সমৃদ্ধ দত্ত: সাত বছর পরও জম্মু-কাশ্মীরকে পূর্ণাঙ্গ রাজ্যের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে না কেন? এই প্রশ্ন বিভিন্ন মহলে উত্থাপিত হলেও বিস্ময়করভাবে কেন্দ্রীয় সরকার নীরব! আপাতভাবে মনে হতে পারে যে, এটা এমন আর কী ক্ষতি হচ্ছে? ভারতে অনেক কেন্দ্রশাসিত রাজ্যই তো আছে। অবশ্যই ক্ষতি হচ্ছে। সেটি হল, জম্মু-কাশ্মীরকে ভেঙে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করা, বছরের পর বছর প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও পূর্ণাঙ্গ রাজ্যের মর্যাদা না দেওয়া, অনিশ্চিত অবস্থা চলতে থাকা, এসব পদ্ধতি বহাল থাকলে আন্তর্জাতিকভাবে ভারতের ভাবমূর্তি ধাক্কা খায়। আবার কাশ্মীরের মানুষের মধ্যেও এই ক্ষোভ কেন দিনের পর দিন জিইয়ে রাখা হবে?
পাক অধিকৃত কাশ্মীরকে পাকিস্তান পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা দেয়নি। সেটির পরিচালক স্বশাসিত প্রশাসন ‘আজাদ জম্মু কাশ্মীর কাউন্সিল’। আসলে পাকিস্তান সরকারই আড়াল থেকে পরিচালনা করে। কিন্তু প্রকাশ্যে দেখানো হয় এটি স্বশাসিত। পাক অধিকৃত জম্মু কাশ্মীর পরিচালিত হয় পাকিস্তানের সংসদে নেওয়া ১৯৭৪ সালের অন্তর্বর্তী সংবিধান আইন অনুযায়ী। পাক অধিকৃত কাশ্মীরের নাগরিকদের পাকিস্তানের সংসদীয় ভোটে অংশ নেওয়া, ভোট দেওয়ার অধিকার নেই। কিন্তু ভারতের জম্মু কাশ্মীর পূর্ণাঙ্গভাবেই ভারতের প্রতিটি সংসদীয় ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত বহুকাল ধরে। অতএব বিস্তর ফারাক আছে। জম্মু-কাশ্মীর আবার যদি পূর্ণাঙ্গ রাজ্য হিসাবেই পরিগণিত হয়, তাহলে আরও বেশি করে দুনিয়াকে দেখানো যাবে যে, পাকিস্তান যত অপপ্রচার করুক, সন্ত্রাস ছড়িয়ে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করুক, জম্মু-কাশ্মীর ১৯৪৭ সাল থেকেই ভারতের সঙ্গেই থাকতে চেয়েছে।
২০১৯ সালের ৫ আগস্ট সংসদে আইন সংশোধন করে কেন্দ্রীয় সরকার সংবিধানের ৩৭০ নং ধারার অবলুপ্তি ঘটিয়েছিল। একইসঙ্গে বাতিল করা হয় সংবিধানের ৩৫ এ ধারা। অর্থাৎ কাশ্মীর রাজ্যকে ভারতের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করার শর্ত হিসাবে যে দুটি স্পেশাল স্ট্যাটাস দেওয়া হয়েছিল, সেই প্রধান দুই ধারাকে সরিয়ে কাশ্মীরকে মূলধারার বাকি রাজ্যগুলির সঙ্গে সমপর্যায়ে নিয়ে আসা হয়। কিন্তু একইসঙ্গে সেই দিনই জম্মু-কাশ্মীর রাজ্যকে ভেঙে দুটি পৃথক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করা হয়। লাদাখ এবং জম্মু-কাশ্মীর। তখনই কেন্দ্রীয় সরকার ঘোষণা করেছিল, এই যে জম্মু-কাশ্মীরের পূর্ণাঙ্গ রাজ্যের অধিকার কেড়ে নিয়ে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করা হচ্ছে, এটি অস্থায়ী ব্যবস্থা। যত দ্রুত সম্ভব ‘যথাসময়ে’ আবার জম্মু-কাশ্মীরকে ফিরিয়ে দেওয়া হবে পূর্ণাঙ্গ রাজ্যের মর্যাদা। কিন্তু মুখে একথা বলা হলেও, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাস চলে গেল। অথচ পূর্ণাঙ্গ রাজ্যের মর্যাদা ফেরানো হচ্ছে না। সেই ‘যথাসময়’টি কবে আসবে? ভারত সরকার নীরব।
১৯৪৭ সালের ২৪ অক্টোবর যখন পাকিস্তান থেকে পাঠান আদিবাসী বাহিনী কাশ্মীর আক্রমণ করেছিল, তখন কাশ্মীরের রাজা হরি সিং ভারতের সাহায্য চান। তার আগে পর্যন্ত তিনি স্বাধীন হয়েই থাকতে চেয়েছেন। অর্থাৎ ভারত এবং পাকিস্তান, কোনো রাষ্ট্রেরই অন্তর্ভুক্ত হবে না। কিন্তু পরিস্থিতি বদলে গেল পাকিস্তান সেই তাঁর রাজ্যকেই আক্রমণ করায়। ভারত শর্ত দিয়েছিল, আগে ভারতে আপনাকে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আবেদন করে দলিলে স্বাক্ষর করতে হবে। লর্ড মাউন্টব্যাটেন তখন ভারতের গভর্নর জেনারেল, তিনিও চাপ দিয়েছিলেন হরি সিংকে। হরি সিং সেই দাবি মেনে নিয়ে স্বাক্ষর করেন ভারতভুক্তির চুক্তিতে।
ভারত ও পাকিস্তানের যুদ্ধ বিক্ষিপ্তভাবে কাশ্মীরে চলতেই থাকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত। ভারত সরকার বিষয়টি নিয়ে যায় রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে। সেখানে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে বলা হয় গণভোট হবে। ভারত-পাকিস্তান কমিশনও গঠিত হয়েছিল রাষ্ট্রসংঘে। যদিও সেই কমিশন কিংবা গণভোটের রেজোলিউশন (৪৭ নং) পরবর্তীকালে ধামাচাপা পড়ে যায়।
১৯৪৯ সালের ১৭ অক্টোবর ভারতের সংবিধান সভায় অনুমোদিত হয় কাশ্মীরের ৩৭০ নং ধারা। সেখানে নেহরু সরকার বলেছিল, এই ব্যবস্থা অস্থায়ী। কাশ্মীরের অবস্থা আর একটু স্থিতিশীল হলে তখন জম্মু-কাশ্মীর পূর্ণাঙ্গভাবে অন্য রাজ্যের মতোই ভারতের একটি অঙ্গরাজ্য হবে। ৩৭০ নং ধারা অনুযায়ী জম্মু-কাশ্মীরের বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের তিনটি ক্ষেত্রে থাকবে অধিকার। প্রতিরক্ষা, অর্থ এবং টেলি যোগাযোগ। কিন্তু জম্মু-কাশ্মীরের থাকবে নিজস্ব সংবিধান, নিজস্ব পতাকা। এমনকি প্রধানমন্ত্রীও থাকবেন।
১৯৫২ সাল থেকে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জনসংঘ এবং জম্মুর প্রজা পরিষদ পার্টি আন্দোলন করতে শুর করে যে, একই দেশে দুই সংবিধান, দুই প্রধানমন্ত্রী, দুই পতাকা, থাকতে পারে না। এই আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করার জেরেই ১৯৫২ সালেরই জুলাই মাসে কাশ্মীরের সঙ্গে একটি চুক্তি হয়। যার নাম দিল্লি চুক্তি। সেখানে কাশ্মীর সরকার মেনে নিল ভারতের পতাকা, সুপ্রিম কোর্ট, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি চাইলে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে পারেন এই রাজ্যে।
১৯৫৩ সালের জুন মাসে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের রহস্যময় মৃত্যু হয় শ্রীনগরে এক সরকারি গেস্ট হাউসে বন্দি থাকা অবস্থায় সিভিল হাসপাতালে। ঠিক দু’ মাসের মধ্যে ভারত সরকার গ্রেফতার করে শেখ আবদুল্লাকে। ঠিক পরের বছর জম্মু-কাশ্মীর পেয়ে যায় নতুন এক রক্ষাকবচ। সংবিধানের ৩৫ এ ধারা। জম্মু-কাশ্মীরের স্থায়ী বাসিন্দা কে। বহিরাগত কেউ এখানে জমি ক্রয়, বিবাহ সম্পর্ক অথবা সরকারি কাজে যোগ দেওয়ার অধিকার পাবে কি না সেটি শর্তসাপেক্ষ। সিদ্ধান্ত নেবে কাশ্মীর বিধানসভা। সোজা কথায় যে কেউ চাইলেও সেখানে স্থায়ী নাগরিক হতে পারবে না।
এই প্রতিটি সিদ্ধান্তই সংঘ পরিবার বিরুদ্ধাচারণ করেছে। জনসংঘ অথবা পরবর্তীকালে বিজেপি তাদের নির্বাচনি ইস্তাহারে বারংবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, তারা যখন ক্ষমতাসীন হবে, তখন ৩৭০ নং ধারা এবং ৩৫ এ ধারা অবলুপ্ত করা হবে। ঠিক সেটাই হয়েছে ২০১৯ সালের আগস্ট মাসে আইন সংশোধন করে। কিন্তু তার সঙ্গে আবার জম্মু-কাশ্মীরকে ভেঙেও দেওয়া হয়েছে। ওই বছর থেকেই জম্মু-কাশ্মীর একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল।
কেন্দ্রীয় সরকার বলেছিল, জম্মু-কাশ্মীরকে পূর্ণাঙ্গ রাজ্য মর্যাদা আবার ফিরিয়ে দেওয়ার তিনটি রোডম্যাপ থাকবে। ১) বিধানসভা এলাকার সীমানা নির্ধারণ ২) বিধানসভার নির্বাচন ৩) পূর্ণাঙ্গ রাজ্য আবার ফিরিয়ে দেওয়া। প্রথম দুই শর্তই পূর্ণ হয়ে গিয়েছে। ২০২৩ সালে বিধানসভার ডিলিমিলিটেশন হয়ে গিয়েছে কাশ্মীরে। দ্বিতীয় শর্ত পালিত হয়েছে ২০২৪ সালে। অর্থাৎ বিধানসভা ভোটও সম্পন্ন হয়ে নির্বাচিত সরকার বসেছে। অথচ কেন্দ্রীয় সরকার ৩ নং প্রতিশ্রুতি নিজেরাই ভঙ্গ করছে। রাজ্যের মর্যাদা দিচ্ছে না।
কাশ্মীরে কাদের সরকার এসেছে? বিজেপি বিরোধী ন্যাশনাল কনফারেন্সের সরকার। শেখ আবদুল্লার নাতি ওমর আবদুল্লা এখন মুখ্যমন্ত্রী। কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হলে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে কী কী ক্ষমতা থাকে? পুলিশ এবং আইনশৃঙ্খলা। এছাড়া অর্থ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত। বাজেট পেশ করেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী দিল্লির সংসদে। সুতরাং বস্তুত জম্মু-কাশ্মীরে বিজেপি বিধানসভা ভোটে জয়ী হয়ে ক্ষমতাসীন হতে না পারলেও, কার্যত জম্মু-কাশ্মীরের ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতেই রয়েছে।
তাহলে কি জম্মু-কাশ্মীরের ক্ষমতা ছেড়ে দিতে রাজি নয় মোদি সরকার? গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার জম্মু-কাশ্মীর বিধানসভায় থাকলেও সেটি একপ্রকার কার্যক্ষমতাহীন। কাশ্মীরকে পূর্ণাঙ্গ রাজ্যের মর্যাদা পুনরায় ফিরিয়ে দেওয়ার মতো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনও যদি না থাকে, তাহলে সেই দায় কিন্তু ভারত সরকারের।
৩৭০ নং এবং ৩৫ এ ধারা কি থাকা উচিত কোনো রাজ্যে? অন্য রাজ্যের তুলনায় একটি মাত্র রাজ্য বিশেষ স্ট্যাটাস ভোগ করবে, এটা কি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় থাকা উচিত? একেবারেই নয়। সব রাজ্যের সমান মর্যাদা ও আইনকানুন থাকা উচিত। কিন্তু ভারতের মতো বৈচিত্রময় জনজাতি ও ভূমিখণ্ডের দেশে সেটা কি সম্ভব?
যারা কাশ্মীরের স্পেশাল স্ট্যাটাস নিয়ে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন ছিলেন, তারা নিশ্চয়ই এটাই জানে যে, নাগাল্যান্ড, মণিপুর, অরুণাচল প্রদেশ এবং মিজোরামের স্পেশাল স্ট্যাটাস আরও কঠোর। যে কোনো ভারতীয়কে সেখানে প্রবেশ করতে হলে ইনার লাইন পারমিট প্রয়োজন। এই রাজ্যগুলিতে ভারতের যে কোনো ব্যক্তি জমি কিনে বাড়ি করে থাকতে পারবে না। সরকারি চাকরিতে নিয়োগ হবে না। কাশ্মীরে যেমন ৩৭০ নং ধারা ছিল, সেরকমই স্পেশাল স্ট্যাটাস উত্তর পূর্ব ভারত এবং অন্য কিছু রাজ্যের বিশেষ কিছু এলাকাতেও আছে। তার নাম ৩৭১ নং ধারা।
জম্মু-কাশ্মীরে বিধানসভা ভোট হয়। সেখানে সাধারণ মানুষ নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করছে। নিজেদের পছন্দের সরকার গঠন করছে। আবার দরকার হলে সেই সরকার পরবর্তী ভোটে বদলে যাবে। এই প্রবণতা হল গণতান্ত্রিক একটি কাঠামোর সবথেকে বৃহৎ বিজ্ঞাপন। এর সঙ্গেই প্রয়োজন জম্মু-কাশ্মীরের পূর্ণাঙ্গ রাজ্য হওয়া। যাতে কাশ্মীরবাসী মনে না করে যে, তাদের মর্যাদা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। তারা যেন নিজেদের সামান্যতম উপেক্ষিত অথবা বঞ্চিত মনে না করে। কেন্দ্রীয় সরকার নিজেদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী জম্মু-কাশ্মীরকে পূর্ণাঙ্গ রাজ্য হিসাবে ঘোষণা করছে না কেন? এ এক রহস্য!