Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

প্রাকৃতিক ঢাল রক্ষা করা চাই

প্রতি বর্গ কিমিতে জনঘনত্বের জাতীয় হার ৪১৫। সংখ্যাটি পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে আড়াইগুণ বেশি—১১০৬! নীতি আয়োগের রিপোর্ট অনুসারে, জনঘনত্বের বিচারে পশ্চিমবঙ্গের স্থান বিহারের পরেই।

প্রাকৃতিক ঢাল রক্ষা করা চাই
  • ৩০ মে, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

প্রতি বর্গ কিমিতে জনঘনত্বের জাতীয় হার ৪১৫। সংখ্যাটি পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে আড়াইগুণ বেশি—১১০৬! নীতি আয়োগের রিপোর্ট অনুসারে, জনঘনত্বের বিচারে পশ্চিমবঙ্গের স্থান বিহারের পরেই। পূর্ব সীমান্তবর্তী এই রাজ্য বস্তুত জনবিস্ফোরণের শিকার হয়ে পড়েছে। প্রথম কারণ দেশভাগ এবং দ্বিতীয় কারণ নিকটবর্তী রাজ্যগুলি নানা ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে। ফলে বিভিন্ন রাজ্যের মানুষ জীবিকার প্রয়োজনে এবং ভাগ্যান্বেষণে কলকাতাসহ বাংলার নানা অঞ্চলে চলে আসেন। তাই এরাজ্যের প্রতিটি অঞ্চল বাসযোগ্য রাখা দরকার। প্রাকৃতিক কারণে দুই ২৪ পরগনায় সুন্দরবন লাগোয়া অঞ্চলগুলি অনেকাংশে বাসযোগ্য নয়। সেখানে মাটি ও জলে লোনাভাব মাত্রাতিরিক্ত। এছাড়া রয়েছে ঘূর্ণিঝড় এবং প্রবল বর্ষণজনিত বিপর্যয়ের সমস্যা। ম্যানগ্রোভ অরণ্য সুন্দরবনের ঢাল। এই বিরলপ্রায় প্রকৃতির জন্য জায়গাটি ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের স্বীকৃতি পেয়েছে। তাই এই অঞ্চলকে সবরকমে রক্ষা করার দায় আমাদের সকলের। এই দায় সবার আগে এবং সর্বতোভাবে স্বীকার করেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। আর এই সূত্রেই তারা নিয়েছে সুন্দরবন নিম্ন বদ্বীপ প্রকল্প। এজন্য খরচ ধরা হয়েছে ৪১০০ কোটি টাকা। উদ্দেশ্য কলকাতাসহ বিস্তীর্ণ এলাকাকে দুর্যোগের হাত থেকে রক্ষা করা। সংগত কারণেই গোটা প্রকল্পে সবুজ সঙ্কেত দিয়েছে বিশ্ব ব্যাঙ্ক। সাড়া মিলেছে নেদারল্যান্ডসের বিশেষজ্ঞদের তরফেও। মুখ্যসচিব মারফত এই প্রকল্পের খুঁটিনাটি বিষয়গুলি পাঠিয়েও দেওয়া হয়েছে নয়াদিল্লিতে। তারপর কেটে গিয়েছে চারমাস। কিন্তু ফাইল আটকে রয়েছে মোদি সরকারের কাছে। নয়াদিল্লির একটি ছাড়পত্র মিললেই বিশ্ব ব্যাঙ্কের সহায়তায় এই বৃহৎ প্রকল্পের কাজ শুরুর দিকে এগনো সম্ভব। কিন্তু একাধিকবার যোগাযোগ করা সত্ত্বেও অনুমোদন দিতে গড়িমসি করছে কেন্দ্র। নানা সময়ে নানা অছিলা করছে তারা। 

Advertisement

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজ্যে একের পর এক জনমুখী প্রকল্প রূপায়ণে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে মোদি সরকার স্বয়ং। এই ব্যাপারে সবচেয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে মনরেগা (গরিব মানুষের জন্য বছরে ১০০ দিনের কাজের গ্যারান্টি প্রকল্প) এবং আবাস যোজনা (গরিব মানুষের জন্য বিনামূল্যে পাকাবাড়ি নির্মাণ) নিয়ে। তিন বছর যাবৎ ওই দুই প্রকল্পে বাংলার মানুষ বেনজির বঞ্চনার শিকার। এজন্য হাজার হাজার শ্রমদিবস সৃষ্টির উদ্যোগ বানচাল হয়ে গিয়েছে। শীত গ্রীষ্ম বর্ষায় গৃহহীন মানুষের কী ভয়ানক কষ্ট হয়, তা সবাই জানে। তাদের ওই কষ্ট দূর করার জন্যই আবাস যোজনা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই প্রকল্পেও কেন্দ্র বাংলার মানুষের প্রতি সদয় নয়। দুর্যোগ মোকাবিলায় রাজ্যের প্রস্তাবিত প্রকল্পেও কেন্দ্রীয় বঞ্চনার সেই ছায়া ঘন হয়ে এসেছে! গোটা বিষয়টিতে ক্ষুব্ধ রাজ্য সরকার। রাজ্যের বক্তব্য, এক্ষেত্রে সামান্য একটি অনুমোদন দেওয়া ছাড়া কেন্দ্রের আর কোনও ভূমিকা নেই। বিশ্ব ব্যাঙ্কের প্রকল্পে যেকোনও রাজ্যের জন্য কেন্দ্রের ডিপার্টমেন্ট অব এক্সপেন্ডিচারের থেকে স্রেফ ছাড়পত্র নিতে হয়। বাদবাকি সমস্ত দায়িত্বই রাজ্যের। সেখানেও বাংলার সঙ্গে মোদি সরকারের বঞ্চনার রাজনীতি অব্যাহত। তবে তৃণমূল সরকার এখনই আশা ছেড়ে দেবে না, শেষ দেখেই ছাড়বে তারা। এই ব্যাপারে ২৯ জানুয়ারি গোসাবায় একটি বৈঠক হয়। রাজ্যের সেচমন্ত্রী এবং বিভাগীয় সচিবের সঙ্গে ওই বৈঠকে ছিল বিশ্ব ব্যাঙ্ক এবং নেদারল্যান্ডস সরকারের একটি প্রতিনিধি দল। আর ছিলেন সেচসহ রাজ্যের দশটি দপ্তরের অফিসাররা। তাঁরা সবাই মিলে এলাকা পরিদর্শনও করেন। এই প্রকল্পের ব্যাপারে কেন্দ্রের ছাড়পত্র চাওয়া হয় পরের মাসে। সাধারণত প্রাইমারি প্রজেক্ট রিপোর্টসহ আবেদন করলেই ছাড়পত্র মেলে। কিন্তু এক্ষেত্রে বাধাদানের সূত্রপাত দেখছে রাজ্য প্রশাসন, কেননা তাদের কাছে খামোকা ডিপিআর দাবি করা হয়েছে। রাজ্যের তরফে নিয়মমাফিক যোগাযোগ করেও এখনও ছাড়পত্র মেলেনি, টালবাহানাই সার!
প্রকল্পটি একাধিক করেণে রাজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুন্দরবনের নিম্ন বদ্বীপ অঞ্চলের মাটির লোনাভাব কাটিয়ে  প্রাকৃতিক ভারসাম্য বৃদ্ধি করতে এই প্রকল্প বড় হাতিয়ার হতে পারে। এই উপলক্ষ্যে মজে বুজে যাওয়া স্থানীয় নদী ও খালগুলির পুনরুজ্জীবন ঘটনো জরুরি। গড়ে তোলা হবে পরিবেশবান্ধব পরিকাঠামো। প্রকল্পটি রূপায়ণের জন্য দুই ২৪ পরগনার ১১টি ব্লককে বেছে নেওয়া হয়েছে। বিশেষভাবে গুরুত্ব পাবে জনবসতিযুক্ত ৩৯টি দ্বীপ। নামখানা, মৌসুনি, সাগর, গোসাবা, পাথরপ্রতিমা, চুনাখালি, সোনাখালি, বাসন্তী, কুমিরমারি, মৈপীঠ, হিঙ্গলগঞ্জ, হাসনাবাদ, ঘোড়ামারাসহ অনেকগুলি এলাকায় লোনাজলের সমস্যা মিটবে। এর দ্বারা শুধু সুন্দরবন এলাকা উপকৃত হবে না, পরোক্ষে উপকৃত হবে কলকাতাও। মহানগরকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে সুন্দরবনই বাঁচিয়ে রেখেছে। এই প্রাকৃতিক ঢাল কোনোভাবেই দুর্বল হতে দেওয়া যায় না। সুন্দরবন নিম্ন বদ্বীপ প্রকল্প রূপায়ণে কেন্দ্রের উচিত রাজ্যের পাশে দাঁড়ানো। কেননা, এ কোনও রাজনীতির বিষয় নয়—মানুষকে বাঁচানোর তাগিদ এবং বাংলার প্রাণভোমরা কলকাতাকেও রক্ষা করার আন্তরিক প্রয়াস। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ