Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

এই রাষ্ট্রসঙ্ঘের প্রয়োজন কী?

দু মাস ধরে চলছে যুদ্ধবিরতি। সেই চুক্তির মধ্যেই আচমকা ইজরায়েল প্যালেস্টাইনের গাজায় বোমা ফেলল। গাজা তৈরিই ছিল না। তারা জানে যুদ্ধবিরতি চলছে।

এই রাষ্ট্রসঙ্ঘের প্রয়োজন কী?
  • ২১ মার্চ, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সমৃদ্ধ দত্ত: দু মাস ধরে চলছে যুদ্ধবিরতি। সেই চুক্তির মধ্যেই আচমকা ইজরায়েল প্যালেস্টাইনের গাজায় বোমা ফেলল। গাজা তৈরিই ছিল না। তারা জানে যুদ্ধবিরতি চলছে। এখন ভয় নেই। ৪৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছে আকাশ থেকে নেমে আসা বোমায়। যাদের সিংহভাগ নারী, শিশু ও বৃদ্ধ। এর আগেও যখন যুদ্ধ বিরতি ছিল না, তখন একের পর এক মিসাইল আক্রমণ হয়েছে হাসপাতাল লক্ষ্য করে। অসংখ্য রোগী হাসপাতালেই প্রাণ হারিয়েছে। 

Advertisement

অনেকদিন ধরেই হুমকি, হুঁশিয়ারি চলছিল। হঠাৎ একদিন রাশিয়া মনে করল, অনেক হয়েছে। এবার বোমা টোমা ফেলা যাক। বলেই ইউক্রেনের উপর আক্রমণ শুরু করে দিল। কেন এই আক্রমণ? যুক্তিসঙ্গত কোনও জবাব পাওয়া যায়নি। আক্রমণ করে লাভ কী হল? ইউক্রেনের বহু, জমি ও পাহাড় দখল করে নেওয়া গেল। ঠিক কোন কোন এলাকা দখল করে নেওয়া হল বেছে বেছে? যেখানে যেখানে মাটি ও পাহাড়ের নীচে মহামূল্যবান ক্রিটিকাল মিনারেলস আছে। 
সুদানের প্রত্যেক পাঁচজন নাগরিকের মধ্যে একজন উদ্বাস্তু। এবং আছে যাযাবর উদ্বাস্তু। প্রতি মাসে গড়ে আড়াই লক্ষ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছে। হঠাৎ নয়। কয়েক বছর ধরে, কখনও বছরের পর বছর ধরে চলছে। ১ কোটি ২০ লক্ষ মানুষ রাস্তায় রাস্তায় খুঁজে বেড়াচ্ছে নিরাপদ আশ্রয়। একদিন অন্তর খাবার জোটে। তিনদিন না খাওয়ার অভ্যাস করতে হয়। একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা খার্টুমে স্যুপ কিচেন চালু করেছিল। সারাদিনে দুবার শুধু স্যুপ পাওয়া যেত। সেটা বন্ধ করে দিতে হয়েছে। প্যারামিলিটারি ফোর্স সমস্ত সাপ্লাই আসার পথ বন্ধ করেছে। এখন খার্টুমের ছিন্নমূল আড়াই লক্ষ মানুষ বেশিরভাগ সময় গাছের পাতা সিদ্ধ করে খায়। 
ইয়েমেনে খাদ্য সঙ্কট নেই। সরাসরি দুর্ভিক্ষ চলছে। একদিকে খাবার নেই। আবার অন্যদিকে যে কোনও মুহূর্তে পশ্চিমী দুনিয়ার এয়ারস্ট্রাইক। কিংবা হুইতিদের আক্রমণ। ইয়েমেনের বহু অংশ প্রাচীন পৃথিবীতে ফিরে গিয়েছে। পশু পাখি দেখতে পেলেই সেগুলিকে শিকার করা এবং পুড়িয়ে রোস্ট করে খাওয়া। অবিকল আধুনিক মানুষের পূর্বপুরুষদের স্টাইলে। কেন? কারণ অবশেষে এমন এক সময় এসেছে যখন মানুষ আবার বর্বর যুগে ফিরছে আনন্দের সঙ্গে। 
কঙ্গো, সুদান, ইয়েমেনে দুর্ভিক্ষ। গাজায় 
রমজান মাসে খাদ্য সাপ্লাই, পানীয় জলের সাপ্লাই 
এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আমেরিকা জানিয়েছে, ইজরায়েল গাজা নিয়ে যা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আমাদের জানিয়েই সব করা হয়েছে। আমরা সমর্থন করি। 
যখন তখন চীন লাদাখ অথবা অরুণাচল প্রদেশে ঢুকে পড়ে। নিজেদের মানচিত্রে এই দুই প্রদেশকে চীনেরই অংশ হিসেবে প্রদর্শিত করে দেয়। দক্ষিণ চীন সাগরে নৌবহর নিয়ে এসে শক্তির আস্ফালন করে। 
আমেরিকার নতুন প্রেসিডেন্ট হঠাৎ মনেপ্রাণে ফিরে গিয়েছেন মধ্য অথবা প্রাচীন যুগে। তিনি যে দেশের প্রেসিডেন্ট, সেই দেশের জিডিপি ২৮ লক্ষ কোটি ডলার। অকল্পনীয় ধনসম্পদ! আর তার দৌলতে তিনি ইচ্ছা প্রকাশ করছেন অন্য দেশকে দখল করে আমেরিকার অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়ার। গ্রিনল্যান্ডকে বলেছেন, আমেরিকায় যুক্ত হয়ে যেতে। কানাডাকে বলেছেন, তোমাদের তো কিছুই নেই। আমাদের উপরই নির্ভরশীল। আমাদের সঙ্গেই তো ছিলে এক সময়। কবে যেন আলাদা হয়ে গেলে। আবার চলে এসো। আমাদের একটি রাজ্য হয়ে যাও। কানাডা একটি রাজ্য, দেশ নাকি? 
এই যে গোটা বিশ্বে জোর যার মুলুক তার এরকমই এক অরণ্য সভ্যতা চলছে, এসবের মোকাবিলা কার করার কথা? এসব হতে দেখলে সবথেকে বেশি কার সক্রিয় হয়ে প্রতিবাদ করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রত্যাশিত? উত্তর হল, রাষ্ট্রসঙ্ঘ। বিগত বহু বছর ধরে বিশ্বের রাজনীতি, কূটনীতি, যুদ্ধ, সিভিল ওয়ার, গণহত্যা, নারী শিশুদের অবাধে হত্যালীলা— এসব দেখে কি মনে হয় যে, রাষ্ট্রসঙ্ঘ বলে কোনও প্রতিষ্ঠান আদৌ আছে? 
রাষ্ট্রসঙ্ঘের আদৌ কোনও প্রয়োজন আছে? সত্যিই কি এই সংস্থার কাজ বিশ্বশান্তির জন্য  সক্রিয়তা? ভূ রাজনৈতিক পটভূমিকে চোখের সামনে দেখে কি এটা আর বিশ্বাস করা যায় যে, রাষ্ট্রসঙ্ঘের আদৌ বিশ্বশান্তি স্থাপনের কোনও সদিচ্ছা আছে? তার থেকেও বড় প্রশ্ন হল, রাষ্ট্রসঙ্ঘের সেই শক্তি অথবা প্রভাব কিংবা অথরিটি আছে কি? উত্তর হল, একেবারেই নেই নখদন্তহীন একটি শ্বেতহস্তি ছাড়া রাষ্ট্রসঙ্ঘের এখন আর কোনও ভূমিকাই নেই। কেন নেই?
একটি দেশের প্রেসিডেন্ট আর একটি দেশে রাষ্ট্রীয় সফরে এসেছেন। কয়েক সপ্তাহ আগেই হয়ে গেল এই রুদ্ধশ্বাস নজিরবিহীন আন্তর্জাতিক নাটক। ওয়াশিংটনে। আমেরিকার প্রেসিডেন্টের নিজের দপ্তরে। সেই ওভাল অফিসে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টকে বসিয়ে বসিয়ে টিভি চ্যানেলে লাইভ টেলিকাস্ট করে গোটা বিশ্বের চোখের সামনে অপমান করল আমেরিকা প্রশাসন। এবং সম্পূর্ণ বেপরোয়াভাবে। মনোভাব হল, আমি যখন যাকে ইচ্ছা যেমন ইচ্ছা বলব। কারও কিছু করার থাকবে না। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সম্পর্কে বলে দিলেন, আমার সঙ্গে কেউ তর্ক করতে পারবে না।  
ডোনাল্ড ট্রাম্প, বেঞ্জামিন নেতানায়াহু, ভ্লাদিমির পুতিন, শি জিনপিংদের একটি বিষয়ে ধন্যবাদ দিতেই হয়। তাঁরা বস্তুত প্রকট করে দিয়েছেন যে, রাষ্ট্রসঙ্ঘের কোনও গুরুত্বই নেই। রাষ্ট্রসঙ্ঘের কয়েকটি ইউনিট, যেমন ইউনিসেফ তারা মানবিকতার পক্ষে কাজ করে। দুর্ভিক্ষ ও উদ্বাস্তু পীড়িত দেশে গিয়ে সাহায্য করে। যুদ্ধপীড়িতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। এসব পর্যন্ত তাদের ভূমিকা সীমিত। কিন্তু বিশ্বজুড়ে ঘটে চলা শক্তিশালী দেশগুলির যথেচ্ছাচার, দাদাগিরি এবং সর্বোপরি সাম্রাজ্যবাদী মনোভাব আটকাতে রাষ্ট্রসঙ্ঘের কোনও ভূমিকা নেই। থাকলেও প্রয়োগ করার শক্তি নেই। রাষ্ট্রসঙ্ঘ দুর্ভিক্ষ ঠেকাতে পারে না। জাতিদাঙ্গা বন্ধ করতে পারে না। অনৈতিক যুদ্ধ মোকাবিলা করতে ব্যর্থ। অন্যায়কারী দেশকে শায়েস্তা করারও শক্তি নেই। এহেন এক সংস্থার থাকা আর না থাকায় কী এসে যায়?
 রাষ্ট্রসঙ্ঘের সবথেকে শক্তিশালী মঞ্চ হল, নিরাপত্তা পরিষদ। বিশ্বজুড়ে ঘটে চলা বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষিতে এই পরিষদ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। আদি অনন্তকাল ধরে সেই পরিষদের স্থায়ী সদস্য পাঁচটি দেশ। এদের বলা হয় পার্মানেন্ট ফাইভ। অর্থাৎ পি ফাইভ। আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স, ব্রিটেন। যারা অস্থায়ী সদস্য দেশ, তাদের কোনও শক্তি নেই। কারণ তাদের কোনও একটি সিদ্ধান্ত অথবা নীতি গ্রহণে ভেটো ক্ষমতা নেই। ফ্রান্স এবং ব্রিটেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে শক্তির কেন্দ্র ছিল, এখন কি তাদের সেই শক্তি আদৌ আছে? নেই। অথচ তারা এখনও পার্মানেন্ট সর্বশক্তিমান সদস্য হয়ে রয়ে গিয়েছে। অথচ বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতি ভারত নেই। বিরক্ত এবং ক্ষুব্ধ হয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি লেক্স ফ্রিডম্যানের পডকাস্টে ,একথাও বলেছেন যে, রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদ বিশ্ব নিরাপত্তা রক্ষায় এখন আর সফল প্রতিষ্ঠান নয়। পাঁচটি রাষ্ট্রের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক কৌশল রচনার একটি প্ল্যাটফর্ম। মোদি সম্পূর্ণ ঠিক বলেছেন। 
রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে ইজরায়েলের বিরুদ্ধে যে কোনও নিন্দাপ্রস্তাব আটকে দেয় আমেরিকা। উত্তর কোরিয়া, পাকিস্তান, মায়ানমারের বিরুদ্ধে যে কোনও সমালোচনামূলক প্রস্তাব পাশ করানো যায় না। কারণ চীন আটকে দেয়। তারা সবাই চীনের অনুগত। ইরানের বিরুদ্ধে কোনও প্রস্তাব রাশিয়া পাশ হতে দেবে না। আটকে দেবে। এই প্রবণতাই চলছে। আমেরিকার প্রদান করা অর্থসম্পদ সবথেকে বড় সম্পদ রাষ্ট্রসঙ্ঘের। সুতরাং রাষ্ট্রসঙ্ঘ আমেরিকার বিরুদ্ধাচারণ করে না। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প রাষ্ট্রসঙ্ঘ ব্যাপারটাই পছন্দ করেন না। তিনি মনে করেন এই সংস্থা থাকার দরকার নেই। ১৯৯৫ সালের পর রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের কোনও সংস্কার হয়নি। ভারত, ব্রাজিল, জাপান, জার্মানি কেউ আজকের দুনিয়ায় নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য নয়! এর থেকে হাস্যকর অবস্থা আর কী হতে পারে! 
মানবতার চরম লঙ্ঘন করা চলছে অবাধে। আফ্রিকা, এশিয়ায় কোটি কোটি মানুষ গৃহযুদ্ধ এবং অন্য রাষ্ট্রের আক্রমণে দুর্ভিক্ষের জ্বালায় প্রতিদিন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। কঙ্গো, লেবাননে হাজার হাজার বালক বালিকাকে খনিজ সম্পদ আহরণে দিনের ২০ ঘণ্টা অন্ধকার খনির মধ্যে কাটাতে ফেলে রাখা হচ্ছে! ২০১১ সাল থেকে যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ায় লক্ষ লক্ষ নারী শিশু বৃদ্ধ বাঁচার আশায় সীমান্ত পেরতে যায় প্রতিদিন। প্রতিদিন গুলি চলে। প্রতিদিন প্রাণহানি ঘটে। ইউক্রেন থেকে গাজা। আমেরিকা চায় আশপাশের একাধিক রাষ্ট্র গ্রাস করতে। রাশিয়া একে একে পূর্বতন সোভিয়েত ইউনিয়নের সদস্যদের পুনরায় দেশভুক্ত করার আগ্রাসী নীতি নিয়েছে। চীন পাকিস্তানকে অর্থনৈতিক হারেমে পরিণত করে ভারতের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা লঙ্ঘন করছে মাঝেমধ্যেই। 
যুদ্ধ বাড়ছে। ক্ষুধা বাড়ছে। অনাহার বাড়ছে। সংঘাত বাড়ছে। সাম্রাজ্যবাদ ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে। বিশ্ব আজ বড়সড় সঙ্কটের সম্মুখীন। অথচ রাষ্ট্রসঙ্ঘ নীরব দর্শক! চক্ষুষ্মান ধৃতরাষ্ট্র!  

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ