


শুভজিৎ অধিকারী: ওই আসেন ভোটবাবু...। হুডখোলা গাড়ি। চতুর্দিক আ-ঢাকা। সামনে রেলিং। মাথার উপর অসীম আকাশ। ভোটবাবু সম্পূর্ণ দৃশ্যমান। গলায় ঠাসা গণ-আশীর্বাদ মাল্য। সঙ্গে দলীয় উত্তরীয়। গাড়ির ডিকিতে ঠায় দাঁড়িয়ে ভোটবাবু। জোড়হাত একবার সামনে তো পরক্ষণেই ডাইনে-বাঁয়ে। খর বৈশাখের চাঁদিফাটা রোদ। দরদর করে ঘামছেন তিনি। ঠোঁটের কোণে লেগে অমলিন হাসি। ভোট তো এসে গেল! তারপর পাঁচ বছর এসি গাড়ি...কালো কাচে বন্দি! আপাতত রাজনীতির ময়দানে রাজকীয় হাবভাব প্রকাশে সঙ্গী থাক এই হুডখোলা। প্রচার থেকে মনোনয়ন, জমকালো রোড শো’—সবেতেই চাই একটা ভিন্টেজ মডেলের ন্যাড়া মাথার গাড়ি। গণদেবতার পরানো মালা কিংবা ছুড়ে দেওয়া ফুলের পাপড়িতে ভরে যাক ডিকি। ভোটবাবুর এমন জনপ্রিয়তা সবাইকে দেখিয়ে হুডখোলার কাজ শেষ। সে এবার ঢুকে পড়বে গ্যারাজে। অনাদরে, অবহেলায় দিনযাপন। আবার কবে ভোট আসবে, শুরু হবে তার ঝাড়পোঁছ, আদর-যত্ন। তাই, হুডখোলা গাড়ি অনেকের কাছে ‘পরিযায়ী ভোটপঙ্খি’।
কুলীন-যান হুডখোলার এমন তকমা অবশ্য অতীতে ছিল না। উনিশ শতকের শুরুতে হুডখোলা গাড়ির উৎপত্তি। সেই থেকে রাজা, জমিদার কিংবা ভূস্বামীরা নিজেদের আভিজাত্যের অহংকার প্রকাশে যানটির ব্যবহার শুরু করেন। রীতিমতো অর্ডার দিয়ে কিনে আনতেন বিদেশ থেকে। কলকাতা কিংবা গ্রামের পথে সেইসব হুডখোলা গাড়ি দেখলে উৎসুক মানুষের ভিড় জমে যেত। সমীহ চোখে তাকিয়ে থাকতেন সবাই। সমস্বরে আওয়াজ উঠত,‘জয় জমিদারবাবুর জয়।’ এখন আওয়াজ ওঠে ‘প্রার্থীর জয় হোক...।’
তখন অবিভক্ত মেদিনীপুর। মলিঘাটি গ্রামের জমিদার ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র চৌধুরী। ১৯০৮ সাল নাগাদ তিনি গিয়েছিলেন জার্মানি। উদ্দেশ্য, মার্সিডিজ বেঞ্জ কিনবেন। ঢুকলেন শো রুমে। কর্তৃপক্ষ অর্ডার নেওয়ার আগে জানতে চাইলেন, মেদিনীপুরের রাস্তাঘাট কেমন? ঈশ্বরচন্দ্র বললেন, অত্যন্ত খারাপ। শুনেই বেঞ্জ কর্তারা পরামর্শ দিলেন, এমন সৌখিন গাড়ি না কেনাই ভালো। হতাশ হলেও নিরাশ হননি মলিঘাটির জমিদারবাবু। বেঞ্জের শোরুম থেকে বেরিয়ে তিনি সোজা চলে যান স্টোয়ার কোম্পানির শোরুমে। মেদিনীপুরের রাস্তার পরিস্থিতি জেনে সংস্থার কর্তারা ঈশ্বরচন্দ্রকে কাস্টম বিল্ড গাড়ি কেনার পরামর্শ দেন। সেই মতো গাড়িটি বুক করে তিনি ফিরে আসেন মেদিনীপুরে। গাড়িটির দাম পড়েছিল তিন হাজার ২৫০ টাকা। কিন্তু, গাড়ি আর আসে না। নিয়মিত যোগাযোগ রেখে চলেন ঈশ্বরচন্দ্র। শেষে তাঁর শখের হুডখোলা গাড়িটির যন্ত্রাংশ এসে পৌঁছল ১৯১৩ সালে। সঙ্গে এলেন দু’জন জার্মান ইঞ্জিনিয়ার। তাঁরাই মেদিনীপুরে গাড়িটি সচল করেন। বাংলায় হুডখোলা গাড়ি ব্যবহারের ইতিহাসে ঈশ্বরচন্দ্র সম্ভবত নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিলেন। এরপর ১৯২৮ সাল। কলকাতার ফ্রেঞ্চ মোটর কোম্পানি আমেরিকার স্টুডিবেকার কর্পোরেশনের দু’টি গাড়ি আনিয়ে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করেছিল। একটি স্টুডিবেকার প্রেসিডেন্ট-এইট। অন্যটি হুডখোলা ট্যুরার। ওই প্রদর্শনীতে হাজির ছিলেন কাশিমবাজারের জমিদারবাবু কমলারঞ্জন রায়। তাঁর বয়স তখন মাত্র ২২ বছর। তিনি জেদ ধরলেন প্রেসিডেন্ট-এইট কিনবেনই। বাধ সাধলেন ফ্রেঞ্চ কোম্পানির কর্তারা। জমিদারবাবুকে সবিনয়ে জানিয়ে দিলেন, গাড়িগুলি শুধুমাত্র প্রদর্শনীর জন্য নিয়ে আসা হয়েছে। এখনই বিক্রি করা যাবে না। কমলারঞ্জনের জেদ আরও চেপে বসল। তিনি গাড়িটি কিনেই ছাড়বেন। শেষে ফ্রেঞ্চ কোম্পানির কর্তাদের হার মানতে হয়। প্রেসিডেন্ট-এইট কিনে কাশিমবাজার ফিরলেন কমলারঞ্জন। ক’দিন পর হুডখোলা ট্যুরার গাড়িটি কিনলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর সহোদর শরৎচন্দ্র বসু। হাইকোর্ট পাড়ার সবাই বলতেন বোস সাহেবের হুডখোলা। ১৯৪১ সাল। এই গাড়িটি করেই দেশ ছাড়ার প্ল্যান করেছিলেন নেতাজি। সেই মতো ট্রায়াল রানও শুরু হয়। কিন্তু, বর্ধমানে গিয়ে গাড়িটির যান্ত্রিক ত্রুটি ধরা পড়ে। বাধ্য হয়ে নেতাজি জার্মান ওয়ান্ডারার গাড়িটি নিয়ে কলকাতা ছাড়েন। মেদিনীপুরের জমিদারবাবুর আগে পর্যন্ত কলকাতা কিংবা গ্রামে হুডখোলা গাড়ির ব্যবহার তেমন ছিল না। কিছু জামিদার ও তাঁদের বাড়ির লোকজন ছাউনিহীন ঘোড়ার গাড়ি করে ঘুরে বেড়াতেন। ব্রিটিশ আমলে সাহেব-মেমরাও মুক্ত বাতাসের আস্বাদ পেতে এই ধরনের ঘোড়ার গাড়ি ব্যবহার করতেন। তারপর ধীরে ধীরে বাংলায় হুডখোলা গাড়িতে চড়ে বৈভব প্রকাশের প্রবণতা বাড়ে অভিজাত সম্প্রদায়ের মধ্যে। স্বাধীনতার অনেক পরে হুডখোলার গাড়ির এই অতীত ঐতিহ্যকে কাজে লাগিয়ে গণদেবতার মন ছোঁয়ার চেষ্টা করতে থাকেন রাজনীতিকরা। কেন না, হুডখোলা গাড়িতে খুব সহজেই মানুষের কাছাকাছি পৌঁছানো যায়। নেতা-নেত্রীরা তাতে দাঁড়িয়ে হাত নাড়লে কিংবা করজোড় করে রাখলে দর্শকদের মধ্যে আলাদা একটা মনস্তত্ত্ব কাজ করে। সবাই ভাবেন, নেতা-মন্ত্রী আমাকে লক্ষ্য করেই হাত নেড়েছেন। আমিও হাত নেড়েছি। তাই হয়তো হুডখোলা গাড়ির ইংরেজি নামকরণ ‘কনভার্টিবল কার’। নেতাদের বিনয়ী চেহারা খুব সহজেই মিলেমিশে যায় জনতা জনার্দনের সঙ্গে।
শান্তিনিকেতনে তখন হেলিকপ্টার ওঠানামার চল ছিল না। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু বিশ্বভারতীর উপাচার্য হিসাবে সমাবর্তনে এলে পানাগড়ের মাটি ছুঁত তাঁর হেলিকপ্টার। সেখান থেকে হুডখোলা গাড়িতে চেপে আসতেন শান্তিনিকেতনে। রাস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে থাকতেন কাতারে কাতারে মানুষ। নেহেরু কখনো দাঁড়িয়ে, কখনো বসে তাঁদের উদ্দেশে হাত নাড়তে নাড়তে আসতেন। হুডখোলা গাড়িতে প্রথম প্রধানমন্ত্রীর এই সফর পরাধীনমুক্ত ভারতের অহংকারের এক প্রতীক হয়ে উঠেছিল সেসময়। পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রী ও ইন্দিরা গান্ধীও বিশ্বভারতীর সমাবর্তনে যোগ দিতে এলে হুডখোলা গাড়িতেই আসতেন।
সময়টা ১৯৬১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি। কলকাতায় এসেছেন ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ। সেদিন হুডখোলা গাড়িতে চেপে রাজপথ ধরে রাজভবনে গিয়েছিলেন রানি। তাঁকে দেখতে গোটা কলকাতা উজাড় হয়ে গিয়েছিল রাস্তার দু’পাশে। সেই ভিড়ে দাঁড়িয়েছিলেন বছর দশেকের অমর মিত্র। পরে তিনি হয়ে ওঠেন নামকরা সাহিত্যিক। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অমরবাবু একবার বলেছিলেন, ‘তখন আমার বালক বয়স। রাজা-রানিদের গল্প বইতেই পড়েছি। কোনোদিন তো চাক্ষুষ দেখিনি। সেদিন বেলগাছিয়া ব্রিজের কাছে আমাকে নিয়ে গিয়েছিল কোনো এক দাদা। লোকে লোকারণ্য রাস্তার দু’'দিক। মাঝে মাঝে পুলিশের গাড়ি আর মোটরসাইকেল ঘুরছিল। অবশেষে দেখা দিল রানির গাড়ি। আজকাল তো ভিভিআইপিদের নিরাপত্তার এত কড়াকড়ি যে, সাধারণ মানুষ তাঁদের চোখের দেখাও দেখতে পান না! তবে রানির গাড়ি ছিল হুডখোলা। রাস্তায় দাঁড়ানো মানুষের দিকে তিনি সমানে হাত নাড়ছিলেন। শ্যামবাজার, সেন্ট্রাল এভিনিউ হয়ে রানির সেই হুডখোলা গাড়ি পৌঁছেছিল রাজভবনে।’ কলকাতায় আসার আগে রানি গিয়েছিলেন দুর্গাপুর স্টিল প্ল্যান্টে। তাঁর বিশেষ উড়ান পানাগড় বিমানঘাঁটিতে নামে। সেখান থেকে তিনি দুর্গাপুর পৌঁছেছিলেন হুডখোলা গাড়িতে।
সালটা ১৯৭১। সপ্তাহখানেক আগে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শেষ হয়েছে। জাতীয়তাবোধের আবেগে ভাসছে গোটা দেশ। ঠিক সেই সময় পুনের রাজভবনে হুডখোলা গাড়িতে চেপে এসেছিলেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। রাস্তার দু’পাশে উদ্বেল জনতার জয়ধ্বনি। প্রধানমন্ত্রীও উন্মুক্ত গাড়িতে দাঁড়িয়ে জয়ধ্বনিকে সম্মান জানিয়ে হাত নাড়ছেন। করজোড়ে নমস্কার করছেন। স্বাধীনতার পর বাংলার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ কংগ্রেসের কোনো রাজনৈতিক প্রচার কর্মসূচিতে হুডখোলা গাড়ি ব্যবহার করতেন না। সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছিলেন বিধানচন্দ্র রায়ও। সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় অবশ্য প্রচার কিংবা সমাবেশে গেলে মাঝেমধ্যে হুডখোলা গাড়ি ব্যবহার করতেন বলে জানা যায়। মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুকে হুডখোলা গাড়িতে চড়ে দলীয় প্রচারে কিংবা রোড শো করতে দেখা যায়নি। তখন সিপিএমের কাছে হুডখোলা গাড়িতে প্রচার কিংবা মনোনয়ন পেশ করা ছিল আদর্শের পরিপন্থী। ন’য়ের দশকের প্রথমার্ধ। কাকদ্বীপে সিপিএমের জনসভায় প্রধান বক্তা ছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। সাধারণ অ্যাম্বাসডরে যাওয়ার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু, গাড়ির চালক মহম্মদ ওসমান প্রস্তাব দিলেন হুডখোলা গাড়িতে যাওয়ার। সেই প্রস্তাব মেনে নিলেন বুদ্ধবাবু। সেই প্রথম তিনি হুডখোলা গাড়িতে চড়লেন। এরজন্য বুদ্ধবাবুকে তুলোধোনা করে ছেড়েছিল সংবাদমাধ্যমগুলি। এমনকি, পার্টির কাছে তাঁকে জবাবদিহিও করতে হয়েছিল। তবে, সমালোচিত হলেও তিনি অন্তত বুঝেছিলেন, উন্মুক্ত গাড়িতে গেলে সাধারণ মানুষের সঙ্গে একটা আলাদা সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়। সেদিন কাকদ্বীপ যাওয়ার পথে বহু মানুষ রাস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে বুদ্ধবাবুকে অভ্যর্ত্থনা জানিয়েছিলেন। পরে মুখ্যমন্ত্রী হয়ে বহু জনসভা, রোড শো তিনি করেছেন হুডখোলা গাড়িতে। বলতে দ্বিধা নেই, আজ সিপিএমের একাধিক নেতা-নেত্রী হুডখোলা গাড়িতে যে নির্বাচনি প্রচার কিংবা মনোনয়ন দাখিল করতে যান, সেটা বুদ্ধদেববাবুর দেখানো পথেই।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে হুডখোলা গাড়িকে জনসংযোগের মাধ্যম হিসাবে খুব বেশি প্রাধান্য দেননি। তিনি বেশি স্বচ্ছন্দ পদযাত্রায়। এই বয়সেও দু’-তিন কিলোমিটার পথ অনায়াসেই হেঁটে চলেন। সেদিন দুর্গাপুরের সভা থেকে অমিত শাহর বৈভবপূর্ণ রোড শো-কে কটাক্ষ করে বলেছিলেন, ‘ওরা গাড়িতে রোড শো করেন। আমি এখনও হেঁটেই মানুষের সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক গড়ে তুলি।’ একথা ঠিক, গণদেবতার সঙ্গে একাত্ম হতে হুডখোলা গাড়ি কখনোই পদযাত্রার বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি। তা হলেও ইদানীং কর্পোরেট ভোট-ভাবনায় হুডখোলা সব দলের কাছে আইকনিক প্রচারশৈলির মাধ্যম হয়ে উঠেছে। রাজা-জমিদারদের অহংবোধের প্রতীক হুডখোলার সাফল্য বোধহয় এখানেই। ভিন্টেজ হয়েও হয়নি সে ভিন্টেজ!