স্বামীজির বিশাল নেত্রের দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ ক’রে বলতেন, ‘দেখ, স্বামীজির চোখ দুটিতে কি করুণ বিষণ্ণতা।’ সত্যানন্দদেব অনুভব করতেন সমস্ত জগতের দুঃখে যেন অভিভূত হয়ে আছে সে দৃষ্টি। আর এ সব কথা বলতে বলতে তাঁর নয়নযুগলও হয়ে উঠত করুণার্দ্র। খুব ছোটবেলা থেকেই ভালবেসেছিলেন বিবেকানন্দকে। যখন ট্রাই-সাইকেলে চড়ে বেড়ান তখন একদিন কলকাতার বরেন লাইব্রেরীর প্রতিষ্ঠাতার কাছ থেকে স্বামীজির চিকাগো লেকচার দেওয়ার ছবিটি প্রথম পান। তখন থেকেই স্বামীজির ছবি বুকে নিয়ে বেড়াতেন। বলেছেন, ‘সেই থেকেই ধীরে ধীরে স্বামীজির প্রভাব আমার ওপর এসে পড়েছে’।
ছাত্রাবস্থায় সাধনকালে কাশীপুর মহাশ্মশানে ও দক্ষিণেশ্বরে ধ্যানমগ্ন হয়ে থেকেছেন যেমন, তেমনি বেলুড়ে বিবেকস্বামীর সমাধি মন্দিরের পাদমূলেও জপময় হয়ে কেটেছে কত কত দিন। পরবর্তীকালে জগদ্গুরুরূপে সন্তানদেরও মনে জোর বাড়াবার জন্য বলছেন, “স্বামীজির ছবি ও বাণীর বই পকেটে রাখবি। স্বামীজির বই পড়বি। স্বামীজির বই পড়লে বেশ শক্তি পাওয়া যায়। ‘হে ভারত, ভুলিও না, তোমার নারীজাতির আদর্শ সীতা, সাবিত্রী, দময়ন্তী…মা, আমার দুর্বলতা কাপুরুষতা দূর কর, আমায় মানুষ কর।’…ইত্যাদি কথা যেন মন্ত্র। ছাত্রজীবনে দেখতাম বিপ্লবীদের এক পকেটে থাকতো স্বামীজির বাণী—‘Awake arise stop not till the goal is reached.’ অন্য পকেটে থাকতো revolver.’ ভারত স্বাধীন হওয়ার মূলে স্বামীজির অবদান অনেকটাই। স্বদেশবাসীর উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, ‘আগামী পঞ্চাশ বছর দেশমাতৃকাই তোমাদের একমাত্র উপাস্য’।”
শুধু স্বামীজির বই পড়া নয়, তাঁর বিষয়ে সৃজনধর্মী কাব্য-সাহিত্য সৃষ্টি করারও প্রেরণা দান করেছেন তাঁর সন্তানদের। আশ্রমের সাধু সন্তান ও সন্ন্যাসিনী মায়েরা তাঁরই প্রেরণায় স্বামীজির জীবনবেদ অবলম্বনে লিখেছেন কত প্রবন্ধ, নাটক, জীবনীগ্রন্থ, কবিতা ও গান। আশ্রমিকদের দ্বারা অভিনীত শ্রীঅর্চনা মার “বীর সন্ন্যাসী” নাটকের অভিনয় সর্বত্র দর্শকমণ্ডলীকে করেছে অভিভূত। বিবেকানন্দের ভাবধারা প্রচারের জন্য শ্রীঠাকুর নিজেও রচনা করেছেন অজস্র প্রবন্ধ, গীতি-আলেখ্য, ইংরাজী ও বাংলা কবিতা এবং গান। ‘স্বামীজির কবিপ্রতিভা’ তাঁর একটি অসাধারণ রচনা। প্রবন্ধটির অংশবিশেষ এখানে উদ্ধৃত করার লোভ সম্বরণ করতে পারলাম না—“মহাকবি মিল্টনের কবিতায় এক বিশেষ গাম্ভীর্য ও মহনীয়তা পাই; তিনি যে সে যুগে ইংলণ্ডের এক বিরাট পুরুষ ছিলেন, কবিতায় তার ছায়া পড়েছিল। স্বামিপাদের জীবন-কবিতা এ বিষয়ে হিমালয়ের সঙ্গে তুলনীয়। ‘সন্ন্যাসীর গীতি’ প্রভৃতি কবিতা যেন অভ্রভেদী হিমরাজের কথাই মনে পড়িয়ে দেয়। ইংলণ্ডে কবি মিল্টনকে যদি বলা সার্থক হয়ে থাকে—The soul was like a star, তবে আমরাও শ্রীঠাকুরের অনুভূতির কথা নিয়ে বলতে পারি—স্বামীজি ছিলেন সপ্তলোকের সাতসায়র সেঁচা ধন। জীবনবেদে, কবিতায় বা কাব্যে তার ক্ষীণ আভাস মাত্রই জগৎ পেয়ে আজ ধন্য—উপনিষদের ভাষায় অভীমন্ত্রের ঋষিকে বলি—‘যতো বাচো নিবর্তন্তে অপ্রাপ্য মনসা সহ’।” মনে পড়ে নৈহাটী থেকে যখন ঠাকুরের কাছে যাওয়া আসা করতাম তখন প্রায়ই সকালের আরতিতে শুনতাম শ্রীঅর্চনা মায়ের সুমধুর দিব্যকণ্ঠে ও সুরে বিবেক স্বামীর ওপর শ্রীঠাকুরের লেখা একটি গান—‘আলোর দেশের মানুষ তুমি এ দেশ তোমার নয়/ সাতটি তারার সাতটি ঋষি তোমার কথাই কয়।’
স্বামী হীরানন্দের ‘আলোর দেবতা সত্যানন্দ’ থেকে