দীপন ঘোষাল, রানাঘাট: রামের নাম, এপিক নম্বর, বাবার নাম এমনকি জামা পর্যন্ত হুবহু এক। অথচ মুখের ছবি যদুর। কিন্তু, ওই ভোটার কার্ডের বর্তমান ‹মালিক› শ্যাম। বদলে গিয়েছে বিধানসভাও। অর্থাৎ একই ভোটার কার্ডে দু’জন ভোটার! রাম ২৫ বছর আগে ভোটার হলেও শ্যামের ভোট গত বছর থেকেই শুরু। আবার যদু সদ্য আঠারোয় পা দিয়েছে। এসআইআর লাগু হতেই সীমান্তঘেঁষা নদীয়া জেলায় ভোটার লিস্টে এহেন গরমিল ধরা পড়েছে। ইনিউমারেশন ফর্ম হাতে যখন দৌড়াদৌড়ি করছে মানুষ, তখন কার্যত অস্তিত্ব সঙ্কটে ভুগছেন কৃষ্ণনগরের বাসিন্দা ‘রাম’ তথা প্রকৃত ভোটার চয়ন সরকার।
বছর চল্লিশের চয়নবাবু বেসরকারি সংস্থার কর্মী। কৃষ্ণনগরের শক্তিনগরের বাসিন্দা। ২০০২ সালেও ভোটার লিস্টে তাঁর নাম ছিল। ভোটও দিয়েছেন। তাঁর বাবা চিত্তরঞ্জন সরকার সহ পিতৃপুরুষের ভিটেও ওখানেই। সম্প্রতি তাঁর ছাড়া বাড়ির বাকি সদস্যদের নামে ইনিউমারেশন ফর্ম দিয়ে যান বিএলও। তিনি বাদ গেলেন কেন কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানতে পারেন তাঁর নাম কৃষ্ণনগর পূর্ব থেকে রানাঘাট দক্ষিণ বিধানসভার দেবগ্রাম পঞ্চায়েতের একটি বুথের ভোটার লিস্টে রয়েছে। সেখানকার বিএলওকে ফোন করে ফর্ম চাওয়া হলে ওই বিএলও জানান, চয়নবাবুর নাম, বাবার নাম এমনকি ভোটার কার্ডের নম্বর মিললেও ছবি মিলছে না। তাই তিনি ইনিউমারেশন ফর্ম দিতে পারবেন না। এরপরই মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে চয়নবাবুর।
দেবগ্রামের ভোটার তালিকা ঘেঁটে তিনি জানতে পারেন তাঁর পরিচয় ব্যবহার করে সম্পূর্ণ অন্য এক ব্যক্তি ভোটার লিস্টে নাম তুলেছে। তাঁরই ভোটার কার্ড ব্যবহার করে তার ছবির জায়গায় অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তি নিজেকে চিত্তরঞ্জন সরকারের ছেলে চয়ন সরকার বলে ভোটার কার্ড তৈরি করেছে। দেখা গিয়েছে, ২০০২ সালের ৭৫ নম্বর কৃষ্ণনগর পূর্ব বিধানসভার ১৪১ নম্বর বুথের ৭৬২ নম্বর ক্রমিক সংখ্যায় নাম ছিল চয়নবাবুর। কিন্তু, ২০২৫ সালের ওই বুথের ভোটার তালিকায় চয়নবাবুর নামই নেই। অথচ ২০২২ সালের ভোটার তালিকা অনুযায়ী তাঁর নাম নথিভুক্ত রয়েছে। তাঁর এপিক নম্বর DMB2166700।
বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের পোর্টাল বলছে এই কার্ড নম্বরের ভোটার বা ঘোটালার ‹শ্যাম› এর বাবার নাম একই। বসবাস করে ৯০ রানাঘাট দক্ষিণ বিধানসভার দেবগ্রাম পঞ্চায়েতের ২৮০/৫২ নম্বর বুথে। এমনকী জামার রংও এক। শুধুমাত্র মুখের ছবি আলাদা। চয়নবাবু বলেন, আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি অসাধুচক্রের সহযোগিতায় ছবিতে থাকা ওই ব্যক্তি আমার পরিচয়পত্র ক্লোন করেছে। প্রশাসন উপযুক্ত পদক্ষেপ না নিলে আমি অস্তিত্ব সংকটে পড়ব। সরেজমিনে খোঁজ করে দেখা যায় অভিযোগকারীর দাবি একেবারেই অমূলক নয়। দেবগ্রামের ওই বুথে চয়ন সরকার নামে ‹শ্যাম› বসবাস করছিলেন। যদিও সম্প্রতি তাঁকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তবে তার এক মামা কৃষ্ণকান্ত চৌধুরীকে পাওয়া গেলেও তিনি জানান, সেটি তার বাংলাদেশ নিবাসী ভাগ্নের ছবি। কীভাবে এখানের ভোটার লিস্টে নাম উঠল তা তিনি জানেন না। আর এখানেই শুরু তৃতীয় কাণ্ড। গ্রামে গিয়ে খোঁজ করে জানা গেল, চয়নবাবুর নামের সঙ্গে যে ছবি ব্যবহার হয়েছে সেটিও শ্যামেরও নয়। ওই ছবি ঠিক পাশের বুথের বাসিন্দা ‹যদু› বা তথা সুবীর মণ্ডল নামে সদ্য আঠারোয় পা দেওয়া এক তরুণের। সুবীরের দাবি, সুপার ইম্পোজ করে তার ছবি ব্যবহার করা হয়েছে।. ‹শ্যাম› এর সঙ্গে তার মুখের মিল থাকায় তার মুখের ছবি বসানো হয়েছে। এর পিছনে যে বড়সড় চক্র রয়েছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
ইতিমধ্যেই কৃষ্ণনগর মহকুমা এবং রানাঘাট-২ ব্লক প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছেন আসল চয়ন সরকার। তাঁর অভিযোগের ভিত্তিতে রানাঘাট-২ ব্লকের বিডিও শুভজিৎ জানা বলেন, লিখিত অভিযোগ এখনও আমার হাতে আসেনি। এই ধরনের ঘটনা নিয়ে অভিযোগ আসলে অবশ্যই তা গুরুত্ব সহকারে দেখা হবে।