গোটা জাতিটার ভূতভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে। অবাঙালিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে শিক্ষা, সংস্কৃতি। নেতাজির তুলনায় সাভারকরের দেশপ্রেম নিয়ে বাংলার পথেঘাটে আরএসএস গুণ গাইতে শুরু করলে সহ্য করতে পারবেন তো? বাঙালি সংস্কৃতিতে হেডগেওয়ার, দীনদয়াল উপাধ্যায়, গোলওয়ালকরকে যদি স্বামী বিবেকানন্দ, চিত্তরঞ্জন দাশ, কিংবা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের চেয়ে বড়ো চিন্তকের আসনে বসানোর চেষ্টা হয়, আপনার চোখ ফেটে জল পড়বে না? ভোটদানে সামান্যতম ভুলচুক হলেই রাজ্যে রাজ্যে বাঙালিদের উপর স্রেফ বাংলা বলার অপরাধে যে অত্যাচার নেমে আসছে তা ছড়িয়ে পড়বে খোদ পশ্চিমবঙ্গেও। বাংলার মাটিতে গেরুয়া শাসন কায়েম করতে যে অংশটি উদ্বাহু তারা সংখ্যায় কম হলেও তাদের লক্ষ্য একটাই, অবাঙালিদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করা। আপনিও কি তাই চান? বাংলা উদার মনে সবাইকে স্থান দিয়েছে। রাজস্থানি, বিহারি, তামিল সবাইকেই, কিন্তু বাঙালি অস্মিতাকে বিসর্জন দিয়ে নয়। আপনি কি চান বাংলার ধর্মস্থানে আমিষ চিরতরে নিষিদ্ধ হয়ে যাক? কই স্বামীজির হিন্দুত্ব তো আমিষ নিষিদ্ধ করার কথা বলে না। বাঙালি কি চায় মতের আদানপ্রদানে বাংলা ভাষা ব্রাত্য হয়ে যাক কিংবা রাস্তা ঘাটে বাংলা সাইনবোর্ড অদৃশ্য হয়ে যাক? নিজভূমে পরবাসী হয়ে থাকার অব্যক্ত যন্ত্রণা যদি আমদানি করতে না-চান, তাহলে মিথ্যা প্রলোভন সরিয়ে সতর্কভাবে ভোট দিন। একশো দিনের কাজের টাকা যারা আটকে রাখে, তাদের হাতে বাংলার শাসনভার?
অনেক চেষ্টা করেও বাঙালি সংস্কৃতি ও দর্শনের তল পায়নি হিন্দিবলয়ের ধর্মীয় মেরুকরণ নির্ভর দলটি, যার টিকি বাঁধা নাগপুরে। হিন্দিবলয়ের একাধিক স্থানে আমিষ পুরোপুরি নিষিদ্ধ। বিশেষ করে রাজস্থানে। এর জেরেই সেখানে বিদেশি পর্যটক রেকর্ড সংখ্যায় কমে গিয়েছে। বাংলায় একবার এন্ট্রি পেলেই দলবদলু, ব্যর্থ কবি, বহুবিবাহের অভিযোগে অভিযুক্তদের সরিয়ে বনসল, সিং, তাওড়ে, শাহ, যোগী, বিজয়বর্গীয়দের রমরমা শুরু হবে। সরকার পরিচালিত হবে এরাজ্যের সচিবালয় থেকে নয়, দিল্লি থেকে... অবাঙালির স্বার্থপূরণের লক্ষ্যে। উন্নয়নের অজুহাতে বাংলার সম্পদ পাচার হবে অন্যত্র। ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে জেলায় জেলায় ইতিমধ্যেই আগুন জ্বলছে। কাটোয়া, বেলডাঙা, চাকুলিয়া, ইটাহার। ভোটে জিততে তাদের পছন্দমতো ভোটার বেছে নেওয়ার সর্বনাশা খেলায় মেতেছে বিজেপি। কিন্তু তারা ভুলে গিয়েছে যে বাংলা মোটেই বিহার নয়। এরাজ্যের মানুষ গেরুয়া ফতোয়া ও ফরমান দুই-ই ব্যর্থ করে দেবে।
ইতিমধ্যেই কেন্দ্রীয় এজেন্সি ও নির্বাচন কমিশনকে শিখণ্ডী করে বিজেপির দু’টি চক্রান্ত কার্যত ব্যর্থ! এসআইআর নিয়ে বাড়াবাড়ি ও আইপ্যাকের দপ্তরে হানা ব্যুমেরাং হচ্ছে। গতবারের মতো তৃণমূল ভেঙে, যোগদান মেলা বসিয়ে যে বিশেষ লাভ হবে না, তাও জলের মতোই পরিষ্কার। তবু ষড়যন্ত্রের জালবোনার কি শেষ আছে? গেরুয়া দলের নির্বাচনি এজেন্ডা পূরণে বাংলা ও বাঙালির বেশি সর্বনাশ করেছে এসআইআর। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে শায়েস্তা করার এই খেলায় উদ্বাস্তু হিন্দুদেরই অস্তিত্ব বিপন্ন হয়েছে বেশি। হেনস্তা সীমা ছাড়ানোয় আগামী নির্বাচনে রাজ্যের সাড়ে ৭ কোটি ভোটারের কাছে কমিশন ও বিজেপি দুই-ই খলনায়ক। জেলায় জেলায় এসআইআর বিরোধী গণবিক্ষোভের হিংসাত্মক চেহারা দেখে ওরা ভয় পাচ্ছে। নির্বাচন কমিশনকে উসকে দেওয়ারও চেষ্টা চলছে। শেষপর্যন্ত কত নাম বাদ যাবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে চূড়ান্ত তালিকা বের করে অভিযোগ জানানোর পর্যাপ্ত সময় না দিয়ে ভোট ঘোষণা করলে প্রবল জনবিক্ষোভ আছড়ে পড়বে। দিকে দিকে মামলা হবে এবং দেশের সর্বোচ্চ আদালতকে বাধ্য হয়ে হস্তক্ষেপ করতে হবে। ইতিমধ্যেই ক্ষোভের জনবিস্ফোরণ দেখে সুপ্রিম কোর্ট কড়া অবস্থান নিয়েছে। তা সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে জ্ঞানেশ কুমারের কমিশনকে। হাঙ্গামা দেখলেই এসআইআর স্থগিত করার হুমকি পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছে। ৪ নভেম্বর থেকে যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে তাতে অধিকাংশ মানুষই ক্ষুব্ধ। অর্ধশতক বাংলায় বাস করে নিজেকে নাগরিক প্রমাণ করতে যাওয়ার এই কুনাট্য কোনও প্রবীণ মানুষ কি সহ্য করতে পারেন?
এটাও প্রমাণিত সত্য যে বিজেপিকে প্রাসঙ্গিক করার জন্যই অমিত শাহের নির্দেশে এই কাজটা হচ্ছে। এরাজ্যে হিন্দু-মুসলমান বিভেদের বিষ রোপণ ছাড়া দলটার রাজনৈতিক ভিত্তি বলে কিছু নেই। এখানে তা হবেও না কোনোদিন। ক্ষীণবল সেই দলটাকে তুলে ধরতেই মরিয়া নির্বাচন কমিশন। এই কারণেই শত শত হিন্দু, উদ্বাস্তু, আদিবাসী এবং সংখ্যালঘু ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার নির্মম কুনাট্যের দায়ভার যতটা না কমিশনের, তার চেয়ে ঢের বেশি কেন্দ্রের শাসকদলের। এসআইআরের নীচে চাপা পড়ে গিয়েছে গত দেড় দশকের যাবতীয় ইস্যু। সবাই ছুটছে শুনানির জন্য। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিএলওকে ফোন। ডকুমেন্ট তন্নতন্ন করে খোঁজা, ছুটে গিয়ে জেরক্স করা, তারপর ফাইল বগলে নিয়ে শুনানি কেন্দ্রের দিকে গোল্লাছুট! পাঁচ-ছয় ঘণ্টার লাইন। সাইড এফেক্ট: সময়ে প্রেশারের ওষুধ না-খেয়ে প্রবীণদের অস্বস্তি, মাথা ঘোরা, পড়ে গিয়ে হাসপাতালে রাত্রিবাস। কে না বোঝে, বিজেপিকে বাংলায় প্রাসঙ্গিক করার জন্যই এই বেহায়াপনা! শেষপর্যন্ত যদি বাদ যাওয়া ভোটারের সংখ্যাটা ৭০-৭৫ লক্ষ অতিক্রম করে তাহলে এক প্রবল জনবিক্ষোভের মুখে পড়তে হবে বঙ্গ বিজেপিকে। বাইরে থেকে আনা অবাঙালি নেতা, মন্ত্রীসান্ত্রি, প্রভারী এবং গুটিকয়েক দলবদলু আর ব্যর্থ আরএসএস চিন্তককে নিয়ে বাংলার মানুষের নাড়ি টিপে দেখা মোটেই সহজ কাজ নয়। বয়সের ভারে ঝুঁকে পড়া অতীত দিনের এক অভিনেতাও ঘুরপাক খাচ্ছেন। কিন্তু জেলায়, আধাশহরে তাঁকে দেখতে সেই ভিড় কোথায়! তিনিও কি ধীরে ধীরে অচলদেরই দলে?
গেরুয়া সংগঠনের দুর্বলতা ঢাকতেই আইপ্যাকের দপ্তরে কাকভোরে হানা দিয়ে তৃণমূলের প্রচার মেশিনারিকে পঙ্গু করার একটা চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু তাতে আখেরে রাজ্যের শাসকদলেরই শাপে বর হয়েছে। এসআইআর বাড়াবাড়ি ও আইপ্যাকের উপর আক্রমণ ইস্যুতে তৃণমূলের নীচুতলা যেভাবে সংঘবদ্ধ হয়ে নেমেছে, তা দু’মাস আগেও দেখা যায়নি। তাই খোঁজ পড়েছে নতুন ষড়যন্ত্রের! সেই ষড়যন্ত্রের খোঁজেই এখন হন্যে অমিত শাহ অ্যান্ড কোং!
কী সেই চক্রান্ত? এখন বিজেপির পক্ষ থেকে মূলত দু’টি জিনিস প্রচার করা হচ্ছে। এসআইআর যদি সুষ্ঠভাবে সম্পন্ন হতে না-পারে সেক্ষেত্রে নাকি ভোট পিছোবে? জানুয়ারি মাসের শেষে পৌঁছেও শুনানির বিস্তর বাকি। ১৪ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ হওয়া কঠিন। অন্তত দুই থেকে তিন সপ্তাহ পিছিয়ে যেতে চলেছে। সেক্ষেত্রে ভোটের নির্ঘণ্ট প্রকাশ মার্চ মাসের দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় সপ্তাহে পিছিয়ে যেতে পারে। এমনও প্রচার করা হচ্ছে, এসআইআরে বাধা সৃষ্টি করলে যে-কোনো স্বীকৃত রাজনৈতিক দলের স্বীকৃতি পর্যন্ত বাতিল হতে পারে, তালিকা প্রকাশও স্থগিত হয়ে যেতে পারে অনির্দিষ্টকালের জন্য। বলা বাহুল্য, ভয় দেখাতে এসবই ফাঁকা আওয়াজ। কেউ আবার এমনও বলছেন ৫ মে’র মধ্যে গোটা নির্বাচনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে না-পারলে রাজ্যে রাষ্ট্রপতির শাসনও নাকি অনিবার্য পরিণতি। দীনদয়াল উপাধ্যায় ভবনের হোমরাচোমরারা স্পষ্ট বুঝতে পারছে না, ভোট পিছোনো কিংবা রাষ্ট্রপতির শাসন জারির গল্পে চিঁড়ে বিশেষ ভিজবে না। এসবই পাগলের প্রলাপ। নিজেদের অক্ষমতা এবং সাংগঠনিক রক্তশূন্যতা আড়াল করার কৌশল মাত্র। কারণ যথাসময়ে ভোট করানোই নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব ও অগ্রাধিকার। বাংলায় তার অন্যথা হবে না। এধরনের জল্পনার কোনও সারবত্তা নেই।
বিজেপি বিলক্ষণ জানে, মমতাকে ব্যক্তিগত আঘাত করলে যে বিপরীত প্রতিক্রিয়া শুরু হবে তা সামলানোর সাংগঠনিক শক্তি তাদের নেই। একুশ ও চব্বিশের ভোটের ফলই তার প্রমাণ। মমতার প্রত্যাঘাত নিউটনের তৃতীয় সূত্র মেনে যে চলে না, তাও বিজেপি গত ৮ জানুয়ারিই বুঝে গিয়েছে। দশগুণ শক্তিতে ফিরে এসেছে পালটা আঘাত। যতদিন মমতা আছেন, তৃণমূলকে উৎখাত করা দূরে থাক সামান্য আঁচড় কাটার হিম্মতও নেই গেরুয়া দলের। বেশি বাড়াবাড়ি করলে হিতে বিপরীতই অনিবার্য। এমনও শোনা যাচ্ছে, কোনো বড়ো নেতাকে গ্রেপ্তার করে চমক দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে সিবিআই, ইডি। অতীতেও বহুবার এই নাটক হয়েছে। কাজের কাজ কিছুই হয়নি। মানুষ এই নোংরা খেলাটা ধরে ফেলেছে।
প্রশ্ন একটাই, সোজা কিংবা বাঁকা কোনো আঙুলেই ঘি না-উঠলে নরেন্দ্র মোদি কি চুপ করে বসে থাকতে পারেন? এবার ব্যর্থ হলে এ জীবনে তাঁর নেতৃত্বে বাংলা দখলের খোয়াব অধরাই থেকে যাবে। কিন্তু তিনি যে জিনগতভাবে একেবারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভারতীয় সংস্করণ। ট্রাম্পের চাই গ্রিনল্যান্ড, মোদির চাই বাংলা! ডাভোসে ট্রাম্প বলেছেন, নিজে থেকে তুলে দিলে তিনি খুশি হবেন। আর ‘না’ বললে চিরদিন মনে রাখবেন। স্বীকার করেছেন, তিনি স্বেচ্ছাচারী। অর্থাৎ বদলার মঞ্চ প্রস্তুত—যে-কোনো উপায়ে যে-কোনো পথে। মোদিজির মন্ত্রও তাই, বিরোধী নিকেশ! ভোটচুরির অভিযোগকে দূরে ঠেলে মোদির একের পর এক রাজ্য জয় ছিল ভেনেজুয়েলা দখলের মতোই। গতবার দখল করতে না-পেরে বাংলার বিরুদ্ধে বদলা ছিল—পশ্চিমবঙ্গের ন্যায্য পাওনা আটকে রাখা। একশো দিনের কাজ, আবাসের বরাদ্দ সব বন্ধ। অথচ ওই টাকা কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, বাংলারই ন্যায্য প্রাপ্য। ওই প্রাপ্য কোনো রাজনৈতিক দাদার মরজির উপর নির্ভর করে না। এখানেই মোদিজির সঙ্গে ট্রাম্প সাহেবের অদ্ভুত মিল। রাষ্ট্রসংঘ, ন্যাটো, জি২০ কাউকেই ট্রাম্প পাত্তা দেন না। কঠোর অভিবাসন নীতি, লাগামহীন শুল্ক আরোপ, ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধবিরতিতে কৃতিত্বের দাবি, শান্তি কমিটি স্থাপন, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে অপহরণ, ইরান ও গ্রিনল্যান্ডকে হুমকি। সবটাই খ্যাপামো না শয়তানি? মোদিজির অভিধানেও যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো, কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক, বিরোধীদের সম্মান প্রদর্শন, সবই অর্থহীন। দুই হুজুরের গপ্পোই মিলে যায় অদ্ভুত স্বেচ্ছাচারিতার আবর্তে।
কোটি টাকার প্রশ্ন একটাই, বাংলার স্বাধীনচেতা মানুষ কি এক গুজরাতি দখলদারের কাছে আত্মসমর্পণ করে নিজস্বতা খোয়াবে? নাকি মায়ের দেওয়া মোটা কাপড়েই উন্নয়নের সরণি বেয়ে দাঁড়াবে সামনের সারিতে? যাবতীয় চক্রান্ত ব্যর্থ করতেই হবে। আসন্ন নির্বাচন সর্বার্থেই বাংলা ও বাঙালিকে বাঁচিয়ে রাখার অগ্নিপরীক্ষা।