পশ্চিমবঙ্গে দু’দফায় (২৩ ও ২৯ এপ্রিল) ভোটের দিন ঘোষণা হয়ে গিয়েছে। প্রায় সব ক’টি রাজনৈতিক দল প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেছে। প্রথম দফার আসনগুলির জন্য প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র দাখিল করতে শুরুও করেছেন। ধীরে ধীরে প্রচারও তুঙ্গে উঠতে শুরু করেছে। কিন্তু প্রতিটি বৈধ ভোটারের নাম চূড়ান্ত তালিকায় থাকা নিশ্চিত করতে যে ট্রাইবুনাল গঠিত হয়েছে— তার ভবিষ্যৎ নিয়ে বড়োসড়ো প্রশ্ন উঠছে। রাজ্যের ২৩টি জেলার জন্য ১৯টি ট্রাইবুনাল তৈরির জন্য প্রশাসনিকভাবে জায়গা ঠিক হলেও তার পরিকাঠামো তৈরি সহ যাবতীয় প্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে চূড়ান্ত অব্যবস্থা চলছে। কথা ছিল, বৃহস্পতিবার থেকে ট্রাইবুনালগুলি কাজ শুরু করে দেবে। কিন্তু শুক্রবার পর্যন্ত যা পরিস্থিতি তাতে কবে সব ট্রাইবুনাল কাজ শুরু করতে পারবে তা নিশ্চিত করে বলতে পারছে না নির্বাচন কমিশনই। কমিশনের এমন ব্যর্থতা, পরিকাঠামো নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারার কারণে ক্ষুব্ধ ট্রাইবুনালের জন্য নির্বাচিত বিচারপতিদের একাংশও। শোনা যাচ্ছে, একজন বিচারপতি নাকি কাজ করতে পারবেন না বলে ইতিমধ্যে নাম প্রত্যাহার করতে চেয়েছেন। ঘটনা যাই হোক, কমিশন অবশ্য আশাবাদী, আগামী সপ্তাহ থেকে কাজ শুরু করবে সব ট্রাইবুনাল। তার আগেই যাবতীয় পরিকাঠামো তৈরির কাজ সম্পন্ন হবে।
এই মুহূর্তে ট্রাইবুনালের কাজ শুরু করা নিয়ে বিস্তর প্রশ্ন থাকলেও গোটা রাজ্য আন্দোলিত হচ্ছে অন্য একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে। ট্রাইবুনালে আবেদনকারী কোনো ব্যক্তি চূড়ান্ত বিচারে ‘যোগ্য’ বা ‘বৈধ’ ভোটার বিবেচিত হলে তিনি কি এই বিধানসভা নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন? সাধারণভাবে, ভোটার তালিকা ‘ফ্রিজ’ হয়ে গেলে তারপর আর কোনো নাম যোগ-বিয়োগ করা যায় না। বাংলায় দু’ দফার ভোটের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন যথাক্রমে ৬ এবং ৯ এপ্রিল। তারপর ভোটার তালিকা ‘ফ্রিজ’ হয়ে যাওয়ার কথা। অন্যদিকে ‘বিবেচনাধীন’ ৬০ লক্ষ ভোটারের ৪৫ শতাংশ (যা ভাবা হচ্ছে) বাদ পড়লে সংখ্যাটা দাঁড়াবে ২৭ লক্ষের কাছাকাছি। অর্থাৎ, এই বাদ পড়া ভোটাররা প্রত্যেকে ট্রাইবুনালে আবেদন করার অধিকারী। ধরা যাক, ট্রাইবুনালে বিচারের পর কেউ ১৪ এপ্রিল, কেউ ২০ এপ্রিল, কেউ ২২ এপ্রিল, কেউ ২৫ এপ্রিল, কেউ ২৭ এপ্রিল ‘যোগ্য’ বা ‘বৈধ’ বলে বিবেচিত হলেন। তাহলে ৬ এবং ৯ এপ্রিল ভোটার তালিকা ‘ফ্রিজ’ হয়ে গেলে এই ‘বৈধ’ ভোটাররা কোন জাদুবলে এবার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন? তবে সুপ্রিম কোর্টের মাননীয় বিচারপতির পর্যবেক্ষণেই সত্য বেরিয়ে আসছে, এবার ভোট দিতে না পারলেও চিরতরে ভোটাধিকার চলে যাবে না। প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে যে এসআইআর শুরুর দিন থেকে নির্বাচন কমিশন বলে এসেছে, একজনও বৈধ ভোটারের নাম বাদ যাবে না। একজনও বৈধ ভোটার ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন না! তার কী হবে? তবে কি অনেকের আশঙ্কাই সত্যি হতে চলেছে?
ক্রোনোলজিটা একবার দেখে নেওয়া যাক। এসআইআর-এ প্রথম দফায় মৃত, স্থানান্তরিত, একাধিক জায়গায় নাম থাকার কারণে ৫৮ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ গেল। তারপর শুনানি পর্বের শেষে আরও ৫ লক্ষের বেশি নাম বাদ। পাশাপাশি তথ্যে অসংগতির কারণে ৬০ লক্ষ নাম বিচারাধীন বলে চিহ্নিত হল। এই পর্বে নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত অমানবিক ভূমিকা ও বৈধ নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ ওঠায় ৬০ লক্ষের ফয়সালার দায়িত্ব বিচারক বা জুডিসিয়াল অফিসারদের হাতে তুলে দেওয়া হয় সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে। আগামী ৭ এপ্রিলের মধ্যে ‘বিচারাধীন’ তালিকা নিষ্পত্তির আশ্বাস দিয়েছিল কমিশন। এই পর্বে বাদ পড়া ‘অযোগ্য’ বা ‘বৈধ নয়’ বিবেচিতরা চূড়ান্ত ফয়সালার জন্য ট্রাইবুনালে আবেদন করতে পারবেন বলে জানিয়েছে সর্বোচ্চ আদালত। সুপ্রিম কোর্টের এই উপর্যুপরি পদক্ষেপ বুঝিয়ে দিচ্ছে, সুষ্ঠুভাবে এসআইআর-এর কাজ সম্পন্ন করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে নির্বাচন কমিশন। ব্যর্থতা এতটাই চরম যে অনেক আগে ঘোষণা হলেও এখনও সময়মতো ট্রাইবুনাল কাজই শুরু করতে পারেনি পরিকাঠামোর অভাবে! ফলে শেষ বিচারে ‘যোগ্য’ প্রমাণিত হলে লক্ষ লক্ষ ভোটার এবার হয়তো ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হতে চলেছেন! তবে সামান্য হলেও আশার কথা এই যে, ৬ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের পরবর্তী শুনানিতে এই নিয়ে নতুন কোনো পথের হয়তো হদিশ দিতে পারেন বিচারপতিরা। কারণ, নির্বাচন কমিশনের সৌজন্যে পশ্চিমবঙ্গের এই মামলা তো ইতিমধ্যেই ‘এক্সট্রাঅর্ডিনারি’-র তকমা পেয়েছে। কমিশনের পরিকল্পনাহীনতা, হঠকারী সিদ্ধান্তে জেরবার ‘বিচারাধীন’ বলে চিহ্নিত মানুষের এখন ভরসা আদালত। আর যাঁদের নাম বাদ পড়েছে সুপ্রিম নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও তার কারণ এখনও জানতে পারেননি তাঁরা। বিচারাধীন তালিকা থেকে ‘ডিলিটেড’ ভোটারদের আবেদন নিষ্পত্তির বিষয়টিও এখন বিশবাঁও জলে। তাই প্রশ্ন উঠেছে, এই কি তাহলে কমিশনের নাগরিক ‘অধিকার’ রক্ষার নমুনা!