পরামর্শে বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিক্যাল কলেজের মনোরোগ বিভাগের অধ্যাপক ডাঃ রঞ্জন ভট্টাচার্য ও অ্যাপোলো মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট ফিজিশিয়ান ও রিউম্যাটোলজিস্ট ডাঃ শ্যামাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়।
পরামর্শে বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিক্যাল কলেজের মনোরোগ বিভাগের অধ্যাপক ডাঃ রঞ্জন ভট্টাচার্য ও অ্যাপোলো মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট ফিজিশিয়ান ও রিউম্যাটোলজিস্ট ডাঃ শ্যামাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়।
বিজ্ঞান আমাদের জীবনে এনেছি গতি। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে কিছু দুর্গতিও। বেগ ও আবেগের মধ্যে বেগের দিকেই পাল্লা ভারী। তার জেরেই জীবনে এসেছে স্ট্রেস নামক মূর্তিমান সমস্যা। কর্মরত থেকে ঘর সংসার সামলানো ব্যক্তি—স্ট্রেসের থাবা থেকে কেউ বাঁচেননি। শিশুদের উপর যেমন বাবা মায়ের চাপ, ভালো রেজাল্টের প্রত্যাশা, সব কিছুতে বিজয়ী হওয়ার জোর, ঠিক তেমন বাবা মায়ের উপর রয়েছে অফিসের চাপ, ঘর সংসার চালানোর জটিলতা।
স্ট্রেসের তিন ধাপ। প্রথমে আসে সচেতনতার পর্ব বা ‘অ্যালার্ম স্টেজ’। এই পর্বে স্ট্রেস এলে অ্যাড্রিনালিন ক্ষরণ হয়। এর পরের ধাপ প্রতিরোধ পর্ব বা ‘রেজিস্ট্যান্স স্টেজ’। এই পর্বে মানুষ দিনরাত স্ট্রেসকে সঙ্গে নিয়েই স্ট্রেসের বিরুদ্ধে সংঘর্ষ করে কাজ করে। এর পর আসে শ্রান্তির পর্ব বা ‘এক্সজশন স্টেজ’। খুব গভীর স্ট্রেস দিনের পর দিন ধরে থাকলে শরীর একসময় শ্রান্ত হয় ও আর স্ট্রেস সইতে পারে না। একেই বলে এক্সজশন স্টেজ।
মানসিক চাপ থেকে মনের রোগ
• প্রাণীর মস্তিষ্কের বেশ কিছু অঞ্চল মূলত অ্যামিগডালা ও হাইপোথ্যালামাস পিটুইটারি অঞ্চল স্ট্রেসের কারণে শুকিয়ে যায়। মস্তিষ্কের কার্যকারিতা এবং গঠন পরিবর্তন করতে পারে। মস্তিষ্কের আয়তন ছোট হয়ে যায়। স্ট্রেস অ্যাড্রিনালিন গ্রন্থিতে সমস্যা তৈরি করে। লিম্ফ্যাটিক অঙ্গগুলিরও ক্ষতি হয়। আমরা নানা কাজে উদ্যম হারিয়ে ফেলি।
• অতিরিক্ত মানসিক চাপ উদ্বেগজনিত সমস্যা তৈরি করে। নানা ধরনের অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার, প্যানিক অ্যাটাক তৈরি হতে পারে। দিনের পর দিন স্ট্রেসে থাকলে মস্তিষ্কের গ্রে ম্যাটার ও হোয়াইট ম্যাটারের ভারসাম্য নষ্ট হয়। ঘন ঘন অ্যাড্রিনালিন ক্ষরণে মস্তিষ্কের নিউরোনগুলিও কিছুটা ধ্বংস হয়। ফলে মস্তিষ্কের আচরণগত কর্মক্ষমতা কমে।
• দীর্ঘমেয়াদি স্ট্রেসের কারণে কিছু ধরনের ডিপ্রেশন থাবা বসাতে পারে। ডিপ্রেশন নানা ধরনের হয়। তার নানা স্তর থাকে। খুব সংক্ষেপে বললে, স্ট্রেস থেকে আসা ডিপ্রেশনের জেরে থেকে অনিদ্রা, খিদে কমে যাওয়া, ওজন কমে যাওয়া ইত্যাদি উপসর্গ দেখা যায়। ব্যক্তিত্বের বদল ঘটিয়ে আর্লি ডিমেনশিয়াও ডেকে আনতে পারে মানসিক চাপ থেকে তৈরি ডিপ্রেশন! কারও ক্ষেত্রে আর্লি অ্যালঝাইমার্স দেখা দেয়। শুধু তাই-ই নয়, কিছু কিছুক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশন রোগীকে আত্মহত্যার দিকেও ঠেলে দেয়।
• কারও ক্ষেত্রে হঠাৎ কোনও ঘটনা বা দুর্ঘটনা থেকে পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার আসতে পারে। মানসিক চাপ ও উদ্বেগ থেকেই এই সমস্যা আসে। তখন রোগী সেই ঘটনা বা দুর্ঘটনাকে সহজে ভুলতে পারেন না। এ থেকেও আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা যায়।
• হিপোক্যাম্পাস গ্রন্থি মস্তিষ্কের নতুন তাজা কোষ তৈরি করে। স্মৃতি, আবেগ এবং জ্ঞানের সঙ্গে এই গ্রন্থি যুক্ত। স্ট্রেস হিপোক্যাম্পাসের সকল কার্যকলাপকে দমন করে। তা মানুষের স্মৃতিশক্তির উপর প্রভাব ফেলে। ফলে জরুরি কাজ ভুলে যাওয়া, ছোট ছোট দরকারি তথ্য মনে রাখতে না পারার মতো সমস্যা দেখা দেয়। ছাত্রছাত্রীদের ক্ষেত্রে স্ট্রেস তাকে আরও অমনোযোগী করে তোলে। পড়াশোনায় অনীহা দেখা দেয়।
• কয়েক ধরনের শুচিবায়ুগ্রস্ততা বা ওসিডি-র সঙ্গেও স্ট্রেসের যোগ রয়েছে। মানসিক চাপ থেকে একা হতে হতে অনেকে ওসিডি-র শিকার হন। কোভিডের সময় অবসাদ উদ্বেগের সঙ্গে অ্যাকিউট পোস্ট ট্রমাটিক স্টেস ও ওসিডি-র বাড়বাড়ন্ত লক্ষ করা গিয়েছিল। এসবের নেপথ্যে স্ট্রেস অনেকটাই দায়ী।
মানসিক চাপ থেকে শারীরিক রোগ
• মানসিক চাপ বা স্ট্রেসের ছাপ পড়ে শরীরের কলকব্জার উপরেও। সেরোটোনিন ট্রান্সপোর্টার, এফকেবিপি৫ ইত্যাদি কিছু জিন রয়েছে যা স্ট্রেসজনিত সমস্যায় মানুষকে বিপদগ্রস্ত করে তোলে। কিছু প্রচলিত অসুখকে ডেকে আনে। স্ট্রেস ও স্ট্রেস হরমোনগুলি (অ্যাড্রিনালিন, নন অ্যাড্রিনালিন, কর্টিসল) প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যেসব শারীরিক সমস্যা তৈরি করে, তার অন্যতম হার্ট ও কার্ডিওভাস্কুলার সমস্যা। প্রথমেই আসে উচ্চ রক্তচাপের কথা। এছাড়া স্ট্রোক, ইসকিমিক স্ট্রোক, হেমোর্যাজিক স্ট্রোকের ঝুঁকিও স্ট্রেসের কারণে বাড়ে।
• ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রেও জিনগত কারণের সঙ্গে টেনশন, উদ্বেগ ও স্ট্রেস ওতপ্রোতভাবে যুক্ত।
• স্ট্রেস থেকে নানা ধরনের ব্যথাবেদনা তৈরি হয়। কিছু জয়েন্ট পেইন আসলে স্ট্রেস থেকে হওয়া ফাইব্রোমায়েলজিক সিন্ড্রোম। আর্থ্রাইটিসের মতো অস্থিসন্ধিতে ব্যথা, ‘আর পারছি না’ মনোভাব, অধিক ক্লান্তি (ফ্যাটিগনেস) ধেয়ে আসে স্ট্রেসের হাত ধরেই।
• মানসিক চাপ থেকে কিছু বাওয়েল সিন্ড্রোম দেখা যায়। বাঙালি মনে করে, তার গ্যাস হয়েছে। আসলে ‘গ্যাস’ বলে কোনও অসুখ নেই। এই অসুখ মূলত হাইপার অ্যাসিটিডি। অতিরিক্ত অ্যাসিড নির্গমন থেকেই পেটে ব্যথা, হজমের কষ্ট হয়। যার মূল কারণ স্ট্রেস।
• স্ট্রেসের অন্যতম ফসল ইরিটেবল বাওয়েল সিন্ড্রোম কনস্টিপেশন (আইবিএস-সি) ও ইরিটেবল বাওয়েল ডায়ারিয়া (আইবিএস-ডি)। অর্থাৎ স্ট্রেসের কারণে কেউ কেউ কোষ্ঠকাঠিন্যের শিকার হন, কারও ক্ষেত্রে আবার ডায়ারিয়া দেখা দেয়। এই অসুখে পেটে ব্যথা হয়, পেট ভালো করে পরিষ্কার হয়নি বলে মনে হয়। এর চিকিৎসাও মূলত স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণের ওষুধ দিয়েই করা হয়।
• কিছু কিছু চর্মরোগের সঙ্গেও স্ট্রেস ভীষণ সম্পর্কযুক্ত। ত্বকে চুলকানি ও র্যাশ হওয়ার পাশাপাশি, সোরিয়াসিস, লাইকেনপ্লেনাসের মতো অটো ইমিউন ডিজিজও স্ট্রেসের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। স্ট্রেস বাড়লে এসব অসুখও বাড়ে। স্ট্রেস কম অবস্থায় রোগী ভালো থাকেন।
• স্ট্রেস থেকে টেনশন হেডেক বা মাথাব্যথার সমস্যা প্রবল আকার ধারণ করতে পারে। ব্রেন টিউমারের ব্যথার মতোই এই ব্যথা হয়। বহু রোগীর ক্ষেত্রে তাই একে নিউরোলজিক্যাল সমস্যা বলে ভুল করা হয় ও এমআরআই করেও রোগ ধরা পড়ে না।
• যৌন জীবনের সঙ্গেও স্ট্রেস জড়িয়ে। মহিলাদের দ্রুত মেনোপজ হওয়া, যৌনসম্পর্ক স্থাপনে অনীহা, পুরুষদের যৌন জীবনেও নানা সমস্যা এই স্ট্রেসের হাত ধরে আসে।
• যে কোনও স্ট্রেস শরীরের ইমিউনো সিস্টেমে আঘাত হানে। তাই নানা সংক্রমণে আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা বাড়ে।
লিখেছেন মনীষা মুখোপাধ্যায়