স্বাধীনতার আট দশক পূর্তির মুখে পৌঁছে গিয়েছে দেশ। তবু ভারতের বেশিরভাগ মানুষ এখনও গরিব। দারিদ্র দূরীকরণের রকমারি প্রকল্প এবং কর্মসূচি গ্রহণের পরেও দেশজুড়ে বিপিএল পরিবার অসংখ্য। কিন্তু তাতে দেশের অভিভাবকদের যে বিন্দুমাত্র লজ্জা এবং উদ্বেগ নেই, তার প্রমাণ তাঁদের ধারাবাহিক আস্ফালন। বরং বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং ইস্তাহার দেখে এটাই বিশ্বাস হয় যে, গরিবি, অনুন্নয়ন তাদের জিয়নকাঠি। দারিদ্র এবং বৈষম্য দূর করার ব্যাপারে আন্তরিক নন কেউই। হয়তো তাঁরা এটাকে ‘হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলা’ বলেই ভাবেন। ভোটযন্ত্রে ফায়দা তোলার জন্য যা সর্বাধিক বিধেয় সেটাই পালন করে বেশিরভাগ দল। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে মুফতে কিছু পাইয়ে দিয়ে তুষ্ট রাখা। উদ্যোগটা যদি গরিব মানুষকে কাজ, খাদ্য প্রভৃতি প্রদান কিংবা তাদের হাতে নগদ জোগানের ব্যবস্থা করার লক্ষ্যে হয়ে থাকে তবে তার মধ্যে আপত্তির কিছু থাকে না। যেটা পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আন্তরিকতার সঙ্গে এবং ধারাবাহিকভাবে করে চলেছেন। তাঁর কল্যাণকামী সরকারের কাছে অগ্রাধিকার পেয়ে থাকে গরিব এবং পিছিয়ে পড়া মানুষ, তাদের মধ্যেও সর্বাধিক নজর থাকে মহিলাদের উপর। বাংলার জননেত্রী বস্তুত নারীর ক্ষমতায়নে সারা বিশ্বের সামনে এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
পশ্চিমবঙ্গে গরিব এবং পিছিয়ে পড়া শ্রেণির মানুষের জন্য দেড় দশক যাবৎ রকমারি সামাজিক কল্যাণমূলক প্রকল্প ও কর্মসূচি ধারাবাহিকভাবে রূপায়িত হচ্ছে। সেগুলি স্বচ্ছতার সঙ্গে রূপায়ণের ফলেই বাংলায় দারিদ্রমুক্তির দিকটি জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক স্তরেও প্রশংসিত হয়ে থাকে। সমাজে বৈষম্য শুধু জাতিগত নয়, লিঙ্গবৈষম্যও মারাত্মক। এই ব্যাধির মূলোচ্ছেদ করার জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নারীর ক্ষমতায়নের উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপসহ চালু করেছেন ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ প্রকল্প। সারা দুনিয়া জানে, রাজ্যের কোষাগার থেকেই এই প্রকল্প মমতা চালু করেছেন এবং চালু হওয়ার পর থেকে একদিনের জন্যও তাতে ছেদ পড়েনি। এই প্রকল্পভুক্ত লক্ষ লক্ষ পূর্ণবয়স্ক মহিলা একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের মাসোহারা পান। ওই অর্থ গ্রাহকদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে নিয়মিত ক্রেডিট হয়। একাধিক সমীক্ষায় প্রকাশ, এই প্রকল্প রূপায়ণের আশীর্বাদে সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলির মহিলাদের সামাজিক সুরক্ষা এবং সম্মান যুগপৎ বৃদ্ধি পেয়েছে। তার সুবিধা শুধু তাঁরাই পাচ্ছেন না, তা সঞ্চারিত হচ্ছে তাঁদের স্বামী-সন্তানসহ গোটা পরিবারের মধ্যেই। অর্থাৎ পরিবারগুলির যাপনচিত্র উজ্জ্বল হয়েছে অনেকাংশে। সহজ কথায়, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বাংলার পরিবারগুলিতে লক্ষ্মীশ্রী যোগ করেছে। এই হল প্রকৃত উন্নয়ন। এই কথা স্বীকার করা দরকার যে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিকল্প আর্থ-সামাজিক উন্নয়নচিন্তা ‘উন্নয়ন’ শব্দের সংজ্ঞা পুনর্লিখনের প্রয়োজনীয়তা দেখিয়েছে। বিষয়টি যে গবেষকদেরও নতুন চিন্তার খোরাক জোগাচ্ছে, তাতে সন্দেহ কী?
মমতার দল তৃণমূল কংগ্রেস একুশেই বাংলায় হ্যাটট্রিক করেছে। বাংলার মানুষ এবারও হয়তো মমতাকেই পুনর্নির্বাচনের জন্য ভাবছেন। এই জোরালো সম্ভাবনার বার্তাতেই মাথা খারাপ হওয়ার অবস্থা মোদি-শাহের পার্টির। তাই জোড়া কৌশলী রাজনীতিতে নেমেছে গেরুয়া শিবির। একদিকে, রাজ্যে রাজ্যে তারা লক্ষ্মীর ভাণ্ডারসহ মমতার ফলিত প্রশংসিত প্রকল্পগুলির অন্ধ অনুকরণ করছে, অন্যদিকে বাংলায় চেষ্টা করছে তাঁকে এবং তাঁর দল ও দলীয় নেতাদের ভাবমূর্তিতে কালি লেপে দিতে। যেমন এবার টালমাটাল পরিস্থিতিতে বিহার-বিজয়ের জন্য মোদি-নীতীশ জুটি প্রত্যেক মহিলার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে দশ হাজার টাকা প্রদানের টোপ দিয়েছিল। তাতে কাজও হয়েছে যথারীতি। এই রেউড়িতেই পড়শি রাজ্যে বাজিমাত করেছে বিজেপি-জেডিইউ। নির্বাচন ঘোষণার ঠিক দশদিন আগে এই চমক নিয়ে হাজির হয়েছিল এনডিএ। এমনকি ভোট ঘোষণার পরও ‘রেউড়ি’ বণ্টন অব্যাহত ছিল। বিরোধীদের আপত্তি আমল দেয়নি ইসিআই। কিন্তু নির্বাচন মিটে যেতেই কী দেখলেন বিহারের মহিলারা? বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে মুখ্যমন্ত্রী মহিলা রোজগার যোজনায় নাম অন্তর্ভুক্তির কাজ। পোর্টালে আর নতুন করে আবেদন করা যাচ্ছে না। ফলে মহিলাদের দশ হাজার টাকা প্রদানের প্রকল্পটিও মোদির নয়া জুমলা আখ্যা পাচ্ছে। এই ‘বিপর্যয়’ হবে নাই-বা কেন? এর পিছনে বাংলার মতো কোনও সৎ উদ্দেশ্য এবং সদিচ্ছা মোটেই ছিল না। সবটাই ছিল ভোট হাতানোর মতলব। ভোটের মুখে চালু হল আর বন্ধ করে দেওয়া হল ভোট মেটার অব্যবহিত পরেই। এটি যে জেনেশুনেই বা পরিকল্পিতভাবে করা হয়েছিল তা এখন জলের মতোই পরিষ্কার। এটাকে রাজনৈতিক সংস্কৃতি বলা যায় না। নিখাদ লোক ঠকানো কারবার। বিহার দখলের জন্য মহিলাদের ঠকিয়েছে মোদি-শাহের জোট। সামনেই বাংলায় বিধানসভার ভোট। অনুমান করা যায়, এখানেও গরিব ও মধ্যবিত্ত, বিশেষ করে মহিলাদের জন্য প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ছুটবে। তাই গেরুয়া রঙে মন মজাবার আগে সাধু সাবধান।