Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

সময় দিতে হবে আমাদের মুখ্যমন্ত্রীকে

আশ্বাস। প্রতিশ্রুতি। সংকল্প। মাত্র তিনটি শব্দ নয়। বরং বিপুল দায়ভার। বাংলার জনগণের প্রতি। এই পাহাড়প্রমাণ চাপ মাথায় নিয়েই মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসলেন শুভেন্দু অধিকারী।

সময় দিতে হবে আমাদের মুখ্যমন্ত্রীকে
  • ১২ মে, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

শান্তনু দত্তগুপ্ত: আশ্বাস। প্রতিশ্রুতি। সংকল্প। মাত্র তিনটি শব্দ নয়। বরং বিপুল দায়ভার। বাংলার জনগণের প্রতি। এই পাহাড়প্রমাণ চাপ মাথায় নিয়েই মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসলেন শুভেন্দু অধিকারী। ২০২৬’এর বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী বিজেপির মুখ। এটাই আজ শেষ কথা। এটাই একমাত্র সত্য। আর তাই এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের আপামর জনসাধারণ তাকিয়ে রয়েছে তাঁর দিকেই। ভয় নয়, ভরসায়। কারণ, বাংলার ভোটাররা তাঁকেই ভোট দিয়ে সরকারে এনেছেন। আশা করেছেন, রাজ্যের সত্যিকারের বিকাশ করবেন তিনি। পালন করবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির গ্যারান্টি। এসআইআর, আধাসেনার বুটের শব্দ, চূড়ান্ত টেনশনে নির্বাচন, তার থেকেও বেশি উত্তেজনা ও অভিযোগের বোঝা কাঁধে গণনা... এই সবই এখন অতীত। সবচেয়ে বড়ো কথা, সাধারণ মানুষের এই সবে কিছুই আসে যায় না। তারা নতুন সরকার পেয়ে গিয়েছে। পরিবর্তন হয়েছে। এখন যাবতীয় আশা এবং আস্থা তাদের শুভেন্দু অধিকারীকে ঘিরে। সদ্য মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি। সরকার গঠন হয়েছে। এবার হবে মন্ত্রিসভা। তারা কাজ শুরু করবে। সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে বাংলার মানুষ। আজকের পরিস্থিতির সঙ্গে একটি শিশুর জন্ম নেওয়া ছাড়া অন্য কিছুর তুলনা করা যায় না। তাকে প্রশাসনের জমি চিনতে হবে। আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হবে। সমালোচনা, নিন্দা বা যে কোনো পারসেপশন তৈরির আগে এইটুকু সময় তার প্রাপ্য। শুভেন্দু অধিকারীর প্রাপ্য। অথচ, আড়াআড়ি দু’ভাগ হয়ে এখন বঙ্গসমাজ পরস্পরকে আক্রমণ করে চলেছে। রেলের জমির লাইসেন্সবিহীন দোকান ভাঙা পড়লে একপক্ষ বলছে, ‘আরও নিয়ে এসো এদের ক্ষমতায়!’ অন্যপক্ষ বলছে, ‘এটাই হওয়ার দরকার ছিল।’ কিন্তু আসল কথা হল, আজকের দিনে দাঁড়িয়ে কোনোটাই কাঙ্ক্ষিত নয়। পালাবদলের পর শূন্য থেকে শুরু করেছি আমরা। এই প্রেক্ষাপটে রাজনীতি থাকবে, আদর্শগত বিভেদও থাকবে। 

Advertisement

কিন্তু রাজ্যের উন্নয়ন এবং আইন-শৃঙ্খলার স্বার্থে 
সেই সব কিছুই এখন পাঠিয়ে দিতে হবে পিছনের সারিতে। সেটা তিনি করছেনও। প্রথম বৈঠকে শুভেন্দুবাবু সাফ বার্তা দিয়েছেন, কোনো জনকল্যাণমূলক প্রকল্প বন্ধ হবে না। কর্মসংস্থানের সুযোগ, কেন্দ্রীয় প্রকল্প নিশ্চিত করা, সরকারি চাকরিতে আবেদনের সময়সীমা পাঁচ বছর বাড়ানো... বহু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। আশা জাগিয়েছেন বাংলার সব শ্রেণির মানুষের মনে। মনে রাখতে হবে, শুভেন্দু অধিকারী এ রাজ্যের প্রত্যেক নাগরিকের মুখ্যমন্ত্রী। যতটা দিলীপ ঘোষের, ততটা ফিরহাদ হাকিমেরও। যে ৪৫ শতাংশ বঙ্গবাসী বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন, যতটা তাঁদের... ততটাই তৃণমূলকে ভোট দেওয়া ৪০ শতাংশ ভোটারের। 
একটা বিষয় ঠিক, আজকের গেরুয়া আবহে পুরভোট হলেই এই ৪০ শতাংশ ভোট অর্ধেক হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। কিন্তু সেটা অদূর হলেও ভবিষ্যতের অঙ্ক। আজকের হিসাবে দুই প্রধান দলের প্রাপ্ত ভোটের মধ্যে ফারাক মাত্র ৩২ লক্ষের। অর্থাৎ প্রতি ১ শতাংশ ভোট ফারাক গড়ে দিয়েছে গড়ে ২৫টি আসনে। যে ১০০টি আসন নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভোটার বাদের ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন, তার ৮০টিরও বেশি কেন্দ্রে জয় পেয়েছে বিজেপি। নির্বাচন কমিশনকে কাঠগড়ায় তুলে এমন অনেক অঙ্ক চলছে চতুর্দিকে। এসআইআরে বৈধ কত ভোটার বাদ গিয়েছে? কত জীবিত ভোটারকে মৃত বলে দেখানো হয়েছে? ট্রাইব্যুনালে আবেদন জানিয়ে যে ৩৪ লক্ষ ভোটার বসে রয়েছেন, তাঁরা ভোট দিতে পারলে ফল কী হত? যদিও এই মুহূর্তে এই সবের কোনো মানে নেই। সবটাই ধীরে ধীরে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাচ্ছে। সোজা কথায়, এমন কোনো সমীকরণই নতুন সরকারের কর্মকাণ্ডে প্রভাব ফেলবে না। আমাদের নতুন মুখ্যমন্ত্রীরও এসব ঝেড়ে ফেলেই তাঁর প্রশাসনিক বিকাশযজ্ঞে নামা উচিত। তবে হ্যাঁ, এর মধ্যেও বাদ যাওয়া এবং অধিকার ফিরে পাওয়ার আশায় বসে থাকা ভোটারদের কথা তাঁকে ভাবতে হবে। কী অবস্থায় রয়েছে ট্রাইব্যুনাল? কাজ কতটা এগচ্ছে? কতদিনের মধ্যে বৈধরা ভোটাধিকার ফিরে পাচ্ছেন কিংবা অবৈধ ভোটাররা বাদ যাচ্ছেন, সেটা দেখাটা শুভেন্দুবাবুর অন্যতম ‘কাজে’র কর্মসূচির মধ্যেই চলে এসেছে। কারণ, এতদিন নির্বাচন কমিশনের হয়ে যাঁরা এই দিকগুলো দেখছিলেন, তাঁরা তো আর সেই কাজে মন দিতে পারবেন না! সুব্রত গুপ্ত মহাশয় এসআইআর পর্বে তাঁর অবদানের জন্য ইতিমধ্যেই মুখ্যমন্ত্রীর পরামর্শদাতা হিসাবে নিযুক্ত হয়ে গিয়েছেন। মুখ্যসচিব পদের জন্য জোরালোভাবে শোনা যাচ্ছে মুখ্য নির্বাচনি আধিকারিকের পদ সামলানো মনোজ আগরওয়ালের নাম। লোকজন এই পদ পরিবর্তনকে অবশ্য ‘প্রাইজ পোস্টিং’ বলে হাঁকডাক করছে। সেটাও থেমে যাবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অপ্রাসঙ্গিক হবে। থেকে যাবে শুধু শুভেন্দু অধিকারীর নাম, আর কাজ। তিনিই এখন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। এই পদে শপথ নেওয়ার পর থেকেই প্রতি মুহূর্তে তিনি প্রশংসনীয়ভাবে কথায়-বার্তায় সংযত। আগ্রাসন ঝেড়ে ফেলেছেন। আচরণ মার্জিত। শুভেন্দুবাবু প্রতি পদে বুঝিয়ে দিচ্ছেন, তিনি লম্বা রেসে দৌড়ানোর জন্য প্রস্তুত। তাঁর উপর ভরসা করা যায়। তিনি কথা রাখবেন। দল এবং প্রশাসন—দুয়ের দিকেই সমানভাবে মন দেবেন। কারণ, পালাবদল হলে দলবদলেরও একটা প্রবণতা থাকে। এই নিয়ম চিরকালীন। এবং অলিখিত। বিশেষত পূর্বতন শাসক গোষ্ঠীর নীচুতলা সবার আগে নতুন শাসকের রং মেখে গুরুত্ব, ক্ষমতা এবং অস্তিত্ব বজায় রাখতে চায়। অটো, টোটো, সাধারণ দোকানিরা বেঁচে থাকার তাগিদে। আর বিক্ষুব্ধরা বদলা নেওয়ার ধান্দায়। কিছুটা কামানোরও। ফল প্রকাশের দুপুরে যে কর্মী তৃণমূলের পতাকা নিয়ে গণনাকেন্দ্রের দিকে যাচ্ছিল, বিকেলের মধ্যে তার রং গেরুয়া হয়ে গিয়েছে। কোথাও সিপিএম, কোথাও বা কংগ্রেসের ধ্বজাধারীরাও সেদিন মুহূর্তে দল এবং রং বদলেছে। আজ থেকে ১৫ বছর আগেও হয়েছিল। এমন প্রবণতা দেখা গিয়েছিল বাম জমানাতেও। রাজনীতির ভাষায় এদের বলা হয় বেনোজল। শুভেন্দুবাবুকে নিশ্চিত করতে হবে, এমন বেনোজলে বিজেপি যেন ভরে না যায়। তাহলে তা শুধু শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের স্বপ্ন নয়, বাংলার ভবিষ্যতের জন্যও দগদগে ঘা তৈরি করবে। এই বেনোজল ছেঁকে ফেলার কাজে তাঁকেই সাহায্য করতে হবে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যকে। কারণ, প্রশাসন তাঁর হাতে। পুলিশ তাঁর হাতে। সরকার তাঁর হাতে। নিশ্চিত করতে হবে, এতটুকু হিংসাও যেন রাজনীতির নামে এই বাংলায় না ছড়ায়। যে অভিযোগ তাঁরা এতদিন আগের শাসকদের নামে করে এসেছেন, একই নালিশ মানুষ যেন বিজেপির নামে করতে না পারে। এটাই হওয়া উচিত শুভেন্দুবাবুর অঙ্গীকার। দায়িত্ব। কর্তব্যও। তিনি কাজ করলে, পক্ষপাতহীন আচরণ করলে যেমন তাঁর প্রশংসা হবে, না করলে সমালোচনাও হবে। সেটাও নিতে হবে মাথা পেতে। সমালোচক মানেই শত্রু নয়, গণতন্ত্রের ভিত। সমালোচনা সমাজকে, সরকারকে প্রতিদিন মজবুত করে। ভুলত্রুটি শুধরে ধাপে ধাপে এগনোর সুযোগ করে দেয়। তার সঙ্গে দল, রাজনীতি, ধর্ম বা জাতপাতের কোনো সম্পর্ক থাকে না। বাংলার সাধারণ মানুষ আশা করে আছে, শুভেন্দুবাবু এইসব প্রতিবন্ধকতা পার করেই বসেছেন বাংলার মসনদে। তারা জানে, দিল্লিতে বসে আছেন বাংলার সরকারের ‘অভিভাবক’। শুভেন্দুবাবু তাঁর কথা ফেলতে পারবেন না। কিন্তু বোঝাতে পারবেন। কারণ, এই বাংলাকে অন্তর থেকে অমিত শাহ চেনেন না। নরেন্দ্র মোদিও না। এই মাটিকে চেনেন শুভেন্দু অধিকারী। বুকপকেটে থাকে তাঁর স্বামী বিবেকানন্দর একটি ছবি। তাঁর বিশ্বাস। অনুপ্রেরণা। স্বামীজি বলতেন, ‘তখন... কেবল তখনই তুমি প্রকৃত হিন্দুপদবাচ্য হইবে, যখন যে-কোন দেশীয়, যে-কোন ভাষাভাষী ব্যক্তি হিন্দু-নামধারী হইলেই অমনি তোমার পরমাত্মীয় বলিয়া বোধ হইবে।... যে-কোন ব্যক্তির দুঃখকষ্ট তোমার হৃদয় স্পর্শ করিবে আর তুমি নিজ সন্তান বিপদে পড়িলে যেরূপ উদ্বিগ্ন হও, তাহার কষ্টেও সেইরূপ উদ্বিগ্ন হইবে।’ 
এই বাংলার বিশ্বাস, শুভেন্দু অধিকারী স্বামীজিকে ভুলবেন না। মানুষকে ভুলবেন না। বাংলার সংস্কৃতি, একাত্মতাকে ভুলবেন না। শুধু হিন্দু নয়। মানুষ। বাংলার সব শ্রেণির, ধর্মের মানুষ।

সম্পর্কিত সংবাদ