Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বদলা চাই, কিন্তু সন্ত্রাস কি শেষ হবে?

বদলা চাই, কিন্তু সন্ত্রাস কি শেষ হবে?
  • ২৭ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

হিমাংশু সিংহ: মুখে হুঙ্কার নয়, এবার করে দেখানোর চ্যালেঞ্জ। দেশবাসী ফুঁসছে ২৬ জন তরতাজা পর্যটক হত্যার বদলার দাবিতে। একটাই অপেক্ষা, ‘জঙ্গি’ পাকিস্তানের কোমর ভাঙবে কবে? পহেলগাঁওতে যেভাবে নিরীহ হিন্দুদের পরিচয় জেনে বেছে বেছে নারকীয়ভাবে হত্যা করেছে পাকিস্তানের জঙ্গিরা তাতে ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গিয়েছে। ২৬ পর্যটকের নিথর লাশের সঙ্গেই শেষ হয়েছে ২৬ কোটি স্বপ্ন। যার অভিঘাত আমাদের ১৪২ কোটি জনগণের আত্মাকেই রক্তাক্ত করে চলেছে গত ১২০ ঘণ্টা। সীমান্তপারের সন্ত্রাস এদেশে নতুন নয়। স্বাধীনতার পর ষাটের দশক থেকে শুরু করে একাত্তরের যুদ্ধ, বাজপেয়ি জমানার কার্গিল লড়াই, উরির সার্জিক্যাল স্ট্রাইক, পুলওয়ামার হামলার পাল্টা বালাকোট—একের পর এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সাক্ষী আমরা। এর বাইরে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানীতে ২৬/১১’র সেই হাড়হিম করা আক্রমণ এবং ১৯৯৩ সালের মুম্বই বিস্ফোরণের স্মৃতি এখনও টাটকা। প্রতিবারই  বলা হয়, সন্ত্রাসীদের নিকেশ করেই ছাড়ব। সীমান্তপারের মদত এবার বন্ধ হবে। অতি আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের সম্ভার প্রদর্শন করে সম্ভ্রম আদায়ের চেষ্টা চলতে থাকে। দিন যায়, ফিকে হয় স্মৃতি। রাতদিনের আবর্তে আবার ফিরে আসে পাকিস্তানি জঙ্গি হামলা। এ ঘৃণার যেমন বিনাশ নেই, তেমনি যুদ্ধ হুঙ্কারেরও! সরকার না চাইলে দাঙ্গা হয় না, আমেরিকা না চাইলে যুদ্ধ হয় না। সেই চক্রব্যূহেই বন্দি আমরা। দশকের পর দশক।

Advertisement

কাশ্মীরের অর্থনীতি মূলত পর্যটক নির্ভর। আতঙ্ক কাটিয়ে আবার মধুচন্দ্রিমায় যেতে শুরু করেছিলেন সদ্য বিবাহিতরা। নয়া স্বপ্নের মৌতাতে জমে উঠছিল ঘোড়ার গাড়ি, শিকারার ব্যবসা। হোটেলে ঘর নেই। দুটো পয়সার মুখ দেখছিল স্থানীয় যুবকরা। কাশ্মীরি আওয়াম। কী হতো যদি বেহালার বিতান আমেরিকা থেকে ফিরে পরিবার নিয়ে কাশ্মীর বেড়াতে না যেতেন? ভূস্বর্গে সব হারিয়ে তাঁর বৃদ্ধ বাবা-মা, স্ত্রী-সন্তানকে আজ এভাবে অসহায়ের মতো বুকফাটা কান্নায় ভেসে যেতে হতো না। কয়েক সপ্তাহ বাড়িতে কাটিয়েই তিনি অনায়াসে ফিরতে পারতেন মার্কিন মুলুকে। অনেক সম্ভাবনা, কেরিয়ার গ্রাফে আরও অনেক উন্নতি অপেক্ষা করছিল তাঁর জন্য। সখেরবাজারের সমীর আর শর্বরীও সেদিন দুপুরে অভিশপ্ত বৈসরণ ভ্যালিতে যদি পা না রাখতেন গুহবাড়ির ছবিটাও মুহূর্তে অন্ধকারে বদলে যেত না। পাহাড়ের কোলে ক্লান্ত অপরাহ্ণে সেদিন পুনের ব্যবসায়ী সন্তোষ জাগদালেকে উগ্রপন্থীদের হুকুম, ‘বাইরে আয়’। অতঃপর তাঁবুর বাইরে টেনে বের করেই নারকীয় হত্যাকাণ্ড। বেছে বেছে পুরুষদের মাথাই টার্গেট। সন্তোষকে জিজ্ঞাসা করা হয়, হিন্দু না মুসলমান। পড়তে বলা হয় কলমাও। না পারায় মাথায়, কানে ও পিঠে পরপর গুলি। সন্তোষের মেয়ের কথায় চোখের সামনেই গুলি করে মেরে ফেলা হল বাবাকে। ‘ওরা আমার কাকাকেও মাথায় গুলি করে’—কাঁদতে কাঁদতে বলেন ২৬ বছরের আশাবরী। প্রায় ঘণ্টাখানেক পর পুলিস ও নিরাপত্তা বাহিনী পৌঁছয় ঘটনাস্থলে। অভিশপ্ত বৈসরণ তখন বুলেটের ঝাঁঝালো গন্ধে ম ম করা নিঃশব্দ রক্ত উপত্যকা। ২৬টা লাশের সঙ্গেই স্বপ্ন শেষের বেদনায় মুহ্যমান ২৬ জন সঙ্গী! কোনওক্রমে স্থানীয় বাসিন্দা ও নিরাপত্তা বাহিনীর সহায়তায় মা-মেয়েকে উদ্ধার করা হয়। সহজে কি আর কেউ সেখানে যাবে অজানা ঘাতকের হাতে প্রিয়জনের মর্মান্তিক মৃত্যু প্রত্যক্ষ করতে? তবে এমন মর্মন্তুদ ঘটনার মাঝেও পর্যটকদের বাঁচাতে ঘোড়াচালক আদিল হুসেন শেখের সাহসী আত্মত্যাগ প্রমাণ করেছে ধর্মের নামে দেশটা এখনও নরক হয়ে যায়নি!
প্রায় ৬ বছর আগের কথা। উনিশ সালের ৫ আগস্ট সেনায় মুড়ে জনজীবন স্তব্ধ করে বিরোধীদের জেলে পুরে, মাসের পর মাস নজরবন্দি করে রেখে কাশ্মীরকে ভারতীয়দের ভ্রমণযোগ্য করে তোলার অঙ্গীকার করেছিল মোদি সরকার। নেহরুর কংগ্রেসের ব্যর্থতা ঢেকে হিংসাদীর্ণ ভূস্বর্গের নয়া যাত্রাশুরুর শপথে উচ্চকিত সাফল্যের বিপণন ও আস্ফালন দুই ছিল। কিন্তু তাঁদের মনে রাখা উচিত ছিল, এক দশক আগের নোট বাতিলের পরও যেমন কালো টাকা দেশ থেকে শেষ হয়নি। বছরে দু’কোটি চাকরির খোয়াব বিপণনের পরও যেমন বেকার সংখ্যা ঊর্ধ্বগামী, গালভরা জিএসটি কর কাঠামোকে সরল করার পরিবর্তে যেমন গোটা ব্যবস্থাকে আরও জটিল করেছে, তেমনি ৩৭০ ধারা বিলোপের পর লম্বা চওড়া আশ্বাস যাই দেওয়া হোক উপত্যকা আছে সেই জঙ্গি তিমিরেই। শুধু একটু বাঁধন আলগা হওয়ার অপেক্ষায় দিন গুনছিল সবাই। সবাই জানে, বছরের পর বছর কোনও একটি জায়গাকে সেনা দিয়ে মুড়ে ‘জঙ্গি প্রুফ’ রাখা যায় না। একসময় গা-ছাড়া ভাব আসবেই। সেই ফাঁকটুকু পেতেই চলল সন্ত্রাসবাদীদের গুলি। কারণ ৩৭০, ৩৫এ এসবই কথার কথা। আসলে হিংসা আর বিদ্বেষ শেষ হওয়ার নয়! বিচক্ষণ ইংরেজ তা জানত বলেই শিক্ষিত অশিক্ষিত, যোগ্য অযোগ্য নয়, স্রেফ ধর্মের ভিত্তিতে দেশটাকে ভাগ করে দিয়ে গিয়েছে। পণ্ডিত বিদ্বজ্জন যাই বলুন, বিয়ের পাঁচদিনের তফাতে স্বামী হারানো হিমাংশী যখন প্রিয়জনের কফিনের উপর বারবার আছড়ে পড়ছেন তখন কোনও ভারতীয়ের মাথা স্থির থাকতে পারে? ভাবতে পারেন, একমাত্র ‘কলমা’ পড়তে পেরেছেন বলেই রক্ষা পেয়ে গিয়েছেন অসমের শিক্ষিত হিন্দু অধ্যাপক দেবাশিস ভট্টাচার্য। এই ঘটনাই প্রমাণ করে, ধর্মকে রাষ্ট্র চালনার মূল মন্ত্র করলে বিদ্বেষ বাড়তে বাধ্য। সেই আগুন থেকে আমার আপনার কারও রক্ষা নেই। নিঃসন্দেহে কাশ্মীরের আইন শৃঙ্খলার দায়িত্ব কেন্দ্রের হাতে ন্যস্ত হওয়ার পর সবচেয়ে বড় হামলা, যা অভিঘাতে ছাড়িয়ে গিয়েছে পুলওয়ামা কাণ্ডকেও। দেশবাসীর দাবি, উরি, বালাকোটের চেয়েও বড় প্রত্যাঘাত চাই। যাতে শত্রুরা সারা জীবন তা মনে রাখে। কিন্তু কোন পথে?
সেই পথ খুঁজে বার করাই ১২ বছর টানা দেশ শাসনের পর মোদিজির সামনে অগ্নিপরীক্ষা। দেশের মানুষ যোগ্য জবাব চান। প্রধানমন্ত্রীও একমত। বিহারের মধুবনীতে দাঁড়িয়ে তিনি বলেছেন, ‘এমন মারব, ওরা ভাবতেও পারবে না’। দেশবাসীও তাই চায়। রাফাল, সুখোই, যুদ্ধ ট্যাঙ্ক মহড়া দিতে শুরু করেছে। কিন্তু পাল্টা আঘাত কবে, শনিবার সকাল পর্যন্ত তা স্পষ্ট নয়। তবে তৎপর হয়ে উঠেছেন নরেন্দ্র মোদি ও তাঁর সরকার। প্রধানমন্ত্রীর সৌদি সফর অসমাপ্ত রেখে ফিরে আসা, অমিত শাহের উপত্যকায় ছুটে যাওয়া, বিশ্বজুড়ে নিন্দাবার্তা এবং উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বসার মধ্যেই চাপ যেমন বাড়ছে তেমনি এমনও বলা হচ্ছে, হুঙ্কারের মধ্যেই কি মিলিয়ে যাবে এই নারকীয় গণহত্যা! ট্রাম্প-পুতিনের ক্ষোভ, ইজরায়েলের সমর্থন সব বৃথা যাবে। নাকি আবার মোদি-যোগী-শাহ ত্রিশক্তির সেই পুরনো স্লোগান ‘ইয়ে ভারত ঘর মে ঘুসেঙ্গে ভি, অর মারেঙ্গে ভি’ আওয়াজেরই পুনরাবৃত্তি হতে চলেছে? 
আসলে সময় বড় বলবান। একসপ্তাহ একমাস একবছর একদশক ... পেরিয়ে যাবে। আমরাও ২২ এপ্রিলের ঘটনা ভুলে আবার ব্যস্ত জীবনে কখন হারিয়ে যাব। খবরেরও মুখ বদল হবে। কিন্তু যে দিগন্তব্যাপী ঘৃণা আর বিদ্বেষ বুকে নিয়ে এদেশে হিন্দু মুসলমানের সহাবস্থান তার পরিণতি কী? একটা দেশের মধ্যেই দু’টো দেশ, একটা হিন্দু রাষ্ট্র আর একটা মুসলিম। সেই ব্যবধান ঘোচাবে কার সাধ্য? এটা সবারই জানা, বিদ্বেষ, অস্ত্রের ঝনঝনানি আরও বড় ঘৃণার জন্ম দেয়। ব্রিটিশরাজের ‘টু নেশন’ থিয়োরির অভিঘাত স্বাধীনতার শতবর্ষ পেরিয়েও শেষ হবে বলে মনে হয় না। এবং সেজন্য শুধু জিন্নাকে দায়ী করলেই চলবে? সমান দায় নিতে হবে সাভারকর ও কট্টর হিন্দুত্ববাদীদেরও। কারণ কোনও তালিই এক হাতে বাজে না। টানা তিন বছর যুদ্ধের পরও শক্তিধর রাশিয়া সোচ্চারে বলতে পারছে না ইউক্রেন পরাজিত। আসলে আধুনিক যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতি বাড়বে, মানুষ মরবে, অর্থনীতি ধসে যাবে। কিন্তু জয় পরাজয়ের নিষ্পত্তি শুধু কঠিন নয়, কার্যত দূরঅস্ত!
স্বাধীনতার শতবর্ষে আমরা হয়তো বেঁচে থাকব না কিন্তু দু’দশক বাদেও বৈসরণে মধুচন্দ্রিমায় যাওয়া কোনও তরুণ তরুণীর স্বপ্ন যে এভাবে ধ্বংস হয়ে যাবে না, তার গ্যারান্টি কে দেবে? সেদিন আবার প্রশ্ন উঠবে, অকল্পনীয় শাস্তিই কি উত্তর না অন্যকিছু! জাতের নামে বজ্জাতির শেষ নেই। এসব শুনতে যত ভালো, লিখতে যত তৃপ্তি, বাস্তব কিন্তু ততটা নয়। সমাজের ডিএনএ’তে যদি ঘৃণা বাস করে তাহলে সুগন্ধী শতফুল, কবিতার দৃপ্ত উচ্চারণও পোকায় খেয়ে যায়! রক্তপাতের পরও শান্ত থাকার দায় কি শুধু হিন্দুদের? না তাঁদের নিয়ে রাজনীতি করা ভোটযুদ্ধের মহান কারবারিদের। বিদ্বেষ কমাতে না পারলে, মাইন্ডসেটের পরিবর্তন না-হলে এই পরিস্থিতির বিশেষ পরিবর্তন হবে না। ইতিহাস সাক্ষী, ঘৃণা দিয়ে ঘৃণাকে দমন করতে গেলে তা আরও বড় সঙ্কটেরই জন্ম দেয়। সন্ত্রাস খতম হয় না, বাড়তেই থাকে। শেষে বৈসরণের দিগন্ত বিস্তৃত মৃত্যু উপত্যকাকেই একদিন না আমার দেশ বলে ভ্রম হয়!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ