


তন্ময় মল্লিক: ‘এবার বদল হবে, বদলাও হবে। প্রতিটি ঘটনার ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে বিচার হবে। কেউ রেহাই পাবে না।’ নির্বাচনি জনসভাগুলিতে এমনটাই ছিল শুভেন্দু অধিকারীর ভাষণের মূল নির্যাস। নির্বাচন শেষ হতেই সেই আক্রমণাত্মক মেজাজ উধাও। সাংবাদিকদের বললেন, ‘নির্বাচন হয়ে গিয়েছে। মানুষ রায় দিয়েছে। যে দলই জিতুক রাজনৈতিক হানাহানি নয়। বাংলার উন্নয়নের স্বার্থে এক হয়ে কাজ করতে হবে।’ ব্রিগেডে মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নেওয়ার পর শুভেন্দুবাবু কী বললেন? ‘আমি সকলের মুখ্যমন্ত্রী।’ দলমত, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলের হয়ে কাজ করার বার্তা দিলেন। মুখ্যমন্ত্রী আর কী বললেন? ‘সংকল্পপত্রে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া প্রতিটি প্রতিশ্রুতি পালন করা হবে।’ ভোটে জেতার পরেও নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পালনে মুখ্যমন্ত্রীর অঙ্গীকার অবশ্যই মানুষের মনে জোগায় ‘ভরসা’।
সাধারণ মানুষ রাজনীতির মারপ্যাঁচ অত বোঝে না। বুঝতে চায়ও না। তারা চায়, এলাকায় শান্তি থাক। বিপদের সময় জনপ্রতিনিধিরা পাশে দাঁড়াক। নিয়োগের পরীক্ষা হোক প্রতি বছর। চাকরির দরজা খোলা থাকলে ছাত্রছাত্রীদের পড়শোনায় আগ্রহ থাকবে। অক্ষম ও অসহায় মানুষের পাশে থাকুক সরকার। এই সব চাহিদা সরকার পূরণ করলে মানুষের সমর্থন তাদের দিকেই থাকে। আর বিচ্যুতি ঘটলে ফিরিয়ে নেয় মুখ।
এবারের নির্বাচনি প্রচারে বিজেপি শুধু রাজ্য সরকার ও শাসক দলের দুর্বলতাগুলিই তুলে ধরেনি, দিয়েছিল প্রতিকারের আশ্বাস। মানুষ তাদের কথায় বিশ্বাস করেছে। তাই বিজেপির পক্ষে গিয়েছে বিপুল জনাদেশ। শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেওয়ার পর মাত্র কয়েকটা দিন অতিক্রান্ত হয়েছে। এত অল্প সময়ের মধ্যে সরকারের কাজকর্ম ও ভবিয্যৎ নিয়ে মন্তব্য করাটা বেশি রকমের বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। তবে ‘মর্নিং শোজ দি ডে’ প্রবাদটি সত্যি হলে বলতেই হবে, মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শুভেন্দু অধিকারী ইনিংসটা ভালোই শুরু করেছেন। কোনো হাঁকডাক নেই। হামবড়া ব্যাপার নেই। আপাতত কথা কম, কাজ বেশি নীতি নিয়ে চলছেন। বিভিন্ন দপ্তরের অফিসারদের সঙ্গে বৈঠকের সময় শুভেন্দুবাবু একটাই কথা বলছেন, ‘রাজ্যে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’
দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন হল সুশাসকের লক্ষণ। সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য আলাদা করে অর্থ ব্যয় হয় না। দরকার স্রেফ সদিচ্ছার। আপাতত সেই সদিচ্ছা নতুন মুখ্যমন্ত্রীর মধ্যে দেখা যাচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই তিলজলায় অ্যাকশন শুরু করেছে শুভেন্দুবাবুর প্রশাসন। বহুতলে অগ্নিকাণ্ডে দু’জনের মৃত্যুর পরই ভাঙা শুরু হয়েছে বহুতল। তিলজলার ঘটনায় সরকারের কড়া পদক্ষেপের পরই বিভিন্ন জেলা শহর থেকে বেআইনি নির্মাণ ভাঙার দাবি উঠতে শুরু করেছে। শুধু তিলজলা, একবালপুর, মোমিনপুরে বুলডোজার চালালেই হবে না, গোটা রাজ্যে এই নীতি কার্যকর করতে হবে। তাহলেই সাধারণ মানুষ দু’হাত তুলে শুভেন্দুবাবুর সরকারকে আশীর্বাদ করবে।
আপাতদৃষ্টিতে ছোটো ছোটো বিষয়গুলির দিকেও নজর দিচ্ছে নতুন সরকার। যেমন টোলগেট। বিভিন্ন এলাকায় বাঁশ দিয়ে টোলগেট বসিয়ে বালি, পাথর, কয়লার গাড়ি থেকে বিপুল টাকা আদায় করা হত। টোলগেট থেকে প্রতিদিন কত টাকা আয় হত, সেই টাকা কোথায় যেত, তার কোনো হিসাবও ছিল না। টোলগেটের দখলদারি নিয়ে মারামারি থেকে খুনোখুনি সবই ঘটত। নতুন সরকার সেই টোলগেট বন্ধ করে দিয়েছে। তাতে মাতব্বরদের মাথায় হাত পড়লেও স্বস্তি পেয়েছেন মালবাহী গাড়ির চালকরা।
নির্বাচনের আগে অনেকেই বলেছিলেন, বিজেপি বাংলায় ক্ষমতায় এলে বন্ধ হয়ে যাবে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, যুবসাথী সহ তৃণমূল সরকারের চালু করা সমস্ত প্রকল্প। তার স্বপক্ষে যুক্তিও ছিল। কোনো বিজেপি শাসিত রাজ্যে এই সমস্ত সামাজিক প্রকল্প চালু নেই। তাই বাংলায় কী করে তা চালু রাখবে, এই প্রশ্ন উঠেছিল। কিন্তু, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়ে দিয়েছেন, ‘আগের সরকারের আমলে চালু কোনো সামাজিক প্রকল্প বন্ধ করা হবে না।’
মুখ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্যে সাধারণ মানুষ অবশ্যই আশ্বস্ত হয়েছে। তবে একটা কথা মানতেই হবে, বিজেপি যতই ভাতা রাজনীতির সমালোচনা করুক না কেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চালু করা প্রকল্পগুলির গুরুত্ব তারা অস্বীকার করতে পারছে না। এমনকি, আয়ুষ্মান প্রকল্পের সঙ্গে রাজ্যকে যুক্ত করলেও এখনই বন্ধ হচ্ছে না স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প। কারণ বিজেপি নেতৃত্ব জানে, স্বাস্থ্যসাথী কার্ড রাজ্যবাসীর মধ্যে বিপুল আস্থা অর্জন করেছে। তাকে বাতিল করলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে পারে। ক্ষমতায় বসেই মানুষের বিরাগভাজন হতে চাইছে না বলেই স্বাস্থ্যসাথী কার্ড চালু রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
লক্ষ্মীর ভাণ্ডারও বাতিল হচ্ছে না। শুধু বদলে যাচ্ছে নাম। ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার’ থেকে প্রত্যেক মহিলা মাসে
৩ হাজার টাকা করে পাবেন। এছাড়াও চরম দুশ্চিন্তার মধ্যে ছিলেন চুক্তিভিত্তিক কর্মীরা। রাজ্যে প্রায়
পাঁচ লক্ষ যুবক-যুবতী বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে, হাসপাতালে চুক্তির ভিত্তিতে কাজ করেন। এছাড়াও রয়েছেন হাজার হাজার সিভিক ভলান্টিয়ার। রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের জেরে তাঁদের চাকরি যাবে, এমন আশঙ্কা ছিল। কিন্তু, মুখ্যমন্ত্রী আশ্বস্ত করেছেন, কারো পেটে লাথি মারা হবে না। উলটে তিনি যে ঈঙ্গিত দিয়েছেন তাতে চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের ভবিষ্যতে স্থায়ী করা হতে পারে।
সরকারি শূন্যপদ পূরণেও গুরুত্ব দিচ্ছে নতুন সরকার। ইতিমধ্যেই রাজ্যের পঞ্চায়েতমন্ত্রী দিলীপ ঘোষ তাঁর দপ্তরে প্রায় ছ’হাজার কর্মী নিয়োগে উদ্যোগী হয়েছেন। এছাড়াও বিভিন্ন দপ্তরে প্রচুর শূন্যপদ রয়েছে। কাজে গতি আনতে গেলে সেইসব পদ পূরণ করতে হবে। শিক্ষক নিয়োগের কাজ মাঝপথে আটকে আছে। তা দ্রুত শেষ করে স্কুলগুলিকে সচল করার ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি প্রতিশ্রুতিমতো মেটাতে হবে সরকারি কর্মীদের বকেয়া ডিএ। লাগু করতে হবে সপ্তম পে কমিশন।
বাংলায় বেকারত্ব দূর করাটাই বিজেপি সরকাররের কাছে সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ। শুধু শিক্ষিত যুবক-যুবতীরাই নন, সরকারের মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন লক্ষ লক্ষ স্বল্প শিক্ষিত, অদক্ষ শ্রমিকও। দু’টো পয়সা বেশি রোজগারের জন্য অনেকে মা-বাবা, স্ত্রী, সন্তান ও আত্মীয়দের ছেড়ে বিজেপি শাসিত রাজ্যে পাড়ি দেন। তাঁদের বিশ্বাস, এবার বাংলাতেই তাঁদের কাজের ব্যবস্থা করা হবে। তারজন্য গড়া হবে শিল্প। প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, বাংলায় ডবল ইঞ্জিন সরকার হলেই সেটা সম্ভব। বাংলায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বহুকাঙ্ক্ষিত ডবল ইঞ্জিন সরকার। ফলে রাজ্যে শিল্প আসবে, বিনিয়োগ বাড়বে, এই আশায় বুক বাঁধছেন লক্ষ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক।
এখনও পর্যন্ত নির্বাচনে দেওয়া প্রতিটি প্রতিশ্রুতি পূরণের সিদ্ধান্তে অনড় রয়েছে শুভেন্দু অধিকারীর সরকার। রাজ্যের মুখ্যসচিবের দাবি, ১০০ দিনের মধ্যে সংকল্পপত্র বাস্তবায়িত করা হবে। যদি বিজেপি সরকার সত্যিই সেটা করতে পারে তাহলে বাংলার রাজনীতির ইতিহাস যে নতুন করে লেখা হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
বিপুল প্রত্যাশার চাপ নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসেছেন শুভেন্দু অধিকারী। শুভেন্দুবাবুকে যাঁরা কাছ থেকে দেখেছেন তাঁরা জানেন, মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে কাজ হাসিল করার লোক তিনি নন। কখনও কর্মীদের বিপদের মধ্যে ফেলে পালিয়ে যান না। কথা দিলে কথা রাখেন। নন্দীগ্রামের জমি আন্দোলনের সময় তাঁর উপর ভরসা করে হাজার হাজার মানুষ জীবন বাজি রেখে লড়াই করেছিল। নভেম্বরে সিপিএমের ‘নতুন সূর্যোদয়ে’র দিন হাজার হাজার জমি আন্দোলনকারী আত্মসমর্পণ না করে এলাকা ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন। সেদিন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন শুভেন্দুবাবু। নন্দীগ্রাম কলেজে লঙ্গরখানা খুলে হাজার হাজার মানুষের খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। পাশাপাশি লড়াকু নেতাদের নিয়ে গিয়ে রেখেছিলেন কাঁথি ও এগরার বিভিন্ন লজ ও হোটেলে। সেই সময় শুভেন্দুবাবু একটা কথা খুব বলতেন, ‘যে অতীতকে অস্বীকার করে তার ভবিষ্যৎ কিছুতেই ভালো হতে পারে না।’
তখন শুভেন্দুবাবু ছিলেন তৃণমূলে। হয়ে উঠেছিলেন আন্দোলনকারীদের কাছে ভরসার প্রতীক। এখন তিনি বিজেপির বিধায়ক। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। দল ও পদ বদলেছে। কিন্তু, ভরসা আজও অটুট। তাই প্রায় ৫০ বছর পর বাংলায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ডবল ইঞ্জিন সরকার। সেই পরিবর্তনের মুখ তিনিই। চরম আর্থিক সংকটের মধ্যে বাংলার হাল বদলের গুরুদায়িত্ব বর্তেছে তাঁরই উপর। কাজটা কঠিন। তবে তিনিই তা পারবেন। কারণ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বরাবরই ফার্স্ট বয় শুভেন্দু। বাঘের গুহায় ঢুকে বাঘ শিকার করতেই তিনি পছন্দ করেন।