সমৃদ্ধ দত্ত: প্রথম দফার যে চুক্তি হয়েছিল, সেখানে ৩৬টি রাফাল ফাইটার জেট ক্রয়ের ডিল হয়। ভারত ও ফ্রান্সের মধ্যে। সেটা ছিল ইউপিএ সরকারের আমলে। সেই ডিল ছিল ৫৮ হাজার কোটি টাকার। ফ্রান্স থেকে ভারত রাফাল যুদ্ধবিমান কিনবে সেটা অনেক আগেই স্থির হয়ে যায়। এরপর আবার নতুন চুক্তি। এই সবেমাত্র গত সপ্তাহে ২৬টি রাফাল কেনার জন্য ভারত ও ফ্রান্স চুক্তিবদ্ধ হল। এবার ২৬টি রাফাল যুদ্ধবিমান ফ্রান্স বিক্রি করবে ভারতকে। দাম কত? ৬৩ হাজার কোটি টাকা। বুধবার সেই ফ্রান্স ভারত এবং পাকিস্তানকে শান্তির বাণী দিয়েছে! ফ্রান্সের বিদেশমন্ত্রী জঁ নোয়েল ব্যারোঁ পাকিস্তানে ভারতের অপারেশন সিন্দুরের পর বলেছেন, ভারত ও পাকিস্তানের উচিত নিজেদের সংযত করা। আমরা জানি যে ভারতের আত্মরক্ষায় প্রত্যাঘাতের ইচ্ছার কথা। কিন্তু তা সত্ত্বেও দুই দেশের উচিত শান্তি বজায় রাখতে সংঘাতের পথে না যাওয়া। অযথা যেন সাধারণ নাগরিকের মৃত্যু না হয় কোনও দেশে।
প্রথমে ৫৮ হাজার কোটি টাকার ডিল। তারপর
৬৩ হাজার কোটি টাকার ডিল। এটা শুধু রাফালের হিসেব। সেটা ছাড়া ফ্রান্স গোটা দুনিয়ায় মোট যত অস্ত্র বিক্রি করে, তার মধ্যে সবথেকে বেশি কেনে ভারত। অর্থাৎ ফ্রান্সের বৃহত্তম অস্ত্র ক্রেতার নাম ভারত। ভারত ফ্রান্স থেকে এই লক্ষ কোটি টাকা দিয়ে অসংখ্য যুদ্ধসরঞ্জাম কিনছে কেন? যখন এগুলির প্রয়োজন সবথেকে বেশি হবে, তখন ফ্রান্সের থেকে এই শান্তির বাণী শোনার জন্য?
ফ্রান্স ভারতকে এই যে রাফাল, ড্রোন, মিসাইল ইত্যাদি বিক্রি করে এবং নিজের রাজকোষ ভরিয়ে তোলে ভারতের করদাতাদের টাকায়, সেটা কি এই ভারতের শত্রু এবং ভারতকে একই চোখে দেখার জন্য? পাকিস্তানের মদতে জঙ্গিরা ভারতে ঢুকে নিরীহ ২৬জন পর্যটককে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে। ভারত তার পাল্টা জবাব দিতে পাকিস্তানের জঙ্গি ঘাঁটিতে হানা দিয়েছে। এর মধ্যে কোনও রকেট সায়েন্স নেই। সহজ সরল হিসেব। এরকম সময় ফ্রান্সের কী করা উচিত ছিল? ভারতকে শর্তহীন সমর্থন নয়? সেটা না করে ফ্রান্স ভারত এবং পাকিস্তানকে এক পংক্তিতে রেখে এই দুই দেশের অভিভাবক হওয়ার চেষ্টা করছে কেন?
করদাতা হিসেবে আমাদের দাবি হল, ভারত সরকার এরপর যেন ফ্রান্সকে স্পষ্ট প্রশ্ন করে যে, আপনাদের থেকে এই রাফাল এবং আরও হাজারো অস্ত্র সরঞ্জাম কিনে আমরা কী করব? ২৬ জানুয়ারি দিল্লির প্যারেডে শুধু ঝুলন সাজাব? পাকিস্তান যথেচ্ছাচার করলেও আপনাদের থেকে কেনা অস্ত্রশস্ত্র যুদ্ধবিমান মিসাইল এসব কি মিউজিয়ামে সাজিয়ে রাখব? আর আপনারা কখনও ৬০ হাজার কোটি, কখনও ৪৪ হাজার কোটি টাকার ডিল পকেটে পুরে তারপর আমাদের সংযত হওয়ার জ্ঞান দেবেন?
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতের অপারেশন সিন্দুর হওয়ার কথা শোনার পর প্রথম যেকথা বলেছেন, সেটি হল, ইটস আ শেম! অর্থাৎ এই ঘটনা তাঁর কাছে লজ্জাজনক। যত দ্রুত মিটমাট হবে ততই ভালো। ট্রাম্পের ইতিহাস জ্ঞান দুনিয়া জানে। অতএব স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে তিনি বলেছেন, এই দুই দেশ তো কয়েক হাজার বছর ধরে লড়াই করছে। এর আগে তিনি বলেছিলেন, ১৫০০ বছর ধরে ভারত ও পাকিস্তান নাকি কাশ্মীর নিয়ে লড়াই করছে। আমাদের কোনও ক্ষতি নয়। আমেরিকাবাসীর ভয় পাওয়া উচিত যে, কাকে বসিয়েছে তারা সিংহাসনে! সে যাক! আমাদের প্রশ্ন হল, এবার সময় হয়েছে আমেরিকাকে স্পষ্ট বলে দেওয়া যে, সঙ্কটকালে আপনি যদি আমাদের পক্ষে না থাকেন এবং স্পষ্টভাবে সমর্থন না করেন, তাহলে আর আপনার থেকে এত অস্ত্রশস্ত্র পণ্য কিনব কেন? আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ভারতে এলেও সামরিক চুক্তি হয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী আমেরিকা গেলেও অস্ত্র চুক্তি হয়। রাশিয়া থেকে চিরকাল ভারত সবথেকে বেশি যুদ্ধসরঞ্জাম ক্রয় করে এসেছে। ২০১৯ সালের পর থেকে সেই প্রবণতা পাল্টে যায়। রাশিয়া থেকে অস্ত্র ক্রয় প্রায় ৩৬ শতাংশ কমে যায়। আমেরিকার থেকে অস্ত্র কেনা বেড়ে যায়। আমেরিকা ভারতকে অস্ত্র বিক্রিও করবে, আবার পাকিস্তানকে ভারত উচিত শিক্ষা দিলে সেটাকে লজ্জাজনক বলবে? এই দ্বিচারিতা ভারত সহ্য করবে কেন? ইতিহাস জানে ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ অথবা সংঘাতে আমেরিকা জীবনে কখনও ভারতের পক্ষে থাকেনি। আজ এত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক হয়ে যাওয়ার পরও আমেরিকা পাকিস্তানের হাত ছাড়েনি। একই সুরে ভারত ও পাকিস্তানকে শান্তির বাণী দিচ্ছে! কেন? তাহলে ভারত আমেরিকাকে বছর বছর লক্ষ লক্ষ কোটি ডলার পাইয়ে দিচ্ছে কেন?
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে কি না, কতদিন ধরে চলবে সেই সংঘাত ইত্যাদি এখনও কেউ জানে না। কিন্তু পহেলগাঁও এবং অপারেশন সিন্দুরের পর বিদেশি রাষ্ট্রগুলির মনোভাব স্পষ্ট ও প্রকট হয়ে যাচ্ছে। নিঃশর্তভাবে কারা ভারতের পাশে দাঁড়ানোর স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে, সেটা এখনই যেন ভারত সরকার নথিভুক্ত করে রাখে। ইজরায়েল স্পষ্ট বলেছে তারা ভারতের পাশে থাকবে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন নিজেই ফোন করেছেন নরেন্দ্র মোদিকে। মস্কোও ভারতের পাশে।
ভারতের ১৪০ কোটির বেশি জনসংখ্যা। বিপুল সংখ্যক জনতা ইংলিশ স্পিকিং। ঈর্ষণীয় ইয়ং ওয়ার্ক ফোর্স। জিডিপি গ্রোথ বহু দেশের থেকে অনেক উন্নত। কয়েক বছর পর ৫ লক্ষ কোটি ডলারের ইকনমি হয়ে যাবে। সুতরাং এখন সময় এসেছে ভারতের আত্মসম্মান বজায় রেখে উন্নাসিক হওয়ার। মোদির সঙ্গে সাক্ষাতের প্রসঙ্গ উত্থাপন করে ডোনাল্ড ট্রাম্প সংবাদমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, আমি মোদিকে বলেছি ভারত অনেক বেশি ট্যাক্স নেয়। আমার মুখের উপর কেউ কথা বলতে পারবে না। এসব সাহস ট্রাম্প পাচ্ছেন কেন? ভারত সরকার অনেক সৌজন্য দেখিয়েছে। এবার এই পহেলগাঁও কাণ্ডেই স্পষ্ট যে, ভারতের প্রকৃত বন্ধু কে? আর কারা ভারতকে স্রেফ কাস্টমার ভেবে নিয়েছে। ভারতের থেকে লক্ষ কোটি ডলার আয় করবে অস্ত্রশস্ত্র বিক্রি করে, কিন্তু প্রয়োজনের সময় ভারতের পাশে শর্তহীনভাবে থাকবে না। তখন নিরপেক্ষ নিরপেক্ষ খেলা হবে। কেন? রাশিয়ার থেকে আরও বেশি অস্ত্র কেনা হোক। রাশিয়া বিপদের বন্ধু। ফ্রান্স, আমেরিকা, ব্রিটেন শুধুই নিজের স্বার্থ দেখে এবং বন্ধু বন্ধু মুখোশ পরে থাকে।
ভারতের মাটিতে সন্ত্রাসবাদীরা হামলা করে যাচ্ছে পাকিস্তান থেকে এসে। আজ থেকে নয়। বহু বছর ধরে। আমেরিকা অ্যাবটাবাদে ঢুকে ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা করে চলে এল। ভারতকে মিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রি করেও আমেরিকা কখনও বলে না যে, হাফিজ সইদ, মাসুদ আজহার, দাউদ ইব্রাহিমদের বিরুদ্ধেও অনুরূপ ব্যবস্থা নেওয়া হোক। আমিও সঙ্গে থাকব তোমার। এমনকী কোনওদিন এটা দেখা যায়নি যে, এই নামগুলি পাকিস্তানকেও দিয়ে বাধ্য করছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অথবা ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার। আমেরিকার সঙ্গে তাহলে বন্ধুত্ব রেখে লাভ কী হচ্ছে? আজ এই সর্বোচ্চ অস্ত্র বিক্রেতা ভারতকে বলছে, সংযত হতে। যুদ্ধ না করতে। আলোচনা করে মীমাংসা করে নিতে। ইজরায়েলকে কিন্তু বলছে না।
এটাই প্রকৃষ্ট সময় ভারতের চিনে নেওয়ার যে সত্যিকারের কাজে লাগবে এরকম বিদেশি বন্ধুরাষ্ট্র কারা আছে। আর কাদের লক্ষ্য হল শুধুই ১৪০ কোটির দেশে ব্যবসা করা। ভারতের যা সম্পদ, ক্ষমতা, অর্থনীতি, মানবসম্পদ আছে, ভারতকে কেউ অবজ্ঞা করার সাহস পাবে না। ভারত সকলের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখছে। সবথেকে গ্রহণযোগ্য এক বন্ধুরাষ্ট্র সকলের কাছে। অথচ আজও ভারতকে রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে স্থান দেওয়া হচ্ছে না। নিউক্লিয়ার সাপ্লায়ার্স গ্রুপের মতো এলিট রাষ্ট্র গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে না।
অপারেশন সিন্দুর করে ভারত প্রমাণ করেছে যে, কেউ পাশে থাকুক আর নাই থাকুক, ভারত একাই নিজের সিদ্ধান্ত নেবে। এই কঠোর অবস্থানের প্রবণতাই আরও বাড়াতে হবে ভবিষ্যতে।
শক্তের ভক্ত নরমের যম আপ্তবাক্যটি কূটনীতিতেও প্রযোজ্য। যাদের থেকেই ভারত অস্ত্র যুদ্ধবিমান মিসাইল ইত্যাদি কিনবে, তাদের আগাম বলতে হবে যে, কখন এগুলোর ব্যবহার করব সেটা আমি ঠিক করব। আর সেইসব সময় ভারতকে সমর্থন করতে হবে তাদের। এই শর্তও হোক আর্মস ডিলের অঙ্গ। নয়তো সোমবার লক্ষ কোটি ডলারের অস্ত্রচুক্তি করে ভারতের থেকে টাকা হজম করে নেবেন, আর মঙ্গলবার বলবেন, যুদ্ধ নয় শান্তি চাই? এসব দ্বিচারিতা বন্ধ হওয়া দরকার! যুদ্ধ হলে কোনদিকে থাকবে এইসব রাষ্ট্র? সেটা জানা দরকার!