Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

তামিলনাড়ুতে বিজয়-রথ

তিনি আর দশজন সুপারস্টারের চেয়ে আলাদা। ছবির প্রচারে সেভাবে দেখা যায় না। সাক্ষাৎকার দেন না বললেই চলে। পর্দার বাইরে তাঁর সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না

তামিলনাড়ুতে বিজয়-রথ
  • ৭ মে, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

মৃণালকান্তি দাস: তিনি আর দশজন সুপারস্টারের চেয়ে আলাদা। ছবির প্রচারে সেভাবে দেখা যায় না। সাক্ষাৎকার দেন না বললেই চলে। পর্দার বাইরে তাঁর সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না। সোশ্যাল মিডিয়ায় যোগ দিয়েছেন মাত্র বছর কয়েক আগে। সেখানেও তাঁর উপস্থিতি অনিয়মিত। মাত্র এক বছর আগে সেই বিজয় যখন সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলেন, অনেকেই চমকে গিয়েছিলেন। রাজনীতি মানেই তো জনগণের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ, বক্তৃতা, সাধারণ মানুষের কাছে যাওয়া। প্রশ্ন উঠেছিল, নিজেকে একরকম খোলসবন্দি করে রাখা বিজয় কি রাজনীতির ময়দানে হিরো হতে পারবেন?

Advertisement

উত্তর পেয়ে গিয়েছে গোটা দেশ। বিধানসভা নির্বাচনে বিরাট সাফল্যের পর নিশ্চিত অনেকেই, তিনিই তামিলনাড়ুর পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী। সিনেমার নায়ক থেকে মুখ্যমন্ত্রী— চন্দ্রশেখর জোসেফ বিজয়ের জীবন যেন সিনেমার মতোই। ভক্তরা তাঁকে যে ‘থালাপতি’ বলেন, সেটা তামিল চলচ্চিত্রে তাঁর সাফল্যের কারণেই। তামিল ভাষায় থালাপতি অর্থ নেতা। বলা বাহুল্য, ভক্তদের দেওয়া ওই নামের জোরেই রাজনীতির পথে এগিয়েছেন বিজয়। থালাপতির দলের নাম ‘টিভিকে’ বা ‘তামিলাগা ভেট্টরি কাজাগাম’। বাংলায় যার অর্থ ‘তামিলনাড়ুর বিজয়ী মোর্চা’। মাত্র দুই বছর আগে আত্মপ্রকাশের পর যে দল বড়ো সমাবেশ করেছে মাত্র দু’টি। আর তাতেই বিরাট সাফল্য!
পাঁচবারের মুখ্যমন্ত্রী করুণানিধির মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে স্ট্যালিনের নেতৃত্বে ডিএমকে টানা এক দশক রাজ্য শাসন করেছে। তাদের উল্লেখযোগ্য সাফল্যও রয়েছে। সমাজকল্যাণমূলক প্রকল্প চালু করে মহিলাদের আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি থেকে শুরু করে তামিলনাড়ুর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হওয়া ‘দ্রাবিড়ীয় মডেল’কে শক্তিশালী করেছে ডিএমকে। অন্যদিকে ব্যর্থতাও কম নয়, বিশেষ করে দুর্নীতি ও আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রে। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে যে স্বেচ্ছাচারিতা তৈরি হয়, তার স্পষ্ট উদাহরণ ২০২০ সালে সান্থাকুলামে বাবা-ছেলে জয়রাজ ও বেনিক্সের পুলিশ হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর ঘটনা। এই ঘটনায় সম্প্রতি একটি দায়রা আদালত ন’জন পুলিশকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। ডিএমকে রাজ্যের তামিল পরিচয়ের বিষয়ে যত বেশি মনোযোগ দিয়েছে, তার সিকিভাগও চাকরি ও আইনশৃঙ্খলার মতো বাস্তব সমস্যায় দেয়নি। ফলে ডিএমকে ক্রমশ জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। শিক্ষানীতিতেও তাদের ব্যর্থতা স্পষ্ট। সেই অসন্তোষকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে থালাপতি বিজয়ের টিভিকে। একইসঙ্গে ভোট প্রচারে বিজেপি-কে ‘নীতিগত শত্রু’ বলে দাবি করেছেন বিজয়। যদিও তামিলনাড়ুর জন্য বিকল্প কোনো দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার সুযোগ তারা খুব কমই পেয়েছে। তবুও যুব সমাজ চিরাচরিত রাজনৈতিক দলগুলির বাইরে বিজয়কেই বিকল্প হিসেবে বেছে নিয়েছে।
ভোটের ফলাফলে মোট ২৩৪ আসনের তামিলনাড়ু বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ১১৮টি আসন। কিন্তু কোনো দল বা জোটই তা পায়নি। চিত্রতারকা বিজয়ের টিভিকে ১০৮টিতে জিতে একক বৃহত্তম দল হয়েছে। ডিএমকে-কংগ্রেস-বাম জোট ৭৪ এবং এডিএমকে-বিজেপি জোট ৫৩টি জিতেছে। ডিএমকে এককভাবে ৫৯টি আসনে জিতলেও দলের প্রধান তথা বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী স্ট্যালিন পরাজিত। তাঁর সহযোগী কংগ্রেস জিতেছে পাঁচটিতে। অন্যদিকে, এডিএমকে ৪৭ এবং তার সহযোগী বিজেপি একটিতে জিতেছে। তাদের আর এক সহযোগী পিএমকে পেয়েছে চারটি। শেষ খবর পর্যন্ত জানা গিয়েছে, সরকার গঠন করতে আরও ১০ বিধায়কের খোঁজে বিজয়-বার্তা পৌঁছে গিয়েছে কংগ্রেসসহ বামদলগুলির কাছে।
আসলে তামিলনাড়ুতে চলচ্চিত্র আর রাজনীতি যেন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। রুপোলি পর্দার জনপ্রিয়তা প্রায়ই মানুষকে টেনে আনে রাজনীতির মঞ্চে। একসময় যাঁরা নায়ক-নায়িকা হিসেবে দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন, পরে তাঁরা হয়ে ওঠেন লাখো মানুষের রাজনৈতিক আশ্রয়। দর্শকরা হয়ে ওঠেন একান্ত নিজস্ব ভোটার। তবুও বলতেই হবে, থালাপতি বিজয়ের সঙ্গে কোনোভাবেই বিখ্যাত তামিল অভিনেতা এম জি রামচন্দ্রনের তুলনা চলে না। এমজিআর ছিলেন ঘোর আদর্শবাদী। তিনি সি এন আন্নাদুরাইয়ের শিষ্য এবং দ্রাবিড় রাজনীতির অগ্নিপরীক্ষায় গড়ে উঠেছিলেন। অন্যদিকে, থালাপতির আদর্শগত গুরু ই ভি রামস্বামী পেরিয়ার। পেরিয়ার হলেন দক্ষিণের আম্বেদকর, বর্ণবাদবিরোধী সামাজিক গুরু। ১৯৭৭ সালে ক্ষমতায় আসার সময় এমজিআরের রাজনৈতিক ও সমাজসেবামূলক কাজের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ছিল। তামিল চলচ্চিত্র সেই ভাবমূর্তিকে আরও শক্তিশালী রূপ দেয়। এম জি রামচন্দ্রন অভিনেতা হিসেবে যে ভক্তকুল পেয়েছিলেন, তাঁদের ভালোবাসাকে রাজনীতিতে রূপান্তরিত করতে পেরেছিলেন। পরে জনকল্যাণমূলক কাজ করে ভোটারদের সঙ্গে আবেগের সম্পর্ক তৈরি করেছিলেন। তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা করেছিলেন তিনি। এর পর থেকে কোনো অভিনেতাই লাখ লাখ ভক্ত নিয়েও নির্বাচনের সেই শেষ বৈতরণি পার হতে পারেননি। এমনকি জয়ললিতার মতো বড়ো তারকাও নিজে কোনো নতুন দল গড়ে মুখ্যমন্ত্রী হননি। তিনি এমজিআরের গড়া দল আন্না দ্রাবিড় মুনেত্রা কাজাগামের (এডিএমকে) উত্তরাধিকারী হয়ে দলকে আরও সুসংহত করে এবং শেষপর্যন্ত নিজের একক নিয়ন্ত্রণে এনে মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন।
সেই প্রেক্ষাপটে থালাপতির উত্থান অবাক করার মতোই। তাঁর রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা নেই। বিজয় তাঁর ভক্তদের একজোট করার কাজ শুরু করেছিলেন ২০০৯ সাল থেকে। তখন তাঁর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ফ্যান ক্লাবগুলিকে ‘বিজয় মাক্কাল ইয়াক্কাম’ নামে একটি সংগঠনের পতাকাতলে নিয়ে আসেন। শুরুতে তারা শুধু সমাজসেবা ও জনকল্যাণমূলক সংগঠন হিসেবে কাজ করত। ২০১১ সালে সেই সংগঠন এডিএমকে নেতৃত্বাধীন জোটকে সমর্থনও জানায়। সেটাই ছিল বিজয়ের প্রথম সরাসরি কোনো রাজনৈতিক পক্ষে যোগ দেওয়া। তিনি মূলত দেখতে চেয়েছিলেন, তাঁর তারকা খ্যাতি দিয়ে ভোট টানা যায় কি না। ২০১৯ সালে ‘নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন’ (সিএএ) নিয়ে তাঁর সমালোচনা ইঙ্গিত দিয়েছিল, তিনি চলচ্চিত্রের গণ্ডির বাইরে নিজের অবস্থান তৈরি করতে চান। ২০২০-এর দশকের শুরুর দিকে সিনেমার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বিজয়ের উপস্থিতি ও কথাবার্তায় রাজনৈতিক বার্তা থাকতে শুরু করে। বিজয়ের সিনেমার অডিও লঞ্চ, ভক্তদের সঙ্গে সভা এবং নানা সমাজসেবামূলক অনুষ্ঠানে পরীক্ষার চাপ, তরুণদের বেকারত্ব, দুর্নীতি ও সুশাসনের মতো বিষয়গুলি বেশি বেশি করে আলোচনা হতে থাকে। গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের প্রতি বৈষম্যের অভিযোগ তুলে নিট পরীক্ষা নিষিদ্ধ করার আহ্বানও জানিয়েছেন। তাঁর কথা নতুন ভোটার ও শহরের তরুণদের গভীরভাবে নাড়া দেয়।
অবশেষে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিজয়ের রাজনৈতিক দল তামিলাগা ভেট্রি কাজাগাম (টিভিকে) আত্মপ্রকাশ করে। বিজয় জানিয়ে দেন, ২০২৬ সালের নির্বাচনে তাঁর দল একাই লড়বে। ভোটের আগে তারা কারও সঙ্গে জোট বাঁধবে না। রাজ্যের বড়ো দুই দল ডিএমকে ও এডিএমকের বাইরে তারা একটি পরিচ্ছন্ন বিকল্প হিসেবে দাঁড়াতে চায়। তবে সৎ প্রশাসনের একটি অস্পষ্ট ধারণার বাইরে তামিলনাড়ুর জন্য তাঁর পরিকল্পনা এখনও স্পষ্ট নয়। হয়তো সেই কারণেই কোনো এক্সিট পোল তাঁকে পাত্তা দিতে চায়নি। অথচ, সব হিসাব পালটে দিয়ে থালাপতির দল টিভিকে-ই এখন সরকার গঠনের দ্বারপ্রান্তে।
তামিলনাড়ুর রাজনীতি একাধিক দ্রাবিড়ীয় ধারার সঙ্গে জড়িত। এর স্বতন্ত্র ও গভীর সাংস্কৃতিক ভিত্তি বুঝতে প্রয়োজন নিমগ্ন চেতনা ও অঙ্গীকার, যা পূরণ করতে জনপ্রিয় নায়ক পর্যন্ত হোঁচট খান। রজনীকান্তের উচ্চাকাঙ্ক্ষার কথাই ধরা যাক। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর ব্যর্থ হয়ে তিনি শেষপর্যন্ত রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়িয়ে অভিনয় জগতে ফিরে গিয়েছেন। ‘সর্বজনীন নায়ক’ খ্যাত কমল হাসান অন্তত ‘মাক্কাল নিধি মাইয়াম’ দল গঠন করেছিলেন। কিন্তু ২০২১ সালের বিধানসভা এবং ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে দলটি একটি আসনও জিততে পারেনি। থালাপতির মতোই আরেকজন তারকা-রাজনীতিবিদ ছিলেন। তিনি ক্যাপ্টেন বিজয়কান্ত। ২০০৫ সালে তিনি ‘দেশিয়া মুরপোক্কু দ্রাবিড় কাজাগাম’ নামে নতুন দল গঠন করেন। তাঁর প্রধান রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল দুর্নীতিবিরোধী গণআন্দোলন। সেই ভাবাবেগের জোয়ারে দলটি ২০১১ সালে তামিলনাড়ুর দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়। তিনি বিরোধী দলের প্রধান নেতা হন। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষায় তিনি নিজেকে তামিল রাজনীতির কিংমেকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। কিন্তু এক দশকের মধ্যেই ব্যক্তিপুজো বা কাল্ট রাজনীতি এবং দ্বিতীয় সারির নেতৃত্বের অভাবে দলটি ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। থালাপতির দলের জন্য এই অভিজ্ঞতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর দল এখনও অনেকটাই সাধারণ ভক্তনির্ভর। বিশেষত তরুণ, যুব সমাজ। এর বাইরে বেরলেই রাজনীতি ও শাসনের আসল কাজ শুরু। সেটাই আসল পরীক্ষা।
বহুকাল তামিলভাষীদের বড়ো অংশ দু’টি দলের সমর্থক হিসেবে বিভক্ত। একটি দ্রাবিড় মুনেত্রা কাজাগাম (ডিএমকে) এবং অন্যদিকে এডিএমকে। ৫০ বছর ধরে তামিল সমাজে ও সেখানকার ভোটে এই দ্বিদলীয় মেরুকরণ চলছে। বিজেপি গোটা দেশে নিজ আধিপত্যের পরও তাতে চিড় ধরাতে পারেনি। ২০২৪ সালে লোকসভা নির্বাচনেও বিজেপি এখানে আসন পায়নি। আসনের ৩৯টাই পায় কংগ্রেস ও তাদের স্থানীয় মিত্র ডিএমকে ও বাম দলগুলি। থালাপতি বিজয়ের জয় তামিল রাজনীতির সেই দ্বিদলীয় ব্যবস্থায় জোর ধাক্কা দিয়েছে।
থালাপতির এই অভাবনীয় সাফল্য দেখায়, তামিলনাড়ুর অসন্তোষ টেরই পাননি অধিকাংশ বিশ্লেষক ও গবেষক। একদিকে দীর্ঘদিনের দ্বিদলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রতি মানুষের বিতৃষ্ণা, অন্যদিকে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক কল্পনা ও আকাঙ্ক্ষার প্রতি হতাশা। পুরানো রাজনীতি এখনও দ্রাবিড় আন্দোলনের পুরানো ভাষাতেই কথা বলে। ফলে একবিংশ শতকে সামাজিক ও গণতান্ত্রিক রাজনীতি কেমন হওয়া উচিত, সেই বিষয়ে নতুন আশা ও হতাশাকে পরিবর্তিত বাস্তবতায় বোঝার ক্ষেত্রে অন্য দলগুলি ব্যর্থ। সেই জায়গাতেই থালাপতির দলের চোখধাঁধানো সাফল্য। তবে এবারের নির্বাচনে টিভিকের সাফল্য নতুন এক রাজনৈতিক মডেলের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তা হল, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা জনসমর্থনও বড়ো ফল এনে দিতে পারে।
বিজয়ের উত্থান আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নকে সামনে এনেছে। আবেগের জায়গা থেকে মানুষকে এক করার মধ্য দিয়ে পাওয়া শাসনক্ষমতা কতটা টেকসই হবে? এ এক নতুন গবেষণাও বটে!

সম্পর্কিত সংবাদ