Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

এগারো বছরে মোদি সরকার দেশকে কী দিল

এই লেখাটি, গত সপ্তাহে প্রকাশিত আমার ‘বিশেষ নিবন্ধ’-এর পরবর্তী অংশ। আমি এমন তথ্য পছন্দ করি যা সঠিক এবং যাচাই করে নেওয়া সম্ভব।

এগারো বছরে মোদি সরকার দেশকে কী দিল
  • ২৩ জুন, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

পি চিদম্বরম: এই লেখাটি, গত সপ্তাহে প্রকাশিত আমার ‘বিশেষ নিবন্ধ’-এর পরবর্তী অংশ। আমি এমন তথ্য পছন্দ করি যা সঠিক এবং যাচাই করে নেওয়া সম্ভব। কিন্তু, দুর্ভাগ্য যে, বেশিরভাগ পাঠকই তা করেন না। সংখ্যা উপস্থাপন করলে, এমনকী শিক্ষিত ব্যক্তিরাও সেসব এড়িয়ে যান। আমি বিশ্বাস করি যে অর্থনীতি বিষয়ক রচনাকে ছবির চেয়ে বেশি বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে প্রাসঙ্গিক কিছু সংখ্যার উপস্থাপন।

Advertisement

যদি সুশাসনের চূড়ান্ত টেস্ট হয় জনগণের মঙ্গল, তাহলে প্রশ্ন হল—‘একজন ব্যক্তির কি খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা, পরিবহণ, ফ্যামিলি গ্যাদারিংস এবং বিনোদনের মতো প্রয়োজনীয় বিষয়গুলির জন্য পর্যাপ্ত আয়পত্তর আছে?’ (পরিবর্তনশীল সময়ের কারণে অপরিহার্য বলে বিবেচিত হতে পারে এমন অন্যান্য খরচখরচাগুলি আমি বাদ রেখেছি)। প্রাপ্ত সেরা সরকারি তথ্য হল গৃহস্থালি ভোগব্যয় সমীক্ষা (এইচসিইএস)। আমার মতে, আয়ের চেয়ে মেট্রিক অফ কনজামশন বা ভোগব্যয়ের হিসেব দিয়ে গড় পরিবারের জীবনযাত্রার ‘স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড কোয়ালিটি’  বা এককথায় ‘গুণমান’ বোঝানো সম্ভব। দেশে শেষবার এইচসিইএস করা হয়েছিল ২০২৩-২৪ সালে। তাতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল সমগ্র দেশকেই। তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল—১,৫৪,৩৫৭টি গ্রামীণ এবং ১,০৭,৫৯৬টি শহুরে মিলিয়ে মোট ২,৬১,৯৫৩টি পরিবার থেকে। প্রসঙ্গত, নরেন্দ্র মোদির সরকার ২০২৩-২৪ সালেই দশবছর পূর্ণ করেছে। এইচসিইএস তথ্য সংগৃহীত হয়েছে ব্যাপকার্থেই।
ভোগব্যয়ের পরিমাপযোগ্য তথ্যাদি
সমীক্ষার কেন্দ্রবিন্দু হল গড় মাসিক মাথাপিছু ভোগব্যয়ের (এমপিসিই) তথ্য। একজন ব্যক্তির মাসিক কনজামশন এক্সপেনডিচার বা ভোগব্যয় থেকেই তাঁর জীবনযাত্রার গুণমান বুঝে নেওয়া সম্ভব। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয় ওই ব্যক্তিটি প্রকৃতপক্ষে ধনী, গরিব, মধ্যবিত্ত—কোন শ্রেণিতে পড়েন। সৌভাগ্যবশত, জনসংখ্যার ‘ফ্রাকটাইল ক্লাস’ ভিত্তিক তথ্য পাওয়া গিয়েছে, অর্থাৎ তথ্য পরিবেশিত হয়েছে জনসংখ্যাকে প্রতি ১০ শতাংশে ভাগ করে। এখানে সেই তথ্য দেওয়া হল: দেখা যাবে যে (নিবন্ধের শেষে টেবিল দ্রষ্টব্য)।
• আয় এবং ঋণগ্রহণের সার্বিক রূপ হল ব্যয়। একেবারে নীচের দিকের ১০ শতাংশ ব্যক্তির দৈনিক খরচের পরিমাণ ৫০-১০০ টাকা। নিজেকে জিজ্ঞাসা করুন, রোজ ৫০-১০০ টাকা খরচ করে একজন ব্যক্তি কী ধরনের খাবার খেতে পারেন? একজন ব্যক্তি কী ধরনের বাসস্থান পেতে পারেন? ওই ব্যক্তি কী ধরনের চিকিৎসা পরিষেবা পেতে পারেন বা ওষুধপত্র কিনতে পারেন?
• জনসংখ্যার ১০ শতাংশ কোনও তুচ্ছ সংখ্যা নয়, ভারতের ক্ষেত্রে ১৪ কোটি মানুষ। যদি তাদের জন্যই একটি পৃথক দেশ হতো, তাহলে জনসংখ্যার দিক থেকে সেটি বিশ্বে দশম স্থানে থাকত। তবুও, নীতি আয়োগ এবং সরকার দাবি করে যে ‘দরিদ্র’ মোট জনসংখ্যার মাত্র ৫ শতাংশ বা তারও কম। এই দাবি নিষ্ঠুর এবং অসৎও বটে।
• সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক তুলনা হল—শীর্ষ ৫ শতাংশ এবং সর্বনিম্ন ৫ শতাংশের মাথাপিছু ব্যয়ের অনুপাত। ১২ বছর আগে এটি প্রায় ১২ গুণ ছিল। ২০২৩-২৪ সালে এটি এখনও প্রায় সাড়ে ৭ গুণ।
কৃষক ও খাদ্যের হতাশাজনক তথ্যাদি
সরকার দাবি করেছে, কৃষিক্ষেত্রের যে বৃদ্ধি ঘটেছে তা শক্তিশালী। বেশ, কিন্তু কৃষকের জীবন কি শক্তিশালী হয়েছে? নাবার্ডের (২০২১-২২) তথ্য থেকে দেখা গিয়েছে যে, প্রায় ৫৫ শতাংশ কৃষি পরিবার ঋণের বোঝার ভারে নুয়ে রয়েছে। প্রতি পরিবারের গড় বকেয়া ঋণের পরিমাণ ৯১ হাজার ২৩১ টাকা। গত ৩ ফেব্রুয়ারি লোকসভায় সরকারের তরফে দেওয়া এক জবাব অনুসারে, বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলির কাছে ১৩ কোটি ৮ লক্ষ কৃষকের ঋণের পরিমাণ ২৭ লক্ষ ৬৭ হাজার ৩৪৬ কোটি টাকা। এছাড়া সমবায় ব্যাঙ্কগুলি থেকে ৩ কোটি ৩৪ লক্ষ কৃষক ২ লক্ষ ৬৫ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন। আঞ্চলিক গ্রামীণ ব্যাঙ্কগুলির কাছে ২ কোটি ৩১ লক্ষ কৃষক ঋণী ৩ লক্ষ ১৯ হাজার ৮৮১ কোটি টাকার জন্য।
পিএম কিষান স্কিমের একাধিক দুর্বলতা রয়েছে। এই স্কিমে ২০২২ সালের এপ্রিল-জুলাই 
মাসে সবচেয়ে বেশি কৃষক তালিকাভুক্ত হন—১০ কোটি ৪৭ লক্ষ। ২০২৩ সালে, ১৫তম কিস্তির 
সময় সংখ্যাটি নেমে আসে ৮ কোটি ১০ লক্ষে। সরকারের দাবি, গত ফেব্রুয়ারিতে, ১৯তম কিস্তিতে সংখ্যাটি বেড়ে ৯ কোটি ৮০ লক্ষে পৌঁছেছে। এই অসঙ্গতির কোনও ব্যাখ্যা মেলেনি। ব্যাপারটি অযৌক্তিক এই কারণে যে, ভাড়াটে কৃষকরা এক্ষেত্রে যোগ্য বিবেচিত হন না।
ফসল বিমা প্রকল্পটি পরিমার্জনসহ ইউপিএ সরকার নতুনভাবে চালু করেছিল। বেসরকারি বিমাকারীদের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। তবে বিমা কোম্পানিগুলিকে ‘না-লাভ, না-ক্ষতি’র ভিত্তিতে প্রকল্পটি চালাবার নির্দেশ দিয়েছিল সরকার। অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনা (পিএমএফবিওয়াই) নামে এনডিএ যেটি চালু করেছে সেটি একটি ‘এক্সটরশনেট স্কিম’ বা ‘তোলাবাজি প্রকল্পে’ পরিণত হয়েছে। কেননা, সংগৃহীত মোট প্রিমিয়ামের নিরিখে ক্লেম মেটানোর হার ২০১৯-২০ সালে ছিল ৮৭ শতাংশ এবং সেটা মাত্র ৫৬ শতাংশে নেমে এসেছে ২০২৩-২৪ সালে।
১০০ দিনের কাজের নিশ্চয়তা বা এমজিএনআরইজিএস হল একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প। কিন্তু গত তিনবছরে এই প্রকল্পে বরাদ্দের পরিমাণ থমকে রয়েছে। সক্রিয় জব কার্ড ছেঁটে ফেলা হয়েছে দেড় কোটিরও বেশি। কাজের গ্যারান্টি রয়েছে বছরে ১০০ দিনের, কিন্তু বাস্তবে সেখানে দেওয়া হয়েছে গড়ে মাত্র ৫১ দিনের। প্রকল্পটি ছিল চাহিদা-ভিত্তিক (ডিমান্ড-ড্রাইভেন)। তার পরিবর্তে, এই সরকার এটিকে অভাবী (ফান্ড-স্টার্ভড) প্রকল্প বানিয়ে ফেলেছে। 
মাথাপিছু ৫ কেজি শস্য বিনামূল্যে দেওয়া হয়। এই প্রকল্পে ৮০ কোটি মানুষ উপকৃত হলেও বাদ পড়েছেন ১০ কোটি যোগ্য নাগরিক। বিনামূল্যে রেশন এবং মিড-ডে মিল প্রকল্প চালু থাকা সত্ত্বেও, ৩৫.৫ শতাংশ শিশু খর্বকায় সমস্যার শিকার। ভগ্নস্বাস্থ্যের সমস্যায় ভুগছে ১৯.৩ শতাংশ শিশু। বিশ্ব ক্ষুধার সূচকে ১২৭টি দেশের মধ্যে ভারতের র‌্যাঙ্ক ১০৫।
উৎপাদন ক্ষেত্রের মূল দুর্বলতা
গ্রস ভ্যালু অ্যাডেড বা জিভিএ’তে উৎপাদনের অংশ ২০২৪-২৫ সালে ১৩.৯ শতাংশে 
নেমে এসেছে, এটি ২০১১-১২ সালে ১৭.৪ শতাংশ ছিল। দারুণ প্রোডাকশন-লিঙ্কড ইনসেনটিভ স্কিমটি ব্যর্থ হয়ে গিয়েছে। ১৪টি সেক্টরের জন্য ১ লক্ষ 
৯৬ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল। কিন্তু তার মধ্যে থেকে বণ্টিত হয়েছে মাত্র ১৪ হাজার ২০ কোটি টাকা।
ফাস্টেস্ট গ্রোয়িং লার্জ ইকনমি বা দ্রুততম বিকাশমান বৃহৎ অর্থনীতি হওয়ার মানে এই নয় যে, ভারতীয় অর্থনীতি সুস্বাস্থ্যের অধিকারী কিংবা এই অর্থনীতির আশীর্বাদে দারিদ্র্য দূর হয়ে যাবে অথবা ভারতকে একটি ‘উন্নত’ দেশের স্তরে উন্নীত করবে। প্রতি দশবছর অন্তর ভারতের জন্য জরুরি হল—একদফা কাঠামোগত সংস্কার, রাজ্যগুলিতে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, ম্যাসিভ ডি-রেগুলেশন বা ব্যাপক নিয়ন্ত্রণমুক্তি, আরও প্রতিযোগিতা এবং পথ থেকে সরকারের সরে যাওয়া। 
• লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ