Bartaman Logo
৩ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

ওয়ালেস লাইন

পৃথিবীর মানচিত্রে এমন কিছু সীমারেখা আছে যেগুলো চোখে দেখা যায় না, তবু তাদের প্রভাব গভীর ও সুদূরপ্রসারী।

ওয়ালেস লাইন
  • ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০

এশিয়া ও ওশিয়ানিয়ার প্রাণীকুলের মধ্যে বিস্তর তফাত। একটি রেখা যেন দুই মহাদেশের প্রাণীদের আলাদা করে দিয়েছে, জানালেন উৎপল অধিকারী

Advertisement

পৃথিবীর মানচিত্রে এমন কিছু সীমারেখা আছে যেগুলো চোখে দেখা যায় না, তবু তাদের প্রভাব গভীর ও সুদূরপ্রসারী। ওয়ালেস লাইন ঠিক তেমনই এক অদৃশ্য সীমানা। যা এশিয়া ও ওশিয়ানিয়ার জীবজগৎকে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে আলাদা করে রেখেছে। এই সীমারেখা শুধু ভূগোলের গল্প বলে না, বলে বিবর্তন, জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের ওঠানামা এবং প্রাণীদের বিস্তারের এক বৈজ্ঞানিক উপাখ্যান। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ব্রিটিশ প্রকৃতিবিদ আলফ্রেড ওয়ালেস দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বীপপুঞ্জে দীর্ঘদিন গবেষণা করেন। মালয় দ্বীপপুঞ্জ জুড়ে ভ্রমণের সময় তিনি একটি বিস্ময়কর বিষয় লক্ষ করেন। কাছাকাছি দ্বীপ হলেও তাদের প্রাণীকুলে আকাশ-পাতাল তফাত। এই পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতেই তিনি যে কাল্পনিক সীমারেখা টানেন, সেটিই পরে ‘ওয়ালেস লাইন’ নামে পরিচিত হয়। ওয়ালেস লাইন মূলত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বীপপুঞ্জের মাঝ দিয়ে গিয়েছে। এটি বালি ও লম্বক দ্বীপের মাঝখানে এবং বোর্নিও ও সুলাওয়াসি দ্বীপের মাঝামাঝি দিয়ে অতিক্রম করেছে। আশ্চর্যের বিষয়, এই দ্বীপগুলো একে অপরের খুব কাছাকাছি হলেও তাদের প্রাণীকুলের চরিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। পরবর্তীকালে এই রেখার পাশে ওয়েবার লাইন টানা হয়। এটিও জীববৈচিত্র্যকে নির্দেশ করে।

এশিয়া ও ওশিয়ানিয়ার জীববৈচিত্র্যের পার্থক্য
ওয়ালেস লাইনের পশ্চিম দিকে যেমন ভারত, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার কিছু দ্বীপে প্রধানত এশীয় প্রাণীকুল দেখা যায়। এখানে বাঘ, হাতি, গণ্ডার, বিভিন্ন প্রজাতির বানর ও হরিণ স্বাভাবিকভাবে বাস করে। অন্যদিকে এই রেখার পূর্ব দিকে অর্থাৎ অস্ট্রেলিয়া ও তার পার্শ্ববর্তী দ্বীপগুলোতে দেখা যায় মার্সুপিয়াল বা থলিধারী প্রাণী— যেমন ক্যাঙ্গারু, কোয়ালা, ওয়ালাবি। পাখি ও সরীসৃপের মধ্যেও এই ভিন্নতা স্পষ্ট। একই জলবায়ু অঞ্চলে থেকেও কেন এমন তফাত?এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসে।
পৃথিবীর ইতিহাসে হিমযুগের সময় সমুদ্রের জলস্তর বহুবার নীচে নেমে যায়। তখন অনেক দ্বীপ মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিল। কিন্তু ওয়ালেস লাইনের নীচে থাকা গভীর সমুদ্রখাত কখনোই পুরোপুরি শুকায়নি। ফলে এশীয় প্রাণীরা পূর্বের দ্বীপগুলোতে পৌঁছতে পারেনি। আবার অস্ট্রেলীয় প্রাণীরাও পশ্চিমে আসতে পারেনি। এই দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতাই আলাদা বিবর্তনের পথ তৈরি করেছে।
ওয়ালেস লাইনের মাঝামাঝি যে অঞ্চলটি পড়ে, তাকে বলা হয় ওয়ালেসিয়া। এখানে এশীয় ও অস্ট্রেলীয় প্রাণীজগতের মিশ্রণ দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ, সুলাওয়েসিতে কিছু এশীয় স্তন্যপায়ী ও কিছু অস্ট্রেলীয় বৈশিষ্ট্যের পাখি একসঙ্গে বাস করে। এই অঞ্চল বিজ্ঞানীদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি বিবর্তনের ‘জীবন্ত গবেষণাগার’ হিসেবে কাজ করে। ওয়ালেস লাইনের ধারণা চার্লস ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্বকে আরও শক্তিশালী করে। আলাদা পরিবেশে দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন থাকলে প্রাণীরা কীভাবে ভিন্ন পথে বিবর্তিত হয় ওয়ালেস লাইন তার বাস্তব উদাহরণ। আজকের বয়োজিওগ্রাফি শাস্ত্রের ভিত্তি গঠনে এই সীমারেখার অবদান তাই অপরিসীম। আধুনিক জেনেটিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ওয়ালেস লাইনের দুই পাশের অনেক প্রজাতির প্রাণীর ডিএনএ-তে গভীর পার্থক্য রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও মানুষের অপরিণামদর্শী কার্যকলাপে এই অনন্য জীববৈচিত্র্য আজ বিপন্ন। তাই ওয়ালেসিয়া অঞ্চলের সংরক্ষণের দায়িত্ব শুধু স্থানীয় মানুষের নয়, গোটা বিশ্বের। ওয়ালেস লাইন প্রমাণ করে যে, প্রকৃতির ইতিহাস কেবল মানচিত্রে আঁকা সীমারেখার মধ্যে বন্দি নয়। অদৃশ্য এই সীমানা আমাদের শেখায় ভৌগোলিক অবস্থান, সময় ও বিচ্ছিন্নতা মিলেই জীবনের বৈচিত্র্য গড়ে তোলে। আজও বিজ্ঞানীরা যখন নতুন প্রজাতি আবিষ্কার করেন বা বিবর্তনের ধাঁধা মেলান তখন ওয়ালেস লাইনের গুরুত্ব নতুন করে সামনে আসে। প্রকৃতির এই অদৃশ্য সীমারেখা তাই বিজ্ঞানের ইতিহাসে অনন্য।

সম্পর্কিত সংবাদ