Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

সাধারণতন্ত্র দিবসে ভোটাধিকার সংকট

সংবিধানের প্রস্তাবনায় লেখা ‘আমরা, ভারতের জনগণ’–এই বাক্যটিই প্রতি বছর সাধারণতন্ত্র দিবসে নতুন করে তাৎপর্য পায়।

সাধারণতন্ত্র দিবসে ভোটাধিকার সংকট
  • ২৬ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

অগ্নিভ ভৌমিক,কৃষ্ণনগর: সংবিধানের প্রস্তাবনায় লেখা ‘আমরা, ভারতের জনগণ’–এই বাক্যটিই প্রতি বছর সাধারণতন্ত্র দিবসে নতুন করে তাৎপর্য পায়। কিন্তু ২০২৬ সালের সাধারণতন্ত্র দিবসের আগে নদীয়ার মাটিতে দাঁড়িয়ে সেই বাক্যটি আজ যেন প্রশ্নের মুখে। একদিকে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের প্রস্তুতি, অন্যদিকে জেলার বিভিন্ন বিডিও অফিসের সামনে দীর্ঘ লাইন। নিজের ভোটাধিকার টিকিয়ে রাখতে এসআইআরের শুনানিতে হাজির হওয়া হাজার হাজার মানুষের উদ্বেগমাখা অপেক্ষা। সাধারণতন্ত্র দিবসের ঐতিহাসিক মাহাত্ম্য আর এসআইআর প্রক্রিয়ায় নথি-জটের ‘হয়রানি’–এই দু‌’য়ের সংঘাতে নদীয়ায় তৈরি হয়েছে এক নাটকীয় বাস্তবতা। যেখানে নাগরিক অধিকারের উৎসবের আগেই নাগরিকদের অধিকার নিয়েই তৈরি হচ্ছে অনিশ্চয়তা। ২০২৬ সালের সাধারণতন্ত্র দিবসের ঠিক আগে নদীয়া জেলায় সেই সাংবিধানিক আদর্শ ও বাস্তব প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্যে এক গভীর দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

Advertisement

কমিশন সূত্রে জানা গিয়েছে, নদীয়া জেলাজুড়ে বর্তমানে ৮ লক্ষেরও বেশি মানুষকে এসআইআরের শুনানিতে হাজির হতে হচ্ছে। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের মধ্যে রয়েছেন ২ লক্ষ ৮১ হাজার আনম্যাপড ভোটার এবং ৫ লক্ষ ২৫ হাজার সন্দেহভাজন ভোটার। কালীগঞ্জ, করিমপুর, তেহট্ট, নাকাশিপাড়া, রানাঘাট থেকে শুরু করে কল্যাণী, প্রায় প্রতিটি ব্লকের বিডিও অফিসেই প্রতিদিন ভোর থেকে লাইন পড়ছে। ভোটার তালিকায় নিজেদের নাম ধরে রাখতে বহু মানুষকে কাজ ফেলে, সংসারের দৈনন্দিন উপার্জন ছেড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

শুনানির চিত্র ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে বলে অভিযোগ। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রবীণ, অসুস্থ মানুষ, মহিলা ও পরিযায়ী শ্রমিকদের উপস্থিতি প্রতিদিনই চোখে পড়ছে। কারও হাতে ফাইল, কারও হাতে পুরনো ভোটার ও আধার কার্ড। সবমিলিয়ে চোখেমুখে এক অদ্ভুত উৎকণ্ঠার ছবি। অনেকের বক্তব্য, জীবনে প্রথমবার তাঁরা এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন, যেখানে প্রশাসনের কাছে নিজের ভোটাধিকার প্রমাণ করতে হচ্ছে।

এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে নথি সংকট। এসআইআরের শুনানির জন্য যে নথিপত্র চাওয়া হচ্ছে, তা বহু ভোটারের কাছেই নেই।  দীর্ঘদিন ভিনরাজ্যে কাজ করা পরিযায়ী শ্রমিকরা বাড়ি ফিরে প্রয়োজনীয় নথি জোগাড় করতে গিয়ে চরম সমস্যায় পড়ছেন। ফলে কয়েক হাজার মানুষ কার্যত ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে।

রাজনৈতিক মহলের একাংশের দাবি, এসআইআর প্রক্রিয়া ক্রমশই ‘হয়রানিমূলক’ রূপ নিচ্ছে। তাঁদের বক্তব্য, সাধারণতন্ত্র দিবসের ঐতিহাসিক গুরুত্ব হল নাগরিকের মৌলিক অধিকার সুরক্ষা ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি শ্রদ্ধা। অথচ ঠিক এই সময়েই সাধারণ মানুষকে সন্দেহভাজন হিসেবে দেগে দিয়ে নথি পরীক্ষায় বসানো হচ্ছে। বিরোধী দলগুলির অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন গরিব, প্রান্তিক, সংখ্যালঘু ও পরিযায়ী জনগোষ্ঠী।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নদীয়া তথা গোটা রাজ্যে এসআইআর শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়, বরং তা একটি বড় রাজনৈতিক প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। ভোটার তালিকার স্বচ্ছতার যুক্তি সামনে আনা হলেও বাস্তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে, তা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পক্ষে শুভ নয় বলে মত তাঁদের।

অন্যদিকে কমিশনের তরফে দাবি, ভোটার তালিকার নির্ভুলতা বজায় রাখতে এসআইআর প্রক্রিয়া জরুরি। ভুল বা অযোগ্যদের নাম বাদ দেওয়া এবং প্রকৃত ভোটারের অধিকার সুরক্ষার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ।

সাধারণতন্ত্র দিবসের প্রাক্কালে নদীয়ার এই চিত্র রাজনৈতিক মহলে এক গভীর প্রশ্ন তুলে ধরছে–সংবিধানপ্রদত্ত ভোটাধিকার যদি নথির জটিলতায় অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তবে সেই গণতন্ত্র কতখানি শক্তিশালী থাকে?

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ