Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

শতবর্ষে ভোটের নাটক

‘ভোট’ শব্দটি বাংলা নয়, ল্যাটিন থেকে ইংরেজি হয়ে বঙ্গে তার আগমন। মূল শব্দটির অর্থ ইচ্ছা অর্থাৎ স্বেচ্ছায় স্বাধিকার প্রয়োগ

শতবর্ষে ভোটের নাটক
  • ৩০ এপ্রিল, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সায়ন্তন মজুমদার: ‘ভোট’ শব্দটি বাংলা নয়, ল্যাটিন থেকে ইংরেজি হয়ে বঙ্গে তার আগমন। মূল শব্দটির অর্থ ইচ্ছা অর্থাৎ স্বেচ্ছায় স্বাধিকার প্রয়োগ। যাই হোক, বর্তমানের মতো সুদূর অতীতেও ভোটজ্বরে কীভাবে বাংলা কাবু হত আজ সে দিকটাতেই চেয়ে দেখব।

Advertisement

২০২৬-এ পশ্চিমবাংলায় বিধানসভা ভোট হল। ২৬-এর উল্টো হল ৬২। বাংলার প্রথম আইনসভারূপে এর সূত্রপাত ১৮৬২ সালের ১৮ জানুয়ারি। পয়লা ফেব্রুয়ারি ভারতসম্রাজ্ঞী মহারানি ভিক্টোরিয়ার প্রতি আনুগত্য জানিয়ে অনুষ্ঠিত প্রথম অধিবেশনের সভাপতি হন বাংলার ছোটোলাট স্যর জন পিটার গ্রান্ট। বারোজন সদস্যের মধ্যে ভারতীয়রূপে ছিলেন মাত্র চারজন—রাজা রামমোহনপুত্র রমাপ্রসাদ রায়, মৌলভী আব্দুল লতিফ, রামমোহনশিষ্য প্রসন্নকুমার ঠাকুর, পাইকপাড়া তথা কান্দির রাজা প্রতাপচন্দ্র সিংহ। ১৮৬১ সালের ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অ্যাক্ট অনুযায়ী প্রতিষ্ঠিত সেই লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সভাস্থল ছিল আজকের কলকাতা জাতীয় গ্রন্থাগারের বেলভেডিয়ার ভবন। সেটি তৎকালে ছিল ছোটোলাটের বাসভবন। ১৮৯২ সালের ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অ্যাক্ট অনুযায়ী বঙ্গীয় বিধান পরিষদের সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে কুড়িতে দাঁড়ায়। তাঁদের মধ্যে সাতজন ছিলেন নির্বাচিত। ১৯০৯ সালে মর্লে-মিন্টো ভারতশাসন আইনের সৌজন্যে সদস্য সংখ্যা পঞ্চাশ ছাড়ায়। ১৯১৯ সালের মন্টেগু-চেমসফোর্ড সংস্কারমূলক ভারতশাসন আইনের বলে শতাধিক নির্বাচিত সদস্য পায় এই আইনসভা। ভোটার সংখ্যা ছিল দশ লক্ষের বেশি। 
আজ থেকে একশো বছর আগে—১৯২৬ সালেও বাংলায় ভোট পর্ব অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেটি ছিল ১৯১৯ সালের সংস্কার পরবর্তী তৃতীয় বিধানসভা নির্বাচন। সেই ভোটের তিনটি উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল। প্রথমত, ব্রহ্মদেশের মান্দালয় জেলে বন্দি থাকাকালীন উত্তর কলকাতার আসনে স্বরাজ্য দলের প্রতিনিধিরূপে নেতাজির জয়যুক্ত হওয়া। দ্বিতীয়ত,নির্বাচনে মহিলাদের প্রথম ভোটাধিকার প্রয়োগ। যদিও সম্ভ্রান্ত ঘরের মহিলাদের মধ্যে অধিকাংশই অনুপস্থিত ছিলেন। তৃতীয়ত, কুমার শিবশেখরেশ্বর রায়ের অপসারণ দাবি করে দেশপ্রাণ বীরেন্দ্রনাথ শাসমলের নেতৃত্বে অনাস্থা প্রস্তাব আনয়ন। 
১৯২৬ সালের সেই নির্বাচন উপলক্ষ্যে স্বনামধন্য নাট্যকার, অধ্যাপক, চিকিৎসক ‘রসরাজ’ অমৃতলাল বসু কলম ধরেছিলেন। লিখেছিলেন ‘দ্বন্দ্বে মাতনম্’ নাটক। ১৯২৬ সালের ২৪ কার্তিক অর্থাৎ নভেম্বর মাসে নাটকটি প্রথম অভিনীত হয়। আর্ট থিয়েটার লিমিটেডের তত্ত্বাবধানে স্টার থিয়েটারে নাটকটি মঞ্চস্থ হয়। নাট্যচরিত্রে অন্যান্যদের সঙ্গে বিশেষরূপে লক্ষণীয় ভোটোপাসক, ভোটোপাসিকা ও  ক্যানভাসাররা। প্রথমেই ছিল ভোটেশ্বরী দেবীর উপাসক-উপাসিকাদের স্বস্তিবাচনগীত—‘তেত্রিশ কোটির ওপর ঠাকুর তুমি ভোটেশ্বরী।’ নারীপুরুষ নির্বিশেষে সকলে দেবী ভোটেশ্বরীকে নারদমুনির মানসকন্যা, সুহৃদমর্দিনী, বিরোধবর্ধিনী, ব্রিটিশতোষিণী, ভয়ংকরী বলেছেন। দেবীর কৃপাদৃষ্টিতে আত্মীয়সহ বন্ধুপ্রীতিতে গলাগলি দশা পরিণতি পায় দলাদলিতে। দ্বেষাদ্বেষির নাম তিনি দেন দেশের প্রতি দরদ। ভোট পেতে রিগিং, উৎকোচপ্রথা প্রসঙ্গে দৈত্যহানা বা পরী আটকানোর উপমা ব্যবহার করা হয়েছে। নেতা প্রসঙ্গে নাট্যকার বলেছেন ‘ভোটে ইষ্ট, নেতা তুষ্ট, দাস পুষ্ট’। ভোট প্রচারের ছবির সঙ্গে একাল-সেকাল যেন এক হয়ে যায়। অমৃতলেখনী জানায় ভোটে ছোটোদের গর্ব বাড়ে কেননা মুটের দুয়ারেও রাজা নিজেকে লুটিয়ে দেয়। বিলাত থেকে খেলাতের বলে আসা পরব হল এই ভোট। 
নাটকটিতে পাঁচটি অঙ্ক রয়েছে। পাঁচটি অঙ্কের নামকরণে নাট্যকার শারদোৎসবের ছোঁয়া এনেছিলেন—বোধন, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী ও বিজয়া। শুরুতেই গোবরার মাকে ঘুঁটে গুনতে দেখি। নির্বাচনে গোবর কি সেই সময়েও প্রাসঙ্গিক ছিল? নির্বাণবাবুর হয়ে তাঁর কাছে ভোট চাইতে গিয়েছেন নীরদ, ক্ষীরোদরা। তাঁরা ভোটের দিন গাড়ি করে গোবরার মাকে ভোট দেওয়াতে নিয়ে যাবেন বলে। প্রতিপক্ষরূপে ভোটে দাঁড়িয়েছেন নীলুবাবু। বিষয়টা ঠাওর করতে না পেরে গোবরার মা বলেন, ‘ভোট বলে কি ঘোঁট করে গেল?’ রাখালবেশী বালকদের গানে শুনি, ‘পোলিং এ চল চল ভোটে যাই।’ কলমদ্দির প্রশ্নের উত্তরে তামিজ মিয়াঁকে বলতে শুনি, ভোট হল ‘বিলেতী তামসা’ অর্থাৎ তামাশা। তখনও সংখ্যালঘুদের জন্য পৃথক আসনের ব্যবস্থা ছিল। তামিজের ভাষায়—মোছলমান ও বেমোছলমান। মেরুকরণ তখনও ছিল। মুসলিম আসনের প্রার্থী মৌলভী আতাউল্লার পূর্বজেরা এসেছিলেন ইরান থেকে। তামিজের মতে, ইরান অবস্থিত আরবে আর আরব হল পূর্ববঙ্গে। ভোট দিতে যাওয়াটা তাঁদের কথায় হয়ে গিয়েছে ‘ভুটুতে’ যাওয়া। ভাল্লুক নাচওয়ালার গানে লক্ষণীয়—‘ভোট ভোট করকে সব কোই নাচে/ নাচে ঘাটোয়াল,—ভোরসে নাচে পহর রাত/ সহর লালে লাল।’
সে যুগেও ভোটে দাঁড়াতে অনিচ্ছুক বাজবাহাদুরের মতো লোক ছিলেন। তাঁরা দোরে দোরে খোশামোদ করতে যেতে পছন্দ করতেন না। ধর্মকে হাতিয়ার করার প্রমাণরূপে গুরুচরণ ভট্টাচার্যকে সকল যজমানদের ভোট নীলুবাবুর পাওয়ার জন্য তদ্বির করার নির্দেশ আসে। আবার ঘরশত্রু বিভীষণরূপে তাঁরই ভাইপো অভয়চরণ নির্বাণবাবুর দলে নাম লেখাতে বলেন। খাবার নিয়ে রাজনীতি তখনও ছিল। মুড়ি-মোয়াকে সাত্ত্বিক আহার বলেছিলেন গুরুচরণ। আঙুর বেদানা, পেস্তা, কেককে ভালো চোখে দেখেননি বাজবাহাদুর। ক্ষীরোদের কথায় উঠে আসে তাঁদের দলের নিশ্চিত ভোটার গোবিনবুড়োকে অন্তত পোলিংয়ের দিন পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখার আর্জি। মা কালীর কাছে এক টাকা চার আনার পুজোর মানতও করা হয়।
‘সপ্তমী’-র প্রথমেই সারদাসুন্দরীর গীতে আদরের দেবরের প্রতি বৌদির করুণ আক্ষেপ ফুটে উঠেছে। দেবর মোল্লাপাড়ায় মেয়র খুঁজতে গিয়েছে, ‘রেয়োর মতন ভোট-ভিখিরী সে যে দোরে দোরে ঘোরে ছাই,—/ বাজ পড়ুক্ এই রাজনীতিতে কাজ ক্ষতির কি বালাই।’ অঙ্কের শেষে কয়েকজন পড়শিনির গানে উঠে এসেছে গোঁদলপাড়ায় ভোটের কোঁদলে বাপব্যাটায় লড়াই, ভাইয়েভায়ে বাক্যি বন্ধের কথা। তৎকালেও  ছিল নিজেদের দোষ ঢেকে তৃতীয় পক্ষের ওপর দোষারোপ করার অভ্যাস—‘কি পড়া পড়ালে কি বিদ্যে ছড়ালে বাড়ালে কি বাই;/ করে দেশ দেশ বুঝি অবশেষ চির প্রিয় জনে হায় গো হারাই।’
‘অষ্টমী’-তে গুরুচরণ ভোটের দারুণ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের স্মৃতিসঞ্জাত স্বরাজ্য দলকে অমৃতলাল স্বদেশ বলেছেন। পাঁচ বছর অন্তর দেবী শীতলার ‘দয়া’-র বৃদ্ধির মতো ভোটেশ্বরীর কৃপা বর্ষণ হয় তিন বছর অন্তর। গুরুচরণের গিন্নির মতে ভোট হল খেলার জিনিস। ভুল ভাঙিয়ে বলেন এও প্লেগ, বেরিবেরির মতোই একটি রোগ। কুশপুতুল পোড়ানো তখনও ছিল। সেই জন্য কুমোর মাসি বলেন, দমের গাড়ি চড়ে এসে কার্তিকের খড় সব কিনে নিয়ে গিয়েছে ভোটকর্মীরা। চাকরিতে জাতিভিত্তিক সংরক্ষণ বৃদ্ধির টোপের কথাও রয়েছে নাটকে। শহরের একজন নাগরিকা মহিলা জানান যে ‘এবার আমাদেরও ভোট হয়েছে।’ কুমোরমাসি ভয়ে বলেন, ভোটের লাইনে বামুন-কায়েতের ছোঁয়াছুঁয়ি না হয়ে যায়। আবার ক্ষীরোদ চাযন সব ভোট যেন তাঁর কাম্য প্রার্থী পান। তাঁকে নিয়ে দোমনা মানুষেরা যেন ভোটের দিন অসুস্থ হয়ে বিছানা ছেড়ে না উঠতে পারেন। প্রিয়নাথকে টাকা পকেটস্থ করার অভিযোগের মাধ্যমে ভোটে টাকা ওড়া ও ধরার তত্ত্ব ধরা পড়ে। ভবেনের হাতে দুই ডজন ভোট রয়েছে। ওড়িয়া রমণীদের গীতে জয়ধ্বনিতে ভোট-ভগবানের বেঁচে থাকার কথা উঠে এসেছে—‘কুহ কুহ জয় জয়,ভোট প্রভু বঞ্চি রয়—’
ভোটে তৎকালেও লুকিয়ে ছিল অন্তর্ঘাতের চোরা স্রোত। পোস্টার ছেঁড়ার মতো ক্ষীরোদ জ্যাঠামশাইকে প্ল্যাকার্ড ছেঁড়ার দায়ে অভিযুক্ত করেছেন। প্রকাশের কথাতেই স্পষ্ট বাঙালির সংগঠন নেই। ডেমোক্রেসি আজ ‘ডিমনোক্রেসি’ অর্থাৎ দৈত্যরাজে পরিণত হয়েছে। খাওয়াদাওয়ার আয়োজনও থাকত। একজন যুবক বলেছে পেটের বয়লারে ভালো করে খাবার স্টিম দিতে হবে।
তারপর চলে আসে ‘নবমী’তে গুরুচরণকথিত পোল পার্বণ। ভোটের প্রচারক বা এজেন্টরূপে ক্যানভাসাররাও ব্রাত্য থাকেননি। তাঁদের গানে বাঙালির ভোটের খেলা ও ফুটবল খেলা সম্মিলিত হয়ে গিয়েছে—‘ফুটবলে দল আছে দুটো দিকে,/ তেম্নি জোটে গোঁড়া ভোটের বাতিকে,/...খেলার শেষে কাটলে নেশা তিনটি বছর শুয়ো।।’উৎসব শেষ হয় ‘শান্তি, শান্তি’ রবে। কিন্তু এখনকার মতো তখনও ভোটে যে শান্তি ছিল না তার প্রমাণ নাট্যকার রেখে গিয়েছেন নামকরণে। ভোটের একপিঠ মানেই পারস্পরিক লড়াই, হানাহানি, মারামারি কাটাকাটির কমতি না থাকা। তাই হিসাব করেই একশো বছর আগে ভোটদ্বন্দ্বে মেতে থাকা বঙ্গের আবহে প্রকাশিত নাটকটির নাম রাখা হয়েছিল ‘দ্বন্দ্বে মাতনম্’।
 লেখক গবেষক ও প্রাবন্ধিক (মতামত ব্যক্তিগত)

সম্পর্কিত সংবাদ