Bartaman Logo
৩০ মে, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বাংলায় অধিকার রক্ষার ভোট হয়েছে বারংবার

স্বাধীনতার পর যখন ভারতে নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, সেই সময় থেকেই  বিগত ৭৪ বছরে বাংলায় সরকার বদল হয়েছে প্রবল রাগের কারণে এবং অধিকার রক্ষার আকুলতায়।

বাংলায় অধিকার রক্ষার ভোট হয়েছে বারংবার
  • ১ মে, ২০২৬ ০৯:০৫

সমৃৃদ্ধ দত্ত: স্বাধীনতার পর যখন ভারতে নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, সেই সময় থেকেই  বিগত ৭৪ বছরে বাংলায় সরকার বদল হয়েছে প্রবল রাগের কারণে এবং অধিকার রক্ষার আকুলতায়। প্রত্যেক বদলের ইতিহাসে রয়েছে একটি করে জ্বলন্ত ইস্যু। যা শাসক সরকারের পতন ঘটিয়েছে। ১৯৬৭ সালে প্রথম কংগ্রেস সরকারের পতন ঘটেছিল। কী ছিল সেই কারণ? প্রথমত ১৯৬৬ সালের খাদ্য আন্দোলন। চাল এবং কেরোসিনের প্রবল অভাবে চরম দুর্দশায় পড়েছিল রাজ্যবাসী। কিন্তু খাদ্য আন্দোলন তো ১৯৫৯ সালেও হয়েছে। তাহলে ১৯৬২ সালের ভোটে কেন সরকার বদল হল না? কারণ, ১৯৫৯ সালে বাংলায় যে খাদ্য আন্দোলন হয়েছিল, সেটি সীমাবদ্ধ ছিল কলকাতা ও সংলগ্ন অঞ্চলে। অর্থাৎ শহুরে এলাকায় আবদ্ধ ছিল আন্দোলনের রূপরেখা। কিন্তু ১৯৬৬ সালে আবার যখন খাদ্য আন্দোলন শুরু হল, সেই আন্দোলন দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল জেলা, গ্রাম, মফস্‌স঩লে। ফলে বৃহত্তর সংখ্যার সাধারণ মানুষ জড়িয়ে পড়ে ওই বিক্ষোভ আন্দোলনে। চালের দাম ৫ থেকে ৮ টাকায় পৌঁছে যায় প্রতি কেজিতে। আন্দোলনকে চরম এক ক্ষোভ ও ক্রোধের পর্যায়ে নিয়ে গেল বসিরহাটে পুলিশের গুলিতে ১২ বছরের কিশোর নুরুল ইসলামের মৃত্যু। মুখ্যমন্ত্রী মানুষের খাদ্যের হাহাকারকে বিদ্রুপ করে গম রুটি ও বেগুন খাওয়ার নিদান দিয়েছিলেন। যা এক প্রবল রাগের জন্ম দেয়। সাধারণ, যে কোনো রাজনৈতিক নেতা ও উচ্চ পদাধিকারীদের সবথেকে বড়ো পরীক্ষা হল ক্রাইসিসের সময় তাঁরা কীভাবে আচরণ করছেন। কী ধরনের বাক্য অথবা শব্দ বলছেন। সতর্ক থাকতে হয় যাতে তাঁর একটি শব্দ বা মন্তব্য আগুনকে আরও ছড়াতে না সাহায্য করে। কিন্তু বহু ক্ষেত্রে দেখা যায় সেটি পালন করতে পারে না শাসক। ফল হয় নেতিবাচক। আবার এই সঙ্গেই কংগ্রেস ভেঙে গিয়ে আগেই তৈরি হয়েছে বাংলা কংগ্রেস। সুতরাং এই দুই ধাক্কার যোগফলে ১৯৬৭ সালে কংগ্রেস পরাজিত হল। পাশাপাশি উদ্বাস্তুদের পাশে আগেই দাঁড়িয়ে এবং খাদ্য আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে সিপিএম নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ শক্তিশালী করে ফেলল। বাঙালির এই ভোটযুদ্ধ ছিল খাদ্যের অধিকার আদায়ের লড়াই। সেই প্রথম হল সরকার বদল। 

Advertisement

১৯৭৭ সালে ছিল প্রথমত দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা জারির বিরুদ্ধে এক ইন্দিরা গান্ধী বিরোধীরা হাওয়া। জরুরি অবস্থার অর্থ হল, মৌলিক অধিকারে হস্তক্ষেপ। সংবিধান লঙ্ঘন। এবং জনজীবনে পুলিশরাজ। তার সঙ্গেই ছিল ১৯৭২ সালে পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ভোটে রিগিং কারচুপি সন্ত্রাসের অভিযোগ। সুতরাং ভোটের অধিকার, মৌলিক অধিকার, দুই অধিকারই ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই রাগ কংগ্রেসের উপর জমা হয়েছিল। সেই রাগের প্রবল প্রতিফলন ১৯৭৭ সালে বাংলায় পালাবদল। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার রক্ষার লড়াই ছিল সাতাত্তরের ভোট। 
২০১১ সালে গ্রামীণ বাংলায় একটি প্রবল আতঙ্কবার্তা চলে গেল যে, সিপিএম আবার ক্ষমতাসীন হলে  জমি কেড়ে নেওয়া হবে। যে ব্যক্তি সাতের দশকে ডিওয়াইএফআইয়ের সম্মেলনে বলেছেন, মানুষের সবথেকে বড়ো শত্রু হল পুঁজি। টাটা বিড়লাদের মতো পুঁজিবাদের বিরুদ্ধাচারণ করতেই হবে, সেই মানুষই মুখ্যমন্ত্রী হয়ে ২০০৬ সালের পর থেকে সেই পুঁজিবাদী শিল্পপতিদের হাতে কৃষিজমি তুলে দেওয়ার পক্ষে সওয়াল করেছিলেন। শিল্পের পক্ষে সওয়াল করার পদ্ধতিটা‌ই ঩ছিল ভুল। আবার সেই একই কথা। বাক্য ব্যবহার, শব্দ প্রয়োগ, মন্তব্যকে আরও সতর্ক ও নম্র হওয়া যখন দরকার ছিল, সেই মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সেটি পালনে ব্যর্থ হয়েছিলেন। তাই গ্রামবাংলায় জমি রক্ষার অধিকার আদায়ের লড়াই শুরু হয়েছিল। সেই সুযোগটি তৃণমূল কংগ্রেস নিয়ে গ্রামীণ মানুষের আবেগে ভর করে বিপুল ভাবে জয়ী হয়ে ক্ষমতাসীন হয়। বামফ্রন্ট সরকারের পতন হয়। ২০১১ সাল ছিল জমি রক্ষার লড়াই এবং জমি কেড়ে নেওয়ার আশঙ্কায় রাগের ভোট। 
২০২৬ সালে সম্পূর্ণ অন্যরকম এক ভোটের অভিমুখ তৈরি হল। এরকম কোনো ইস্যুই ছিল না। শাসকের বিরুদ্ধে খাদ্য আন্দোলন, সাংবিধানিক  অধিকার হরণের বিরুদ্ধে ক্রোধ, জমি দখলের বিরুদ্ধে আন্দোলন কিছু‌ই  ছিল না বিরোধীদের কাছে। কিন্তু এমতাবস্থায় নির্বাচন কমিশন বিজেপির প্রত্যক্ষ 
মদতে এসআইআর নিয়ে এল। আর সেটাই হয়ে গেল একটি ইস্যু। কী  ইস্যু? পরিচয় রক্ষার ইস্যু। 
দেশছাড়া হয়ে যাওয়ার ভয়, নিজভূমে নিজের অধিকার থাকা না থাকার এক তীব্র আতঙ্ক, জীবনযাপনের অনিশ্চয়তা। আর এই থেকেই জন্ম নিয়েছিল রাগ। উৎখাত হতে হবে, জেলে যেতে হতে পারে, ভোটাধিকার চলে যাবে। এবং  কোনো স্বদেশি হিসেবে পরিচয়ই নেই। সমাজে তকমা দেওয়া হবে রোহিঙ্গা, ঘুসপেটিয়া। জেঠুকে বাদ দেওয়া হয়েছে, কাকুর নাম বাদ গিয়েছে, বিয়ে হয়ে যাওয়া মেয়ের নাম নেই, স্ত্রীর নাম বাদ, বাবা মায়ের নাম ঩নেই, বিশুদার নাম বাদ, সালাউদ্দিনের নাম নেই, আরিফা আপার নাম বাদ, শিল্পী দিদিমণির নাম বাদ।
এই অভিজ্ঞতাগুলি চরম এক ক্রোধ ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। সেই ক্ষোভ এবং রাগের সঙ্গে মিশ্রিত হয়েছে পরিচয় রক্ষার আকুলতা। যেভাবেই হোক এই প্রক্রিয়াকে আটকে দেওয়ার একটি অদম্য জেদ। অতএব হঠাৎ করেই ২০২৬ সালের প্রধান ইস্যু হয়ে গিয়েছে এসআইআর। ঠিক এটাই বড়োসড়ো বুমেরাং হয়ে গেল বিজেপির জন্য।
কেন বুমেরাং? কারণ প্রথম প্রথম বিজেপি এসআ‌ইআরের পক্ষে সওয়াল করেছে। কিন্তু ভোটপর্ব যতই এগিয়েছে, দেখা গিয়েছে তারা এড়িয়ে গিয়েছে এই তর্ক। পালটা যুক্তি দেখালেও সেটা খুব বেশি শক্তিশালী ছিল না।  তাই বাংলার ভোট ইতিহাসে একটি বিস্ময়কর বিপরীতমুখী প্রবণতার সূত্রপাত হল। ভোটের সময় এর আগে ইস্যু তৈরি হয়েছে সরকারের বিরুদ্ধে। এবার উলটো। বিরোধী দলের বিরুদ্ধে  ইস্যু তৈরি করেছে বিরোধী দল নিজেই। 
বাংলার ভোট ইতিহাস অনুযায়ী যদি সরকার বদল করতেই হয়, তাহলে নতুন একটি ইস্যু সৃষ্টি হওয়ার কথা ছিল শাসক তৃণমূলের বিরুদ্ধে। যেটা হয়েছিল ১৯৬৭, ১৯৭৭ এবং ২০১১ সালে। যে কোনো একটি ইস্যু হতে পারত। কিন্তু উলটে এসআইআর ইস্যু তৃণমূলের পক্ষে হয়ে গেল। বিজেপির বিপক্ষে চলে গেল। 
বিরোধী দলের বিপক্ষে কোনো ভোটে একটি নতুন ইস্যুর জন্ম হয়েছে, সেই ইস্যুতে বিরোধী দল কোণঠাসা হয়ে যাচ্ছে, এরকম ৭৪ বছরে কোনোদিন দেখা যায়নি। সেটাই এবার ঘটতে দেখা গেল। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পরিযায়ী শ্রমিকেরা ছুটে এল ভোট দেবে বলে। আগে এত পথ, এত টাকা, এত সময় নষ্ট করে সকলে তারা আসত না। এবার আসতে বাধ্য হল। কারণ ভোট না দিলে যদি পরে ভোটের নাম বাদ যায়! এই ভয় থেকেই তারা ভোট দিল। তাদের ডেকে এনেছে তাদের গ্রামে থাকা পরিবারই। সেই পরিবারের অনেকের নাম বাদ গিয়েছে। আর এভাবেই এই ভোটগুলি ছিল রাগের ভোট। পরিচয় রক্ষার ভোট। 
এর সঙ্গেই যুক্ত হয়েছে মহিলা, মুসলিম ভোটের একত্রীকরণ। এই দুই ভোটব্যাংকের সঙ্গে এসআইআর ইস্যু যুক্ত হওয়ায় আরও সংঘবদ্ধ হয়ে যায় তৃণমূলের ভোট। এখা঩নেই যে সমাপ্ত হয়ে গেল সমীকরণ এমন নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হল হিন্দুত্ব জাতীয়তাবাদ বনাম বাঙালিত্ব জাতীয়তাবাদ। হিন্দু বাঙালির একটি বড়ো অংশের ভোটই বিজেপি  বিগত ১৫ বছরে পায়নি। সেই ভোটের একটি অংশ না পেলে জয় সর্বদাই অধরা থাকবে। তাই হিন্দু বাঙালির উদ্দেশে একটি ন্যারেটিভ তৈরি করা হল যে, তোমরা আগে হিন্দু ভারতীয়, পরে বাঙালি। কিন্তু বাঙালির একাংশ সেটার বিরুদ্ধাচারণ করে পালটা যুক্তি দিল, আমরা গর্বিত বাঙালি। গর্বিত হিন্দু। আর জাতীয়তাবাদী কি না সেটা উচ্চকিত ঘোষণা করতে হবে না। একবার স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস আর সেলুলার জেলে নামের তালিকা দেখলেই হবে। 
 সুতরাং এই যে ভোটের যুদ্ধ দেড় মাস ধরে হয়ে গেল, সেটায় আবেগ, অঙ্ক এবং ক্যাশ ট্র্যান্সফারের বাস্তবতা একজোট হয়ে গেল। ২০২১ এবং ২০২৪ সালে যারা ভোটার ছিল, এবং যাদের নাম তালিকায় রয়েছে, তারাই কমবেশি ২০২৬ সালেও ভোট দিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই ভোটের প্যাটার্ন, তাদের সমর্থনের অভিমুখ কমবেশি একইরকম থাকবে। অর্থাৎ যে যাকে ভোট দিয়েছিল, তাকেই দিয়েছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন ভোটার। এই নতুন ভোটার কোন দলকে ভোট দিয়েছে সেটা যথেষ্ট কৌতূহলের। তবে এবার কংগ্রেস এবং সিপিএমের ভোট শেয়ার বৃদ্ধি পাবে। 
 ২০২৪ সাল পর্যন্ত তৃণমূল, সিপিএম, কংগ্রেসকে ভোট দিয়েছে যারা, তাদের একাংশ নতুন করে এবার বিজেপিকে ভোট দিয়েছে, এরকম কি আদৌ সম্ভব? রাজনীতি ও লজিকে? সম্ভব নয়। সেই কারণেই এবারও পরিবর্তনের সুযোগ নেই। কেন? কারণ, এবার ফ্যাক্টর ওই এসআইআরের রাগের ভোট। ‘‘অর্থাৎ সেই অধিকার রক্ষার লড়াই। এবার অধিকার-পরিচয়!’’

সম্পর্কিত সংবাদ