Bartaman Logo
২৪ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

প্ল্যান ও মানবিক দৃষ্টি জরুরি

যাদবপুরে হকার উচ্ছেদ বিরোধী আন্দোলনে গরিব মানুষের অধিকার রক্ষার দাবি উঠেছে। সরকারের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি জরুরি। বিস্তারিত পড়ুন।

প্ল্যান ও মানবিক দৃষ্টি জরুরি
  • ৫ জুন, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

পশ্চিমবঙ্গের বহু মানুষের দিন কাটে সুখস্মৃতি রোমন্থন করে। কারণ বাংলা ও বাঙালির আনন্দানুভূতি ও গর্বের অনেক কিছুই অতীতকে ঘিরে। রাতে ঘুমোতে যাওয়ার সময় বাঙালির সবচেয়ে প্রিয় গান বোধহয়—‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম।’ বঙ্গসন্তানরা এককালে ‘দুধে-ভাতে’, ‘মাছে-ভাতে’ সতিই সুখী ছিল। ঩শুধু বাঙালি নিজে সুখে ছিল না, ‘বসুধৈব কুটুম্বকম্‌’ নীতি মেনে বহির্বঙ্গেরও অসংখ্য মানুষকে এই বঙ্গদেশে জায়গা দিয়েছিল এবং তাদের আপন করে নিয়েছিল নিজগুণে। কিন্তু বাঙালির এই সুখ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। সাম্রাজ্যবাদীদের চক্করে পড়ে বাংলা বারবার ভাগ হয়েছে। ছিন্নভিন্ন মানচিত্র দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে বাঙালির ঠিকানা, জীবন-জীবিকা, সোজা কথায় ভাগ্য। সর্বশেষ সর্বনাশ ঘটেছিল ১৯৪৭-এ স্বাধীনতালাভের আড়ালে দেশভাগের মধ্য দিয়ে। নবগঠিত পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে আছড়ে পড়েছিল পূর্ববঙ্গের লক্ষ লক্ষ শরণার্থীর ঢেউ। সিকি শতক পেরোয়নি। দেশভাগের ক্ষত নিরাময় হওয়ার আগেই, ১৯৭১ সালে, নেমে আসে শরণার্থী স্রোতের দ্বিতীয় অধ্যায়। সেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান আজও হয়নি। বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়, পূর্ববঙ্গ থেকে এক কোটির বেশি ছিন্নমূল মানুষ নানা সময়ে এরাজ্যে আশ্রয় নিয়েছে। বংশবৃদ্ধির নিয়মে সেই সংখ্যা আট দশকে কয়েক কোটি হয়েছে নিঃসন্দেহে। কিন্তু পূর্ববঙ্গের শরণার্থীদের উপযুক্ত পুনর্বাসনের দায়িত্ব ভারত রাষ্ট্র আজও স্বীকার করেনি। এমনকি, পাঞ্জাবি শরণার্থীদের পাশে রাখলে বিপন্ন বাঙালির সঙ্গে দিল্লির সুদীর্ঘ বঞ্চনা, বৈষম্যের ছবিটাই খোলসা হয়। এজন্য জওহরলাল নেহরু এবং তাঁর পরবর্তী নেতাদের দায় কতটা, তা নিয়ে বিতর্ক চলতেই পারে, কিন্তু তাতে বাঙালির ভাগ্য ফেরে না। দেশের জিডিপি এবং শিল্পোৎপাদনে বাংলার কন্ট্রিবিউশন দশকের পর দশক কমেছে, এখন নেমে এসেছে অতীতের সামান্য এক ভগ্নাংশে। 

Advertisement

এই নির্মম বাস্তব শাসক, বিরোধী সব রাজনৈতিক দলই অবগত। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হল, তবু দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের সদিচ্ছা এযাবৎ কেউই দেখায়নি। শিক্ষা, শিল্প-বাণিজ্য, কর্মসংস্থান প্রভৃতি নানা ক্ষেত্রে বাংলার পিছিয়ে পড়ার ইতিহাসই রচিত হয়েছে কেবল। তারই পরিণতি দিকে দিকে বেকার বাহিনীর ভিড় কিংবা ছদ্ম বেকারের দল। জীবন তো থেমে থাকে না—আরশোলার মতোই সুকঠিন লড়াই জারি রেখেছে বাঙালি। তারই একটি বড়ো নিদর্শন হকার শ্রেণি। রাজপথ কিংবা রেললাইনের ধারেই অস্থায়ী দোকান খুলে সামান্য পসরা সাজিয়ে বিকিকিনি করে লক্ষ লক্ষ নারী-পুরুষ। এই যৎসামান্য টাকায়, দিনমজুরিতে অসংখ্য পরিবার জীবন সংগ্রাম জারি রেখেছে। শুধু খাওয়া-পরা চলে না, ওই আয়-রোজগারে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার ব্যবস্থা হয়, নির্বাহ হয় বৃদ্ধ বাবা-মায়ের চিকিৎসা ব্যয়। একটা জিনিস উপলব্ধি করা দরকার যে, উপযুক্ত চাকরি পেলে, ভালো পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকার সুযোগ হলে কিংবা সম্ভ্রান্ত ব্যবসা-বাণিজ্যের সন্ধান থাকলে কেউই আর যাই হোক হকারের কঠিন জীবন বেছে নিত না। বস্তুত হকার বৃত্তির সঙ্গে তারা যুক্ত হয়েছে একেবারে নিরুপায় হয়েই। সবাই জানে, হকারের দোকান-পসরার জন্য ফুটপাত, কোথাও-বা রাস্তারও একাংশ দৈনিক কয়েক ঘণ্টার জন্য বেদখল হয়ে যায়। একই অবস্থা হয় রেলস্টেশনগুলিতেও। তার জন্য সাধারণ মানুষকে কিছুটা সমস্যায় পড়তে হয়। মানুষের এই বিরক্তি দূর করতে অতীতেও হকার বৃত্তিকে একটা নিয়ম-নীতিতে বাঁধতে চেয়েছিল সরকার। কিছু ক্ষেত্রে হকার উচ্ছেদেরও চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু শেষমেশ কোনো সরকারই সেভাবে সফল হয়নি। কারণ একটাই—পাপী পেট কা সওয়াল! বিকল্প জীবিকা বা উপযুক্ত পুনর্বাসন দেওয়া যায়নি সকলকে। বরং লেবার ফোর্স বৃদ্ধির কারণে প্রতিদিন, প্রতিবছর হকারের সংখ্যা বেড়েছে। 
রাজ্যে পালাবদল হয়েছে সবে। নতুন বিজেপি সরকারও কিছু জায়গায় হকার উচ্ছেদে মনোবিবেশ করেছে। এমনকি, তার জন্য কিয়দংশে নামানো হয়েছে বুলডোজার পর্যন্ত! স্বভাবতই ধ্বনিত হয়েছে প্রতিবাদ। যেমন মঙ্গলবার গভীর রাতে দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে যাদবপুর স্টেশনে। হকার উচ্ছেদ বিরোধী আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে সিপিএমের স্থানীয় নেতৃত্ব। প্রতিবাদীদের দলে হকাররা তো ছিলেনই, যোগ দেন বহু বাসিন্দা এবং ছাত্রছাত্রী। প্রত্যেকের দাবি ছিল একটাই—গরিব মানুষের পেটে লাথি মারা যাবে না। বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া হকার উচ্ছেদ চলবে না। শেষমেশ হার মানে বুলডোজার। যাদবপুরে হকার আন্দোলন লিখল এক অন্য ও সফল চিত্রনাট্য। যাতায়াত ব্যবস্থা অবশ্যই সুগম করতে হবে। সেই উদ্যোগ স্বাগত। কিন্তু তা যেন গরিব ক্ষুধার্ত মানুষকে আরো বিপন্ন করার বিনিময়ে না-হয়। সরকারকে যাবতীয় পদক্ষেপই করতে হবে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা মাফিক এবং মানবিক দৃষ্টিতে। হুজুগে মাতলে মারাত্মক ভুল হবে—মিলবে না সুরাহা, সমস্যা হবে বহুবর্ধিত।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ