সুদীপ্ত রায়চৌধুরী: মাসকয়েক আগের কথা। দার্জিলিংয়ের এক বৃষ্টিভেজা সকালে মর্নিং ওয়াক সেরে বিখ্যাত চৌরাস্তায় দাঁড়িয়ে কাগজ পড়ছিলেন দাওয়া লেপচা। তাঁর চোখ আটকে ছিল একটা হেডলাইনে—‘বন্যায় বিধ্বস্ত উত্তরকাশীর ধারালি’। হিমালয়ের অপর এক প্রান্তের বিধ্বস্ত হয়ে যাওয়ার খবরটি মন দিয়ে পড়ে চৌরাস্তার চারপাশটা তাকিয়ে দেখছিলেন দাওয়া। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ছোটোবেলার চেনা দার্জিলিং কতটা বদলে গিয়েছে! চা খেতে খেতে পরিচিতদের আড্ডায় বলছিলেন সেকথা। ‘হিমালয়ের অন্য যে কোনও শহরের মতো দার্জিলিংয়েও বহুতল তৈরি করা উচিত নয়। নিয়ম অনুযায়ী, এখানে ১১.৫ মিটারের বেশি উঁচু যে কোনও বহুতলই বেআইনি। সবাই সব জানে। কিন্তু মানছে কে! আমাদের লোভ মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে কংক্রিটের মধ্যে দিয়ে। একদিন আমাদেরও উত্তরাখণ্ডের ধারালি বা যোশীমঠের দশা হবে।’ দার্জিলিং বাঁচাতে আদালতে জনস্বার্থ মামলা দায়েরও করেছিলেন তিনি। জবাবে হুমকি জুটেছে হোটেল ব্যবসায়ীদের একাংশের তরফে।
গত শনি-রবিবারে পাহাড়জুড়ে প্রকৃতির তাণ্ডব আর মৃত্যুমিছিল দেখতে দেখতে ৪৭ বছর বয়সি দাওয়া লেপচার কথাগুলি কানে বাজছিল। শনিবার রাত থেকে প্রবল বর্ষণ, জাতীয় সড়ক সহ বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক ধস, ফুলেফেঁপে ওঠা তিস্তা-তোর্সা-জলঢাকা-রায়ডাকের তোড়ে বানভাসি দশা দার্জিলিং, কালিম্পং, মিরিক, নাগরাকাটা সহ উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি ও ডুয়ার্স অঞ্চলের। কোথাও ধসে, কোথাও জলের তোড়ে ভেঙে গিয়েছে একাধিক সেতু। রাস্তা বিচ্ছিন্ন। হাজার হাজার মানুষ ঘরছাড়া। মৃত অন্তত ২৯ জন। নিখোঁজ বহু। জলের তোড়ে ভেসে গিয়েছে গন্ডার, হরিণ সহ বহু বন্যপ্রাণী। এই পরিস্থিতি দেখে একটা বিষয় স্পষ্ট, জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি ‘উন্নয়নের’ প্রভাবও পড়েছে উত্তরবঙ্গের এই দুর্যোগে-দুর্ভোগে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, দার্জিলিংয়ের মাটি অত্যন্ত ভঙ্গুর। সেখানে অতিরিক্ত রাস্তা, হোটেল, হোমস্টে এবং রিয়েল এস্টেট প্রকল্পের চাপ পাহাড়ের ভারসাম্য ধ্বংস করছে। একইভাবে প্রয়োজনমতো নিয়ম-নীতি বদলে কোথাও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য নদীর গতিপথ আটকে দেওয়া হচ্ছে, কোথাও আবার পাহাড় ভেঙে বা বন কেটে তৈরি হচ্ছে হাইওয়ে-রেলপথ। আর এই সবকিছুই প্রভাব ফেলছে পাহাড়ের ভূ-প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের উপর। বন কাটার ফলে মাটি নরম হচ্ছে। ধস নামছে পাহাড়ে। আর সেই ধসেই ফুলে উঠছে নদী। যার জলের তোড়ে প্লাবিত হচ্ছে সমতলের শহরগুলি। এমন ঘটনা ঘটলেই মানুষ এর নাম দেয় ‘প্রাকৃতিক বিপর্যয়’। কিন্তু আসলে এগুলি প্রকৃতি-সৃষ্ট নয়, ম্যান মেড। স্থানীয় কিছু বাসিন্দা হয়তো এসবের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন, প্রতিবাদ করেন। কিন্তু প্রভাবশালী অংশের ব্যবসায়িক আগ্রহ এবং উন্নয়নের চাপে তাঁদের আওয়াজ চাপা পড়ে যায়।
উত্তরাখণ্ডে সাম্প্রতিক ভূমিধস ও বন্যার ঘটনার নেপথ্যেও রয়েছে এই কারণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃতিরও সহ্যের একটা সীমা আছে। দীর্ঘদিন ধরে যে ভারসাম্য তৈরি হয়েছিল, আমরা উন্নয়নের অজুহাতে তা ভেঙে ফেলেছি। পাহাড়ে অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন ও অবৈজ্ঞানিকভাবে নদীর তলদেশে খননের কারণে ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ছে। সেতু ভেঙে পড়ছে, রাস্তা বিচ্ছিন্ন হচ্ছে, মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। উন্নয়নের নামে ধ্বংসের উৎসব চলছে। আসলে ‘উন্নয়ন’ শব্দটা আমাদের মোহগ্রস্ত করে ফেলেছে। কিন্তু এ কোন উন্নয়ন? উন্নয়নের অর্থ মানে নতুন করে ভাবা। কিন্তু যে উন্নয়ন মানুষের বেঁচে থাকাকেই কঠিন করে তোলে, তা আদতে উন্নয়ন নয়, আত্মহত্যা। পরিস্থিতি এতটাই উদ্বেগজনক যে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত জানিয়েছে, এই ধারা চলতে থাকলে, হিমাচল প্রদেশ একদিন হারিয়ে যেতে পারে! তার পরেও অবশ্য হুঁশ ফেরে না আমাদের।
হুঁশ যে ফেরে না তার হাতেগরম প্রমাণ মিলেছে দুর্গাপুজোর দিনকয়েক আগেই। কলকাতাজুড়ে তখন তুঙ্গে পুজো প্রস্তুতি। অত্যুৎসাহী লোকজন সেজেগুজে বেড়িয়ে পড়েছেন ঠাকুর দর্শনে। কিন্তু মহালয়ার দু’দিন পরে সোমবার রাতের একটানা বৃষ্টিতে ডুবল শহর। ভোররাত থেকেই জল ঢুকে যায় বহু বাড়ি ও ফ্ল্যাটের একতলায়। দক্ষিণ থেকে উত্তর—কলকাতার বিভিন্ন এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ে সেই কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যু হয় ৮ জনের। দুই ২৪ পরগনায় প্রাণ হারান আরও তিনজন। জল ঢুকে বিকল হয়ে যায় গাড়ি-বাইক। মঙ্গলবার দুপুরের মধ্যে উত্তর কলকাতার অধিকাংশ জায়গা থেকে জল নেমে যায়। কিন্তু দক্ষিণের বহু এলাকায় পরের দু’দিনও জমে ছিল জল। সাফাই পর্বে দেখা গিয়েছে, শহরের দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থার পাশাপাশি জমেছে আবর্জনা। শহরের ড্রেনের গতি আটকে দিয়েছে প্লাস্টিক, খাবারের প্যাকেট, অন্যান্য আবর্জনা। সেই সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় কত মানুষের কত কথা, কত রাগ-ক্ষোভ। ‘আমরা কেন পরিবেশ সচেতন নই?’, ‘কেন প্লাস্টিক কমাচ্ছি না?’, ‘শহরের নিকাশি ব্যবস্থায় উন্নতি প্রয়োজন’ বলে হাজার হাজার পোস্ট। সঙ্গে চলল সরকারের মুন্ডুপাত। কেন সবকিছু সাফাই করা হচ্ছে না! অথচ দুর্গাপুজো শুরু হতেই এইসব জ্ঞানগর্ভ কথা আমরা বেমালুম ভুলে গেলাম। ঘুরে ঘুরে ঠাকুর দেখলাম, খাবার খেলাম এবং শহরের যত্রতত্র প্লাস্টিকের বোতল, খাবারের উচ্ছিষ্ট, প্লেট, আইসক্রিমের কাপ ছড়িয়ে দিলাম। দিনকয়েক আগের জমা জলের কথা মনে পরল না। মনে পরল না ‘ভেনিস অফ ইস্ট’, ‘ভাসমান লন্ডন’ মার্কা পোস্ট দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিপ্লব করার কথাও।
আসলে আমরা ভীষণ হুজুগে। আর আমাদের স্মৃতিশক্তিও ততোধিক দুর্বল। তাই ক্যালেন্ডারের তারিখ বদলানোর সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্ট বদলে যায়। যেমন এখন ট্রেন্ডিং ‘#প্রে ফর দার্জিলিং’, ‘#সেভ দ্য হিমালয়াস’, ‘#ক্লাইমেট ক্রাইসিস’-এর মতো একের পর এক হ্যাশট্যাগ। দুর্যোগের সময় এগুলি ভীষণ পরিচিত দৃশ্য। শুধু বদলে যায় হ্যাশট্যাগগুলি। আর নেটিজেনদের একটা বড় অংশই ‘ট্রেন্ডে’ গা ভাসিয়ে চলেন। তাঁরা জানেন, এখন এগুলি খাবে মানুষ। তাই কতশত জ্ঞানগর্ভমূলক বাণী। আবার তাঁরাই কিছুদিন পর ‘মাউন্টেন কলিং’ বলে পোস্ট দিয়ে পাহাড়ে ঘুরতে যান। সেখানে গিয়ে দেদার প্লাস্টিক ছড়ান। নিজেকে ‘কুল’ দেখিয়ে বিয়ারের ক্যান হাতে সেলফি তোলেন এবং শেষ চুমুকটা দেওয়ার পর নদীতে ছুঁড়ে ফেলেন সেই ক্যান। ভুলে যান, তিনিই কিছুদিন আগে ‘#সেভ দ্য হিমালয়াস’ লিখে বিরাট সব পোস্ট করেছিলেন। আসলে সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রেন্ড ফলোয়ারদের জন্য মুহূর্তের ছবি ও লাইকই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের মনে রাখা দরকার, পাহাড় কোনওদিন কাউকে ডাকে না। ডাকেনি। আমরাই জোর করে সেখানে ঢুকে গাছ কেটে হোটেল বানিয়ে, তার রাস্তাঘাট নোংরা প্যাকেটে ভরে দিই। প্রকৃতিকে ভেবে ফেলি নিজের সম্পত্তি। আমার-আপনার জন্য পাহাড় হয়ে ওঠে শান্তিনিকেতন ২.০। আমাদের চাহিদা মেটাতে তৈরি হয় মোমোর স্টল, ম্যাগির দোকান। তৈরি হয় সেলফি জোন। আর সেখানে দাঁড়িয়ে আমরা সেলফি তুলে লিখি, ‘পাহাড়ের বুকে’ বা ‘প্রকৃতির মাঝে’। কিন্তু সত্যি বলতে কী, প্রকৃতি কিন্তু আমাকে-আপনাকে কখনও ডাকেনি। তারপর একদিন ভয়ঙ্কর বৃষ্টি নামে। ভেসে যায় বাড়িঘর। ততক্ষণে আমরা চলে আসি নিরাপদ আশ্রয়ে। ঘরের এসিটা ২৪ ডিগ্রিতে দিয়ে সঙ্গে হালকা করে ফ্যান চালিয়ে কফিতে চুমুক দিতে দিতে লিখি ‘#প্রে ফর হিমাচল’, ‘#প্রে ফর উত্তরাখণ্ড’, ‘#প্রে ফর দার্জিলিং’ বা ‘#প্রে ফর উত্তরবঙ্গ’।
কলকাতা থেকে উত্তরবঙ্গ হোক বা উত্তরাখণ্ড—সর্বত্রই আমরা একই ভুল করছি। তা হল উন্নয়নের নামে প্রকৃতিকে ধ্বংস করা। এই জলবায়ু পরিবর্তন, ভূমিধস, বন্যা—সবই আসলে আমাদের মাত্রাতিরিক্ত লোভ ও স্বার্থপরতার ফল। সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা বিভিন্ন হ্যাশট্যাগ দিয়ে নানান কথা লিখতে পারি, কিন্তু প্রকৃতির রোষ কখনও লাইক, কমেন্ট বা পোস্টে থেমে থাকে না। এসব পোস্ট লিখে আদতে প্রকৃতিকে ভালোবাসার বোধ জন্মায় না। ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামে কিছু লাইক-কমেন্ট আর শেয়ার ছাড়া বাস্তবে আর কিছুই মেলে না। আমরা শুধু বন্ধুমহলে কলার তুলি। বোঝাতে চাই, আরে বাবা, আমিও প্রকৃতিকে ভালোবাসি। আমারও মনখারাপ হলে কুয়াশা হয়, আর ব্যাকুল হলে তিস্তা। শুধু সেই তিস্তা ফুঁসে উঠলে আমরা ওদিকে বেড়াতে যাওয়ার টিকিটটা ক্যানসেল করে ফেলি টুক করে।
পরিবেশ বদলাচ্ছে। অতি দ্রুত। প্রকৃতি চোখে আঙুল দিয়ে আমাদের সেই পরিবর্তনের প্রভাব বুঝিয়ে দিচ্ছে। সতর্ক করছে। এখনও নিজেদের না বদলালে আমরা নিজেরাই বিপন্ন হয়ে পড়ব। প্রকৃতি নয়। কারণ, আমরা অন্ধ হলেও প্রকৃতির প্রলয় বন্ধ থাকবে না। প্রকৃতি স্বমহিমায় থাকবে, যেভাবে ছিল বা আছে। মুছে যাব শুধু আমরা। তবে আমাদের জন্য হ্যাশট্যাগ দিয়ে পোস্ট করার জন্য তখন আর কেউ বেঁচে থাকবে না। এই যা।