Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

যুদ্ধ, তৈলমর্দন এবং ড্যাডি ট্রাম্পের নোবেল

তৈল যে কী পদার্থ, তাহা সংস্কৃত কবিরা কতক বুঝিয়াছিলেন... বাস্তবিকই তৈল সর্বশক্তিমান। ... যে সর্বশক্তিময় তৈল ব্যবহার করিতে জানে, সে সর্বশক্তিমান।

যুদ্ধ, তৈলমর্দন এবং ড্যাডি ট্রাম্পের নোবেল
  • ১৭ জুলাই, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

মৃণালকান্তি দাস: তৈল যে কী পদার্থ, তাহা সংস্কৃত কবিরা কতক বুঝিয়াছিলেন... বাস্তবিকই তৈল সর্বশক্তিমান। ... যে সর্বশক্তিময় তৈল ব্যবহার করিতে জানে, সে সর্বশক্তিমান। তাহার কাছে জগতের সব কাজই সোজা, তাহার চাকরির জন্য ভাবিতে হয় না। উকিলিতে প্রসার করিবার জন্য সময় নষ্ট করিতে হয় না। বিনা কাজে বসিয়া থাকিতে হয় না, কোনও কাজেই শিক্ষানবিশ থাকিতে হয় না। যে তৈল দিতে পারিবে তাহার বিদ্যা না থাকিলেও সে প্রফেসর হইতে পারে, আহাম্মক হইলেও ম্যাজিস্ট্রেট হইতে পারে, সাহস না থাকিলেও সেনাপতি হইতে পারে...। (তৈল: প্রথম প্রকাশ ‘বঙ্গদর্শন’। চৈত্র ১২৮৫)

Advertisement

বাঙালি সাহিত্যিক হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এই অমূল্য সত্য কথাগুলি লিখেছিলেন আজ থেকে একশো বছর আগে। আর এখন বলতে হচ্ছে, সংস্কৃত কবিদের থেকেও এটা ভালো বুঝেছেন ইজরায়েলি জায়নবাদীদের সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিফ মুনির। নয়তো হোয়াইট হাউসে গিয়ে তাঁরা মার্কিন প্রেসিডেন্টের হাতে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন পত্রের কপি তুলে দিয়ে আসবেন কেন? আসলে নোবেল পাওয়ার জন্য ট্রাম্পের মনের উচ্চাকাঙ্ক্ষায় ‘সর্বশক্তিময় তৈল’ ঢেলে এসেছেন মুনির এবং নেতানিয়াহু— দু’জনই!
কে না জানে, দুনিয়ার বিস্ময় ডোনাল্ড ট্রাম্প। জীবনে কী পাননি! তিনবারের স্বামী, পাঁচবার বাবা, কয়েকবার বিলিয়নিয়ার, দু’বারের মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও হাজারো টুইটের কবি। কিন্তু এত প্রাপ্তির মাঝেও রয়ে গিয়েছে এক শূন্যতা। তাঁর ঝুলিতে এখনও নেই নোবেল শান্তি পুরস্কার। ‘হিংসুটে’ নোবেল কমিটির কারণেই তাঁর জীবনে আজও এই অপ্রাপ্তি। বিশ্বশান্তির জন্য ট্রাম্প এমন কী করেননি? স্বঘোষিত শান্তির দূত ট্রাম্পের দাবি মোতাবেক, তিনি কঙ্গো-রুয়ান্ডা যুদ্ধ বন্ধ করেছেন, ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ থামিয়েছেন (যদিও  ভারত বলছে, উনি কে?), সার্বিয়া-কসোভোর শান্তি চুক্তি, মিশর-ইথিওপিয়া জলবণ্টন দ্বন্দ্বের মীমাংসা এবং অবশ্যই আব্রাহাম অ্যাকর্ডস। সর্বশেষ ইরানে ‘বাঙ্কার বাস্টার’ মেরে এনেছেন ‘অভিনব শান্তি’। তবু কেন তাঁকে দেওয়া হবে না ‘সামান্য’ এক নোবেল?
ওবামা পেয়েছেন। ট্রাম্প পাননি। মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে সম্ভবত এই তথ্যই এখন সবচেয়ে বেশি অস্বস্তিকর। আর তাই যত বার নোবেল আর ওবামার প্রসঙ্গ এসেছে, কটাক্ষই ছুড়ে দিয়েছেন ট্রাম্প। সেই সঙ্গে নিজেকে তুলে ধরেছেন যোগ্য হিসেবে। ভারত-পাক সংঘর্ষবিরতির জন্য ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া উচিত বলে জানিয়েছিল পাকিস্তান। নোবেল জয়ের লড়াইয়ে এখন ট্রাম্পের পাশে দাঁড়িয়েছে ইজরায়েলও। প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ‘ড্যাডি’ ট্রাম্পকে বলে এসেছেন ‘আপনিই শান্তির দূত’! গোটা দুনিয়া দেখেছে, এই মনোনয়ন পাওয়ার মাত্র দুই সপ্তাহ আগে ‘ড্যাডি’ ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক ঘাঁটির উপর ৩০ হাজার পাউন্ডের ডজনখানেক বোমা বর্ষণের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
গত মার্চে ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, তিনি ইজরায়েলকে গাজায় লড়াই শেষ করতে যা কিছু দরকার তার জন্য সবকিছু পাঠাবেন। সেই ‘সবকিছুর’ মধ্যে রয়েছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের মারাত্মক অস্ত্র। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এখনও পর্যন্ত গাজার এই ছোট্ট ভূখণ্ডে, প্রায় ৬০ হাজার প্যালেস্তিনীয়কে হত্যা করা হয়েছে। এখনও ধ্বংসস্তূপের নীচে কত মানুষ চাপা পড়ে, তার কোনও হিসেব নেই। ‘ক্ষুধার রাজ্য’ গাজায় দুর্ভিক্ষের কবলে আড়াই কোটি মানুষ। একটাও কুয়ো অবশিষ্ট নেই, এক ফোঁটা পানীয় জলের খোঁজে ধ্বংসস্তূপ হাতড়ে বেড়াচ্ছেন গাজাবাসী। এটাই নাকি ‘ড্যাডি’ ট্রাম্পের ‘অভিনব শান্তি’!
তবে এই ‘ড্যাডি’ শব্দটি প্রথম শোনা গিয়েছিল ন্যাটো সামরিক জোটের প্রধান মার্ক রুটের মুখে। ২৫ জুন হেগে আয়োজিত ন্যাটো সম্মেলনে। ইরানকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়ে ট্রাম্প হাসতে হাসতে বলেছেন, ‘তারা একটা বড় মারামারি করেছে। স্কুলের মাঠে দুই বালকের মতো। তারা প্রাণবাজি রেখে মারামারি করেছে, তখন তাদের থামানো সম্ভব নয়। দুই-এক মিনিট মারামারি করতে দাও, তখন থামানো সহজ হয়।’ মার্কিন প্রেসিডেন্টের এরকম বালখিল্য, উৎকট মন্তব্যে প্রাক্তন ডাচ প্রধানমন্ত্রী রুটে হা-হা করে হাসতে হাসতে বলেছিলেন, ‘ড্যাডিকে মাঝে মাঝে কড়া কথাও বলতে হয়।’ ডাচ সাংবাদিক টিম ব্রিঙ্কফ তাঁর সাম্প্রতিক লেখায় (ইউরোপ’স ড্যাডি ইস্যু, জ্যাকোবিন, ২৭ জুন ২০২৫) লিখেছেন, ‘রুটে নিজেকে ও সেইসঙ্গে গোটা ইউরোপকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের পায়ের তলায় ছুড়ে ফেলে ন্যাটো প্রধান কার্যত দেশে ট্রাম্পের বাজার দর বাড়িয়ে তুললেন।’ রুটে যেন আমেরিকাকে আরও বার্তা দিলেন—‘তুমি আমাদের পরিবার ছেড়ে যতই চলে যেতে চাও না কেন, তুমিই আমাদের প্রিয় ড্যাডি, তোমাকে ঘরে ফেরাতে আমরা যা যা প্রয়োজন সব করব।’ 
রুটের এহেন চাটুকারিতার তিনদিন পর ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এক্স-এ পোস্ট করে বলেছেন, ‘ধুলোয় মিশে যাওয়া থেকে বাঁচতে ড্যাডির কাছে দৌঁড়ে পালানো ছাড়া ইজরায়েলের কোনও উপায় ছিল না।’
নোবেল শান্তি পুরস্কার নিয়ে বারাক ওবামার সঙ্গে ট্রাম্পের দ্বৈরথ প্রায় এক যুগের। ২০০৯ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পরপর নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ওবামা। তখন থেকে নোবেল পুরস্কারের পিছু নিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ২০১৩ সালে মধ্যপ্রাচ্যে ওবামা ড্রোন হামলা করলে তিনি টুইট করেছিলেন, ‘এখন কেন অসলো ওবামার নোবেল কেড়ে নিচ্ছে না!’ ২০১৭ সালে প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর নোবেল পুরস্কারের জন্য তাঁর নাম প্রস্তাব করতে বহুলোককে ধরেছিলেন। শেষ পর্যন্ত জাপানি প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে তাঁর অনুরোধে একটি চিঠি লিখেছিলেন। ট্রাম্প নিজে বেশ গর্ব করেই বলেছিলেন, আবে তাঁর জন্য পাঁচ 
পাতার যে চিঠি নোবেল কমিটির কাছে পাঠিয়েছেন, সেটি তাঁর সবচেয়ে প্রিয় উপহারের একটি। কিন্তু তাঁর ভাগ্যে শিকে ছেঁড়েনি, নোবেল পুরস্কার তাঁর জন্য সোনার হরিণ হয়েই থেকেছে। ২০২০ সালে লাস ভেগাসে এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প এমন কথাও বলেছেন, ‘ওবামা কিছু না করেও পেল, আমি তো সব 
করেছি। আমার নাম যদি ওবামা হতো, ১০ সেকেন্ডে নোবেল পেতাম!’
ড্যাডির এই মানসিক যন্ত্রণা বুঝতে অসুবিধে হয়নি আসিফ মুনির ও নেতানিয়াহুর। আমেরিকা সফরে গিয়ে নৈশভোজের নিমন্ত্রণকেই বেছে নিয়েছিলেন তৈলমর্দনের মাহেন্দ্রক্ষণ! টেবিলের দুই ধারে দুই দেশের ডজন দুয়েক গণ্যমান্য ব্যক্তি, খানা শুরুর আগেই হঠাৎ বেশ নাটুকে কায়দায় পকেট থেকে একখানা চিঠি বের করলেন নেতানিয়াহু। জানালেন তিনি ট্রাম্পকে নোবেল পুরস্কারের জন্য সুপারিশ করে নোবেল কমিটির কাছে চিঠি লিখেছেন। সেই চিঠির কপি। ‘একের পর এক দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা করে চলেছেন ট্রাম্প, এই পুরস্কার তাঁর অবশ্যই প্রাপ্য।’ দৃশ্যত বিস্মিত হয়েছিলেন ট্রাম্প। চিঠিটি হাতে নিয়ে অশ্রুসজল চাউনি দিয়ে বললেন, ‘বিবি, তোমাকে ধন্যবাদ দেওয়ার ভাষা নেই।’ কিন্তু সন্দেহ এখনও কাটেনি। বলেছেন, নোবেল কমিটির ‘লিবারেল’ সদস্যরা কি আর আমাকে এই পুরস্কার দেবে?
মজা করে কেউ বলতেই পারেন, যদি নোবেল কমিটি ‘হিংসার’ লালন করেই যায়, সেই হিংসার অবসান ঘটানো বিশ্বশান্তির জন্য অপরিহার্য! যেভাবে বাঙ্কার বাস্টার ফেলে মধ্যপ্রাচ্য ‘শান্ত’ করেছেন ট্রাম্প, সেভাবেই তাঁর উচিত এই হিংসাকে দুনিয়া থেকে নির্মূল করতে নরওয়েতে ‘হেইট বাস্টার’ বোমা ফেলা। আর মানবতার কল্যাণে এই সাহসী পদক্ষেপের জন্যই তিনি পেতে পারেন নোবেল পুরস্কার।
শোনা যাচ্ছে, ট্রাম্প এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এরই মধ্যে কোমর বেঁধে মাঠে নেমে পড়েছেন। কয়েকটি ‘হেইট বাস্টার’ বোমা বানানোর জন্য বিজ্ঞানীদের নির্দেশ দিয়েছেন। বিখ্যাত মার্কিন সাময়িকী ‘দ্য ট্রাম্প লাইট’-র প্রতিবেদনে জানা গিয়েছে, ন্যাটো সম্মেলনের শেষ দিনে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমাকে নোবেল শান্তি পুরস্কার না দিলে আমি নরওয়েতে বোমা মারব, যেই বোমা বিশ্বের কেউ কখনও দেখেনি! আমার বোমা মেরে শান্তি আনার রেকর্ড আছে। আমি এটা আবার করতে পারি। আম জনতা তো অ্যাকশন মুভি পছন্দ করে, তাই না?’ সম্প্রতি এক্স ও ইনস্টাগ্রামে এমনই কিছু পোস্ট ঘুরছে। যেখানে ট্রাম্প বলেছেন, ‘নরওয়ে এখন হিংসার আঁতুড়ঘর। এই হিংসা-বিদ্বেষ নির্মূল করলেই আমি নোবেল পাব। এটি আমার নোবেল পাওয়ার জন্য নয়, বরং হিংসামুক্ত মানবসভ্যতা গড়ার লক্ষ্যে।’ নিজের ট্রুথ সোশ্যালেও সামান্য এক নোবেলের জন্য তাঁকে কত কবিতা লিখতে হচ্ছে। লিখেছেন, ‘আমি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থামালেও নোবেল পাব না, ইজরায়েল-ইরান যুদ্ধ মেটালেও পাব না। কিন্তু আমি জানি, জনগণ জানে, এর পিছনের কারণ কী! আমার নাম তো আর ওবামা নয়। আমার কমপক্ষে চার-পাঁচবার নোবেল পাওয়া উচিত ছিল!’
এমন পরিস্থিতে নরওয়ের নোবেল কমিটি হাত গুটিয়ে বসে থাকবে কী করে! তারাও যুদ্ধ এড়াতে ট্রাম্পকে দিলেও দিতে পারে নোবেল শান্তি পুরস্কার। আর তারপর? নোবেলজয়ী ভাষণে ট্রাম্প আওড়াবেন অগ্নিঝরা কণ্ঠে শান্তির বাণী: ‘বোমা মেরে আদি-অন্ত, এই ধরাকে করো শান্ত।’ এই বুলি ক্ষণিকেই বিখ্যাত হয়ে পড়বে দুনিয়াজুড়ে। এরপর আমেরিকায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারে ‘নোবেলম্যান ট্রাম্প ইউনিভার্সিটি’। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে পিস স্টাডিজের এক নতুন শাখার সূচনা হতে পারে। সেই বিভাগের নাম হতে পারে ‘ড্যাডি ট্রাম্পের যুদ্ধ ও শান্তি স্টাডিজ’!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ