অগ্নিভ ভৌমিক, কৃষ্ণনগর: বাংলা সাহিত্যের জগতে দু’জনই প্রথিতযশা ব্যক্তিত্ব—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও দ্বিজেন্দ্রলাল রায়।একে অপরের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীলও ছিলেন। কিন্তু হঠাৎ কি এমন ঘটল যে, দু’জনের সম্পর্ক অম্ল-মধুর হয়ে উঠল? কেনই বা আড়াআড়ি ভাগ হয়ে গেলেন সাহিত্যের দুই তারকার ভক্তগণ? সেটা নিজেও বুঝতে পারছিলেন না স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘আমাদের জীবনে অনেক সময়ে সেই ভুল-বোঝার আঁধি কোথা হইতে আসিয়া পড়ে তাহা বলিতেই পারি না।’ তবে, দু’জনকে নিয়ে যাঁরা গবেষণা করেছেন, তাঁরা সম্পর্কের চিড় ধরার নেপথ্যে ‘ভিলেন’ হিসেবে খাঁড়া করেছেন বর্ষা ঋতুকে।
কবিগুরুর প্রিয় ঋতু বর্ষা। তাকে ঘিরেই তিনি লিখে ফেললেন ‘সোনারতরী’। কৃষিভিত্তিক সেই কবিতায় রবীন্দ্রনাথ লিখলেন, ‘কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা...।’ পত্রপাঠ দ্বিজেন্দ্রলাল এই লাইনের সমালোচনা করে বসলেন। কবি হলে তুখোড় বাস্তববাদী ছিলেন তিনি। ‘প্রবাসী’র এক প্রবন্ধে কটাক্ষ করে লিখলেন, ‘কৃষক ধান কাটিতেছেন বর্ষাকালে! শ্রাবণ মাসে! বর্ষাকালে ধান কেহই কাটেনা।বর্ষাকালে ধান রোপন করে।’ রবি ঠাকুর যুক্তিনিষ্ঠ এমন সমালোচনার বিরুদ্ধে কোনও শব্দ খরচ করেছেন বলে নজির নেই বাংলা সাহিত্যে। কিন্তু, রবীন্দ্র অনুরাগীরা দ্বিজেন্দ্রলাল রায়কে দাগিয়ে দিলেন কবিগুরুর কট্টর সমালোচক বলে। ছেড়ে কথা বললেন না দ্বিজেন্দ্র-ভক্তরাও। সেই শুরু। তারপর কবিগুরু রচনা করলেনকালজয়ী কাব্য‘চিত্রাঙ্গদা’।সাড়া পড়ে গেল গোটা বাংলায়। কিন্তু, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় রবীন্দ্রনাথের এই সৃষ্টির বিরুদ্ধে সমালোচনায় সরব হয়ে সাহিত্য জগতে আলোড়ন ফেলে দিলেন। রবীন্দ্র অনুরাগী ললিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় বিষয়টিকে এভাবে দেখলেন— ‘রবীন্দ্রনাথের যশ সূর্য্যের কালমেঘরূপ দ্বিজেন্দ্রলাল রায়সাহিত্য আকাশে উদিত।’
অথচ, কবিগুরু নিজেই বলেছেন, ‘দ্বিজেন্দ্রলাল যখন বাংলার পাঠকসাধারণের নিকট পরিচিত ছিলেন না তখন হইতেই তাঁহার কবিত্বে আমি গভীর আনন্দ পাইয়াছি এবং তাঁহার প্রতিভার মহিমা স্বীকার করিতে কুণ্ঠিত হই নাই।’ আবার দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ও তাঁর ‘বিরহ’ নাটকটি উৎসর্গ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথকে। দ্বিজেন্দ্রলালের হাসির গানে গলা মেলাতেন রবীন্দ্রনাথও। কিন্তু, স্রেফ দু’জনের অনুগামীরাই তাঁদের বিরোধকে জিইয়ে রেখেছিলেন বলে গবেষকদের মত। ১৮৯৯ সালের ২৬ জুন। শিলাইদহে অবস্থান করছেনরবীন্দ্রনাথ।আচমকা তাঁর কাছে চলে আসেন কুষ্টিয়ার পদস্থ আধিকারিক দ্বিজেন্দ্রলাল রায়। সেই সময় জমিদার রবীন্দ্রনাথ চাষিদের আর্থিক উন্নতির কথা ভেবে আলুচাষের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। দ্বিজেন্দ্রলাল বিলেতফেরত কৃষিবিদ হিসেবে রবি ঠাকুরকে সহায়তা করেন আলুর বীজ এনে দিয়ে।
১৯১৩ সালে ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থের জন্য নোবেল পুরস্কার পান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।ওই বছরই মৃত্যু হয় দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের। তৎকালীন দেশ পত্রিকার সম্পাদক বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায় দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের স্মৃতিতে বার্ষিক সভা উপলক্ষে কবিগুরুর থেকে একটি লেখা চেয়েছিলেন। রবি ঠাকুর প্রত্যুত্তরে লিখেছিলেন, ‘একথা সর্বজনবিদিত যে দ্বিজেন্দ্রলাল রায় দীর্ঘকাল ধরে নিরবিচ্ছিন্ন তীব্রতার সঙ্গে আমার সম্বন্ধে কটূক্তি বর্ষণ করে এসেছেন...। তাঁর সম্বন্ধে আমার মনে কোনও ক্ষোভ নেই। কিন্তু তবু যদি তাঁর স্মরণ সভায় প্রশস্তিবাদ করতে যাই, সেটা আমার পক্ষে দাক্ষিণ্যের অহংকার প্রকাশের মত দেখাবে। তিনি বেঁচে থাকলে সেটা তাঁর প্রীতিকর হতো না।...।’ কৃষ্ণনগরের প্রবীণ বাসিন্দা সঞ্জিত দত্ত বলছিলেন, ‘অনুগামীদের ইন্ধনেই কবিগুরুর সঙ্গে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের সম্পর্কে তিক্ততা বেড়েছিল।
কৃষ্ণনগর শহরেই জন্মেছিলেন দ্বিজেন্দ্রলাল রায়। শহরের একাধিক স্থান ও রাস্তা তাঁর নামে নামাঙ্কিত। আবার শহরের প্রাণকেন্দ্র পোস্ট অফিস মোড়ে রয়েছে রবীন্দ্রনাথের মূর্তি ও তাঁর নামাঙ্কিত রাস্তা। দু’জনের নামের রাস্তা মিলেছে একটাই মোড়ে। এটাই কৃষ্ণনগরবাসীর অলঙ্কার। ফাইল চিত্র