নিজস্ব প্রতিনিধি, সিউড়ি: রাত তখন দেড়টা। নাকে অক্সিজেনের নল গোঁজা, তীব্র জ্বরে ছটফট করছে দু’বছরের ফুটফুটে শিশু মাম্পি সরেন। সিউড়ি সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের চিকিৎসকরা হাত তুলে জানিয়ে দিয়েছেন, ‘লোয়ার রেসপিরেটরি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন’, এখানে হবে না, নিয়ে যান বর্ধমান। আর ওই ‘নিয়ে যান’ শব্দটাই কাল হল। সিউড়ি থেকে বোলপুর হয়ে বর্ধমানগামী ৯০ কিলোমিটারের পথে তখন যমদূতের মতো ছুটে চলছে বালি-পাথরের ডাম্পার। যানজটে সাইরেন বাজিয়েও সুবিধা হল না। ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে লড়াই করতে করতে যখন অ্যাম্বুলেন্সটি বর্ধমান মেডিকেল কলেজের দোরগোড়ায় পৌঁছাল, ততক্ষণে সব শেষ। মা-বাবার কোলজুড়ে থাকা মাম্পির নিথর দেহটা তখন কেবলই এক টুকরো হিমশীতল পাথর।
সিউড়ি থেকে রেফারের কারণে এভাবে পথেই প্রাণ হারানোর ঘটনা বীরভূমের জেলা সদরের চেনা অভিশাপ। অবশেষে সেই বঞ্চনার অবসান ঘটতে চলেছে। রাজ্য সরকার এবার বাজেটে সিউড়ি সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালকে পূর্ণাঙ্গ সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে উন্নীত করার ঘোষণা করল। অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্তের ঘোষণার পরই খুশির হাওয়া জেলাজুড়ে। হাসপাতালের বাইরে লাড্ডু বিলি করে উল্লাসে মেতে ওঠেন সাধারণ মানুষ।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ছিল, তৃণমূল জমানায় প্রথমে সিউড়িতে মেডিকেল কলেজ হওয়ার কথা থাকলেও রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কারণে তা রামপুরহাটে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। বীরভূম জেলায় বীরভূম ও রামপুরহাট দু’টি স্বাস্থ্যজেলা থাকলেও বীরভূম স্বাস্থ্যজেলা বরাবরই অবহেলিত ছিল বলে অভিযোগ। সিউড়ি থেকে রামপুরহাট মেডিকেলে রোগী রেফার করা হত না, কারণ সেখানে ব্যর্থ হলে শেষ গন্তব্য হত সেই বর্ধমান বা কলকাতা। তাই প্রাথমিকভাবে রোগীকে রেফার করা হত বর্ধমানেই। রাস্তায় যাতায়াতেই নষ্ট হত ‘গোল্ডেন টাইম’।
এবার বিধানসভার নির্বাচনের আগে পূর্বতন সরকারের পিপিপি মডেলে মেডিকেল কলেজ তৈরির পরিকল্পনার বিরুদ্ধে তীব্র গণ-আন্দোলন ও সই সংগ্রহ গড়ে তোলে বিজেপি। দাবি ছিল, স্বাস্থ্য পরিষেবা ব্যবসার ক্ষেত্র হতে পারে না। এই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন বর্তমান রাজ্যের উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী তথা বিধায়ক জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়। তাঁর অনড় অবস্থানের জেরেই পিপিপি মডেল বাতিল করে সম্পূর্ণ সরকারি মেডিক্যাল কলেজ গড়ার স্বপ্ন পূরণ হল এবার।
এই সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল কেবল স্থানীয় নয়, পার্শ্ববর্তী ঝাড়খণ্ডের বহু মানুষের একমাত্র ভরসা। এটি মেডিকেল কলেজে রূপান্তরিত হলে চিকিৎসা পরিষেবার মান আমূল বদলে যাবে। এতদিন হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ঘাটতি ছিল। জটিল কেসের জন্য সিনিয়র ডাক্তারদের সবসময় পাওয়া যেত না। স্বাস্থ্যকর্তাদের দাবি, এবার সেখানে ২৪ঘণ্টা প্রফেসর, অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর, রেসিডেন্ট ডাক্তার, পিজিটি এবং ইন্টার্নদের বিশাল টিম উপস্থিত থাকবে। ফলে প্রতিটি ওয়ার্ড ও জরুরি বিভাগে সবসময় ভাল পরিষেবা মিলবে।
পাশাপাশি, হাসপাতালের বেডের সংখ্যা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। সংকটজনক রোগীদের জন্য আইসিইউ, সিসিইউ এবং শিশুদের জন্য এনআইসিইউ ও পিআইসিইউর মতো লাইফ-সাপোর্ট পরিকাঠামো তৈরি হবে। আগে উন্নত মানের এমআরআই, সিটি স্ক্যান বা জটিল বায়োপসির জন্য রোগীদের চড়া মূল্যে বেসরকারি ল্যাবে ছুটতে হত, এখন সেই পরীক্ষাগুলো হাসপাতালেই বিনামূল্যে মিলবে। বড় পথ দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে প্রাথমিক চিকিৎসার পর রেফারের দিন শেষ হতে চলেছে। কারণ এখানে গড়ে উঠবে অত্যাধুনিক ‘ট্রমা কেয়ার সেন্টার’। এছাড়াও বহির্বিভাগে প্রতিদিন সমস্ত বড় বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বসবেন। জেলাবাসীর আশা, এই সিদ্ধান্তের ফলে মানুষকে আর কলকাতা বা বর্ধমান রেফারের আতঙ্কে থাকতে হবে না।