পি চিদম্বরম: সুখবরের বন্যা বইছে। খুচরো মুদ্রাস্ফীতি (রিটেল ইনফ্লেশন) ১.৩৩ শতাংশে নেমে এসেছে। আর ২০২৫-২৬ সালের জন্য জিডিপি বৃদ্ধির অনুমিত হার ৭.৪ শতাংশ। আমার মনে হয়, আমাদের আরও একটি হর্ষধ্বনি যোগ করা উচিত: ভারতের কোথাও কোনোরকম বেকারত্ব নেই, অন্তত বেকারত্ব এমন নয় যে আমাদের দুশ্চিন্তা করতে হবে।
এক
চাকরির জন্য কোনো প্রার্থী নেই!
চাকরির জন্য কোনো প্রার্থী নেই, এই কথা বলার যথেষ্ট কারণ আছে। তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে যে, সরকারি ও আধা-সরকারি ক্ষেত্রে লক্ষ লক্ষ শূন্য পদের জন্য কোনো আবেদনকারী নেই! ভালো বেতন (এবং অষ্টম বেতন কমিশন এটিকে আরো উন্নত করবে), মহার্ঘ ভাতা (ডিএ), বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি বা ইনক্রিমেন্ট, পদোন্নতি, চাকরির নিরাপত্তা, চিকিৎসার সুবিধা, বাড়ি ভাড়া ভাতা (এইচআরএ), পরিবহণ ভাতা এবং অন্যান্য ভাতা, ছুটির সুবিধা, অগ্রিম ও ঋণ এবং সমন্বিত পেনশন প্রকল্প (ইউনিফায়েড পেনশন স্কিম) থাকা সত্ত্বেও, তরুণ-তরুণীরা এই চাকরিগুলিতে যোগ দিতে আগ্রহী নন। ফলে অনুমোদিত সরকারি পদগুলি খালি পড়ে আছে। এই অসাধারণ পরিস্থিতি থেকে আপনি এছাড়া আর কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেন যে, ‘কোনো বেকারত্ব নেই’ এবং চাকরির জন্য কোনো প্রার্থীও নেই!
শিক্ষামন্ত্রকের হিসেবে, ২০২৪ সালের ১ এপ্রিল পর্যন্ত কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে অনুমোদিত এবং শূন্য পদের সংখ্যা ছিল নিম্নরূপ:
অঙ্কের হিসেবে, কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে ২৭ শতাংশ শিক্ষক পদ এবং ৪৭ শতাংশ অশিক্ষক কর্মী পদ শূন্য ছিল। ২০২৫ সালের জুন মাস পর্যন্ত কেন্দ্রীয় বিদ্যালয় সংগঠনে (কেভিএস) ৭,৭৬৫টি শিক্ষক পদ এবং নবোদয় বিদ্যালয় সমিতিতে (এনভিএস) ৪,৩২৩টি শিক্ষক পদ শূন্য ছিল। তৎসত্ত্বেও, আমাদের আশ্বস্ত করা হয়েছে যে ভারতে শিক্ষাব্যবস্থা দারুণ চলছে এবং উন্নতিও করছে।
সরকারি তথ্যই কথা বলছে
দেশজুড়ে আরও অনেক উদাহরণ রয়েছে। কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীতে (সিএপিএফ) ২৫,৪৮৭টি কনস্টেবল পদ শূন্য। রাজস্থানে এলডিসি/ক্লার্ক গ্রেড টু মানের শূন্যপদের সংখ্যা ১০,৬৪৪। বিহারে ১২,১৯৯টি শূন্যপদ রয়েছে। কনস্টেবলের ৬০,২৪৪টি পদ শূন্য রয়েছে উত্তরপ্রদেশে। তামিলনাড়ুতে স্টাফ নার্সের শূন্যপদ ২,২৫৫টি। এই ধরনের চাকরিতে প্রার্থীরা সাধারণত নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়ে। তাঁরা সবে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেছেন কিংবা সদ্য স্নাতক।
শিক্ষার উচ্চ স্তরের দিকে তাকালে, ২১টি এইমস-এ ৩,৪৮৫ জন ফ্যাকাল্টি পদে কর্মরত এবং তাঁদের ক্ষেত্রে শূন্য পদের সংখ্যা ১,৭৩১। একটিমাত্র জেলার দিকে তাকানো যাক। ওড়িশার কেন্দ্রাপাড়ায় যখন ডাক্তার এবং প্যারামেডিক স্টাফ মিলিয়ে ১,০৮৭ জন কর্মরত তখন সেখানে শূন্য পদ ৮০৫টি। ব্যাংকের চাকরির উচ্চ মূল্য এবং বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। এবার দেখা যাক, ১২টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পরিস্থিতি। ছবিটা নিম্নরূপ:
চিন্তা করবেন না, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং ব্যাংকিং ক্ষেত্রে সব ঠিক হ্যায়।
২০২৪ সালের অক্টোবরে চালু করা হয় পিএম ইন্টার্নশিপ স্কিম। ২০২৫ সালের ২ ডিসেম্বর ‘দ্য হিন্দু’ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, দুই রাউন্ডে কোম্পানিগুলির তরফে মোট ১ লক্ষ ৬৫ হাজার অফার বা প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু যুবরা গ্রহণ করেছিলেন তার মধ্যে মাত্র ২০ শতাংশ। ওই অফার যাঁরা গ্রহণ করেছিলেন, তাঁদের এক-পঞ্চমাংশ আবার ইন্টার্নশিপ শেষ করার আগেই তা ছেড়ে দেন। অর্থাৎ সব মিলিয়ে প্রায় ১ লক্ষ ৪০ হাজার অফার উপেক্ষিত রয়ে যায়। কারণ সেগুলি গ্রহণ করার মতো কাউকেই পাওয়া যায়নি।
যাঁরা বিশ্বাস করেন যে উন্নয়নশীল ভারতে বেকারত্ব কোনো সমস্যা নয়, তাঁরা এই পর্যন্ত পড়েই থেমে যেতে পারেন।
দুই
যাঁরা মনে করেন যে বেকারত্ব সত্যিই একটি সমস্যা, তাঁরা আরো পড়তে পারেন।
ন্যায্যভাবে বলতে গেলে, একদিকে শূন্য পদ এবং অন্যদিকে সম্ভবত অনিচ্ছুক চাকরি প্রার্থীদের এই অদ্ভুত পরিস্থিতির জন্য কেবল বিজেপি সরকার একাই দায়ী নয়। এই পরিস্থিতি অনেক সরকার এবং অনেক দশক ধরে চলে আসা প্রবণতার পুঞ্জীভূত ফল। তবে, বিজেপি জমানার দুটি ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে।
অতীত বর্তমানকে তাড়া করে
প্রথমে আসে নোটবন্দির কথা। এটা মানুষের তৈরি এবং স্বআরোপিত এক গুরুতর আঘাত। আমি আগেও বলেছি, কঠোর অর্থে এ কোনো নোটবন্দি নয়। কারণ কোনো মুদ্রা বা নোট বাতিল করা হয়নি অথবা এই ব্যবস্থার দরুন কোনও নোট তুলেও নেওয়া হয়নি। এটা এমন একটা প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল যার মাধ্যমে ‘পুরোনো নোটের বদলে নতুন নোট’ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল। প্রচলিত মুদ্রার (কারেন্সি-ইন-সার্কুলেশন বা সিআইসি) মোট মূল্য পুরোনো স্তরে দ্রুতই ফিরে এসেছিল এবং প্রকৃতপক্ষে ছাড়িয়েও গিয়েছিল সেটা। ২০১৬ সালের ৪ নভেম্বর সিআইসি’র মোট মূল্য ছিল ১৭ লক্ষ ৯৭ হাজার কোটি টাকা। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে শেষাশেষি এসে তা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ৩৯ লক্ষ ২৪ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। সবচেয়ে খারাপ পরিণতি এটাই হয়েছিল যে, নোটবন্দির কারণে হাজার হাজার ছোটো ও মাঝারি ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায় এবং নাকচ হয়ে যায় চাকরি বা কর্মসংস্থানের সুযোগ। অবশ্য সরকার তা আজও অস্বীকার করে চলেছে। কিন্তু, অল ইন্ডিয়া ব্যাপার মণ্ডলের মতে, ২০১৬ সালে দেশে ছোটো ব্যবসার সংখ্যা ছিল ৬ কোটি ২৫ লক্ষ। গত দশকে তার প্রায় ৪৮ শতাংশেরই ঝাঁপ বন্ধ হয়ে গিয়েছে।
দ্বিতীয় ধাক্কার নাম কোভিড। ২০২২ সালের একটি সমীক্ষায় অনুমান করা হয়েছিল যে, মহামারির কারণে ১৪ শতাংশ ক্ষুদ্র, ছোটো ও মাঝারি শিল্প (এমএসএমই) স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছে। একটি সরকারি রিপোর্টে প্রকাশ, ২০২০ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে ৭৫ হাজার রেজিস্টার্ড ক্ষুদ্র, ছোটো ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠান (এমএসএমই) বন্ধ হয়ে গিয়েছে (যা কোভিড-আক্রান্ত বছরগুলিকেও ছাড়িয়ে গিয়েছে)। ইউনাইটেড নেশনস কনফারেন্স অন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ইউএনসিটিএডি) সংস্থার অনুমান, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভারতের ৪৭ শতাংশ এমএসএমই সংস্থা স্থায়ী অথবা সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এই সংখ্যাগুলি এখন যাচাই করা সম্ভব নয়, তবে এগুলি সাধারণ পর্যবেক্ষণের সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ। আগের একটি কলামে (বিশেষ নিবন্ধ) এই ব্যাপারে আমার মত জানিয়েছিলাম যে, এর প্রধান কারণ সরকার আর্থিক সহায়তা এবং ঋণের গ্যারান্টির প্রতিশ্রুতি পূরণ করেনি। নোটবন্দি অথবা কোভিড—যে কারণেই হোক, ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপুল সংখ্যক মানুষ চাকরি হারিয়েছেন। এই চাকরিগুলি কি ফেরানো গিয়েছে কিংবা নতুন করে তৈরি করা হয়েছে? এই প্রশ্নে সরকার নীরব।
এমজিএনআরইজিএ বা একশো দিনের কাজের প্রকল্পের জায়গায় আনা হয়েছে একটি সরবরাহ-নির্ভর, গ্যারান্টিবিহীন এবং তহবিল-সংকটযুক্ত একটি প্রকল্প (সাপ্লাই ড্রাইভেন, গ্যারান্টি-লেস, ফান্ডস-কনস্ট্রেইন্ড স্কিম)। এতে গ্রামাঞ্চলের গরিব মানুষের আর্থিক পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে। কারণ তাঁরা বেকারত্বের মুখোমুখি হবেন কিংবা তাঁদের কর্মসংস্থানের সুযোগ কমবে এবং নিম্ন মজুরিতেও খাটানো হবে তাঁদের। অনেক গ্রামীণ পরিবার, বিশেষ করে মহিলারা, তাঁদের বাড়তি আয়ের সুযোগ হারাবেন।
বেকারত্ব কোনো বড়ো সমস্যা নয়—এই তত্ত্বটি একটি ভ্রান্ত ধারণার বাহক এবং কপটতাপূর্ণ। সরকার যখন আত্মপ্রশংসায় মগ্ন, তখন আমরা জানি যে বেকারত্বই অর্থনীতির সর্ববৃহৎ কলঙ্ক।
লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত