


বিতর্কটা ‘বাধ্য হওয়া’ বনাম ‘অজুহাত’-এর। কারণ যাই হোক, শেষ বিচারে ‘শিকার’ সেই আম জনতাই! গত আড়াই মাস ধরে পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ চলতে থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে অশোধিত তেলের দাম বেড়ে হয়েছে ব্যারেল প্রতি ১১০ ডলার। এর জেরে ভারতীয় তেল সংস্থাগুলির লোকসানের বহর নাকি বেড়েই চলেছে। এই পরিস্থিতিতে মার্চ মাসে গৃহস্থের রান্নার গ্যাস ও মে মাসে বাণিজ্যিক গ্যাসের দাম বাড়ানো হলেও পেট্রল-ডিজেলের মতো জ্বালানি তেলের দাম বাড়বে না, এমন ভাবখানা দেখিয়েছিল কেন্দ্রীয় সরকার। কিন্তু তা যে ছিল আম আদমিকে বিভ্রান্ত করার কৌশল, পশ্চিমবঙ্গ সহ পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা ভোট মিটতেই সেটা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে যায়। গত ৪ মে পাঁচ রাজ্যের ভোটের ফলাফল ঘোষণার পর ১০ মে জ্বালানি তেল ব্যবহার কমানো, এক বছর সোনা কেনা বন্ধ রাখার কথা বলে দেশবাসীকে কৃচ্ছ্রসাধনের পরামর্শ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ঘরপোড়া সাধারণ মানুষও সেদিনই তেলের দাম বৃদ্ধির বার্তা পেয়ে গিয়েছিলেন। অতঃপর আর সময় নষ্ট না করে শুক্রবার ১৫ মে পেট্রল ও ডিজেলে লিটার প্রতি ৩ টাকা দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয় সরকার। কারণ, সেই ‘পরিস্থিতি’, যার শিকার হতে হবে সাধারণ মানুষকে। বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন, এর অর্থ দাঁড়াল দেশে অর্থনীতির উন্নয়ন বা অগ্রগতি থমকে যাবে, শিল্পে উৎপাদন কমবে, বেকারত্ব বাড়বে, চড়বে পণ্যের দাম। আর এসবের জেরে পরিবহণের খরচ বাড়বে, বাড়বে কারখানায় তৈরি পণ্য ও বাজারে বিক্রি হওয়া আনাজপাতির দামও। হোটেল-রেস্তরাঁয় খাওয়ার খরচ বাড়বে, ফ্ল্যাট-বাড়ির দাম বাড়বে, বাড়তে পারে পড়াশোনার খরচও। বাড়বে কৃষিকাজের খরচ। ইতিমধ্যে গত মাসে পাইকারি বৃদ্ধির হার ৪২ বছরে সবচেয়ে বেশি ৮ শতাংশে পৌঁছেছে। এবার তেলের দাম বাড়ায় খুচরো বাজারেও আগুন লাগতে পারে। তবে নাকি এটা প্রথম ‘শো’। তেলের দাম আরও বাড়ার সম্ভাবনা আঠারো আনা! হাড়িকাঠে গলা দেওয়ার জন্য লক্ষ্যবস্তু সেই জনতা-জনার্দনই।
সব মিলিয়ে দাঁড়াচ্ছে এই যে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে চার বছর আগে ২০২২ সালে শেষবার তেলের দাম বেড়েছিল। সাধারণের কথা ভেবে এতদিন দাম বাড়ায়নি ‘সহৃদয়’ মোদি সরকার। এবারের যুদ্ধ শুরু হয়েছে ২৮ ফেব্রুয়ারি। এর জেরে বিশ্ববাজারে অশোধিত তেলের দাম ১০০ ডলার পেরিয়ে ১১০ ডলার ছুঁয়েছে। এর জন্য বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার হু হু করে কমছে। ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলির পেট্রলে লিটার প্রতি ১৪ টাকা এবং ডিজেলে লিটার প্রতি ৪২ টাকা কম আয় হচ্ছে। সব মিলিয়ে দিনে ১ হাজার কোটি টাকা নাকি কম আয় হচ্ছে। উদ্বিগ্ন সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মন্ত্রী জানিয়েছেন, এপ্রিল থেকে জুন—এই তিন মাসে লোকসানের পরিমাণ ১ লক্ষ কোটি টাকা দাঁড়াবে। তবু সাধারণ মানুষের দুর্দশার কথা ভেবে যুদ্ধ শুরুর পর ৭৬ দিন তেলের দাম না বাড়িয়ে কৃচ্ছ্রসাধনের পথে হেঁটে তেল সংস্থাগুলি ও তাদের প্রভু কেন্দ্রীয় সরকার লোকসানের ধাক্কা মুখ বুজে নাকি মেনে নিয়েছে। কিন্তু এইভাবে আর কতদিন! অতএব তেল সংস্থা তথা সরকারের লোকসান বা ক্ষতিপূরণের দায় এবার জনগণকে নিতে হবে! যুক্তি হল, ২০২২ সালে জ্বালানির দাম বেড়েছিল প্রায় ১০ শতাংশ। এবার ৩ শতাংশের সামান্য বেশি। তার মানে, তেলের দাম বাড়ানোর আরও সুযোগ আছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জনতার এইটুকু সহযোগিতা সরকারের প্রাপ্য! সরকারি তরফে এমন একটা ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত।
বিরোধীরা অবশ্য এর মধ্যে স্রেফ ‘অজুহাত’ দেখছে। তাদের যুক্তি বিশ্ববাজারে যখন অশোধিত তেলের দাম ৭০ ডলারে নেমেছিল, তখন ভারতে পেট্রল-ডিজেলের দাম এক পয়সাও না কমিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা বাড়তি উপার্জন করেছে সরকার। অর্থাৎ সাধারণ মানুষকে এর কোনো সুবিধাই দেওয়া হয়নি। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর মতে, মোদি সরকারের গলদের মূল্য চোকাতে হচ্ছে জনতাকে। বামেদের অভিযোগ, বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ায় রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলির প্রভূত ক্ষতি হচ্ছে, এটা সঠিক ব্যাখ্যা নয়। আসলে তেলের দাম বাড়লে অতিরিক্ত মুনাফার সুযোগ রয়েছে, যা বর্তমান আয়ের চেয়ে অনেক বেশি। বিরোধীদের বক্তব্য, পেট্রল-ডিজেলে শুধু কর চাপিয়ে প্রতিদিন এক হাজার কোটি টাকা তোলা হচ্ছিল। এবার তেলের দাম বাড়িয়ে লুটের বহর বাড়ানো হবে। সন্দেহ নেই, গ্যাস-তেলের দাম বৃদ্ধি নিয়ে অতীতের মতো এবারও শাসক ও বিরোধীপক্ষের চাপান-উতোর চলতেই থাকবে। আর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য থেকে বিলাসবহুল সামগ্রী, সব কিছুই মহার্ঘ হবে। তাই পাঁচ রাজ্যে ভোট মিটতেই মূল্যবৃদ্ধির বোঝা চাপতে চলেছে। অর্থাৎ দিনের শেষে সারসত্যটা হল, এই মূল্যবৃদ্ধির মূল্য চোকাতে হবে সেই আম জনতাকেই। কেতাবি ভাষায়, পরিস্থিতির শিকার!