Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

দেরিতে হলেও স্বাগত

মনে পড়ে যাচ্ছে ৩২ বছর আগের কাহিনি। ১৯৯৩ সালে চালু হল ভোটার সচিত্র পরিচয়পত্র (এপিক)। জাতীয় নির্বাচন কমিশনের এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত স্বতঃপ্রণোদিত ছিল না।

দেরিতে হলেও স্বাগত
  • ১৭ মার্চ, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

মনে পড়ে যাচ্ছে ৩২ বছর আগের কাহিনি। ১৯৯৩ সালে চালু হল ভোটার সচিত্র পরিচয়পত্র (এপিক)। জাতীয় নির্বাচন কমিশনের এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত স্বতঃপ্রণোদিত ছিল না। এ ছিল তৎকালীন যুব কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একক কৃতিত্ব। জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে বামফ্রন্ট রাইটার্স দখল করেছিল ১৯৭৭ সালে। কিন্তু তারা জনপ্রিয়তা হারাচ্ছিল দ্রুত। এর পিছনে ছিল সিপিএমের স্বৈরচারারী ভূমিকা। লালপার্টির পায়ের তলার মাটি যত সরছিল তত তারা আশ্রয় নিচ্ছিল ভোট জালিয়াতির। ভুয়ো, ভূতুড়ে ভোটারই বড় শক্তি হয়ে উঠেছিল আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের। গণতন্ত্রকে এইভাবে গলা টিপে হত্যা, মেনে নিতে রাজি ছিলেন না প্রদেশ যুব কংগ্রেস সভানেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর বক্তব্য ছিল, ভোট জালিয়াতি ঠেকানোর একমাত্র উপায় হতে পারে সব ভোটারের এপিক। শুধু মৌখিক দাবি জানিয়েই ক্ষান্ত হননি মমতা, তিনি দুর্বার গণআন্দোলনেরও ডাক দিয়েছিলেন। চতুর্থ বামফ্রন্ট সরকারের ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার মতোই ‘মহাকরণ অভিযান’ ঘোষণা করেন তিনি। ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাইয়ের ওই আন্দোলন দমন করতে জ্যোতি বসু চরম রাস্তাই নিয়েছিলেন। তাঁর পুলিস নির্বিচারে গুলি চালিয়েছিল নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের বুক লক্ষ্য করে। ১৩ জন তরুণের তাজা রক্তে সেদিন লাল হয়ে গিয়েছিল কলকাতার রাজপথ! 

Advertisement

জ্যোতি বসু, এমনকী সিপিএম’ও আজ রাজক্ষমতায় নেই। কিন্তু তাই বলে ভোট জালিয়াতি অতীত হয়ে যায়নি। বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, আজকের দেশের শাসক বিজেপির হাতসাফাইয়ের শিকার গণতন্ত্র, নানা রাজ্যে। সাম্প্রতিক অতীতে, একাধিক রাজ্যে বিধানসভার ভোটে জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। সেটা ভুয়ো, ভূতুড়ে, ডুপ্লিকেট—যে নামেই অভিহিত করা হোক না কেন, ভোট জালিয়াতি বহমান! তাঁর অভিযোগের সারবত্তা কতখানি তার প্রমাণ ইতিমধ্যেই মিলেছে এরাজ্যের নানা প্রান্তে। তৃণমূল সুপ্রিমোর নির্দেশে বাংলার সর্বত্র ভোটার তালিকা যাচাইতে নেমে গিয়েছেন তৃণমূল কর্মীরা। আর তাতেই ধরা পড়েছে রকমারি জালিয়াতি। স্বভাবতই তোলপাড় এখন দেশজুড়ে। চোখ খুলে গিয়েছে অন্য রাজ্যগুলিতে অবিজেপি নেতৃত্বের। উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম সর্বত্র বিরোধীরা এই প্রশ্নে বাংলার বাঘিনির সঙ্গে একমত। দেশজুড়ে ভূতুড়ে ভোটার বিদায় দিয়ে কেবলমাত্র স্বচ্ছতার নীতিতে ভোটার তালিকা তৈরি করার দাবিতে এখন সরব সব বিরোধী দলই। এপিক ইস্যুতে প্রায় প্রতিদিনই ঝড় বয়ে যাচ্ছে সংসদে। এই বিতর্কে প্রবল চাপে এখন জাতীয় নির্বাচন কমিশন। তড়িঘড়ি উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক ডাকল কেন্দ্র। আগামী কাল, মঙ্গলবার কমিশনের দপ্তরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক, আধার কর্তৃপক্ষ এবং নির্বাচন কমিশনের মধ্যে এই বৈঠক হবে। জল্পনা তুঙ্গে যে, এতদিন যা ছিল ঐচ্ছিক, অর্থাৎ আধার এবং এপিক সংযোগকরণ, সেটাই কি আবশ্যিক করার কথা ভাবা হচ্ছে? এই প্রশ্ন ও চর্চার কারণ, আগামী কালকের বৈঠকে হাজির হতে বলা হয়েছে আইন মন্ত্রকের অফিসারদেরও। আধার এবং এপিক, দুটি ক্ষেত্রেই আইনমন্ত্রকের প্রত্যক্ষ সংযোগ নেই। প্রশ্ন উঠেছে তাহলে তাদেরও ডাকা হল কেন? ১৯৫১ সালের রিপ্রেন্টেজশন অব পিপলস অ্যাক্টে কোনও বদল আনা হবে কি? 
এই গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যুতে ব্যাকফুটে মোদি সরকার এবং বিজেপি। কমিশনকেও এই প্রথম যথেষ্ট বিব্রত দেখাচ্ছে। কারণ ভোটার তালিকায় অনিয়ম যে মারাত্মক রকমেরই হয়েছে, সেটা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে তারা। কমিশন এই ইস্যুতে সমস্ত রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৈঠক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা চেয়েছে প্রত্যেকের মতামত, সুপারিশ, পরামর্শ এবং প্রস্তাব। ১৮ মার্চ কমিশনের দিল্লি অফিসের বৈঠকে থাকবেন স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রক এবং আধার কর্তৃপক্ষ। ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে যে, নির্বাচন কমিশন একটি মুখরক্ষার ফর্মুলা সামনে আনতে চাইছে দ্রুত। কমিশনের লক্ষ্য আপাতত চাপমুক্তি এবং দ্রুত মুখরক্ষা। জনপ্রতিনিধি আ‌ইনে শেষবার সংশোধনী আনা হয় ২০২১ সালে। তারপরই কমিশন তড়িঘড়ি ভোটারদের আধার নম্বর সংগ্রহ করা শুরু করেছিল। যদিও তা ছিল ঐচ্ছিক। ওই প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্যই ছিল ভোটার তালিকায় অস্বচ্ছতা দূর করা। কিন্তু সেটি হয়নি। কেন? কারণ, এপিক-আধার সংযোগ আবশ্যিক নয়। মঙ্গলবার কমিশনের ফুল বেঞ্চ বৈঠক করবে আইন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক এবং ইউআইডিএআই কর্তৃপক্ষের সঙ্গে। এজেন্ডা—এপিক-আধার সংযোগ! ভোটার তালিকায় অস্বচ্ছতা কমিশনের পর্যবেক্ষণেই ধরা পড়া উচিত ছিল। সংশোধন হওয়াও জরুরি ছিল সেইমতো এবং অনেক আগেই। যাই হোক, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চাপে পড়ে এখনও যদি কমিশন কাজটি করতে আন্তরিকভাবে উদ্যোগী হয়, তবে তাদের আগাম ধন্যবাদ প্রাপ্য। কারণ একটি সরকার গঠন প্রক্রিয়ার মধ্যে ন্যূনতম অস্বচ্ছতাও বরদাস্ত করা যায় না। কেননা অস্বচ্ছতার নীতিতে গঠিত সরকারের কাছে ভালো কিছু আশা করাই বৃথা। কে না জানে, স্বচ্ছতাই উন্নয়ন এবং বৈষম্য হ্রাসের চাবিকাঠি।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ