


সোনা হল সব ধনের সেরা ধন। তাই সে পরম আদরের এবং কাম্য বস্তু। রূপকার্থেও সত্য। কোনো ছোটো ছেলে বা মেয়েকে ভালো লাগলে আমরা আদর করে বলি—‘সোনা ছেলে’ বা ‘সোনা মেয়ে’। যে ফসল আমাদের সংবৎসরের অন্ন জোগায় তাকে বলি ‘সোনার ফসল’। যে নৌকা সোনার ফসল ভরে নিয়ে ঘরের পথে এগিয়ে যায় তাকে কবি ‘সোনার তরী’ আখ্যা দিয়েছেন। যে-দেশ আমার জন্মভূমি, সে জননীর সঙ্গে তুলনীয়, সে-দেশ স্বর্গের চেয়েও গরীয়সী, আমাদের কবি ‘সোনার দেশ’-এর মর্যাদা দিয়েছেন তাকে। বঙ্গদেশ, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘সোনার বাংলা’! যে-কলম থেকে অপূর্ব সাহিত্য কাব্য সংবাদ প্রভৃতি সৃষ্টি হয়, তাকে উচ্চস্থান দিতে ‘সোনার কলম’ আখ্যা দেওয়া হয়। প্রাচীনকালে রাজার মস্তকে যে মুকুট শোভা পেত তা যত রত্নখচিতই হোক না কেন, নির্মিত হত স্বর্ণে। যে-যুগ আমাদের সবরকমে সুখ দিয়েছে, শান্তি দিয়েছে, গর্বের কারণ হতে পেরেছে, তা ‘স্বর্ণযুগ’। বহুকাল বাদেও সেইসময় আমাদের সুখস্মৃতি জাগাতে পারে। যে-সন্ধ্যার আলোয় চারিদিক আমোদিত হয়ে ওঠে তাকে ‘সোনাঝরা সন্ধ্যা’ ছাড়া আর কীই-বা বলার থাকে? গয়না অনেক ধাতু দিয়েই তৈরি করা সম্ভব। নারী, পুরুষ উভয়ের কাছেই তার কদর আবহমানকালের। তবে স্বর্ণনির্মিত গহনার তুল্য যে কিছুই হয় না। সোনার গয়না একজন নারীর সৌন্দর্য বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। কেবল দৈহিক সৌন্দর্যই-বা কেন, নারীর ব্যক্তিত্বও বৃদ্ধি পায় সোনার ছোঁয়ায়। ব্যক্তিগত স্বর্ণভাণ্ডার, যত ছোটোই হোক, তা একজন নারীর মানসিক শক্তি এবং আর্থিক স্বাধীনতার সূচক। তাই কোনো নারী ‘স্ত্রীধন’ হাতছাড়া করতে চান কখনো।
সোনার স্থান যে সমাজে এমন বিপুল, এমনকি অপরিমেয় সেই সমাজ সোনা কিনবে না তা হয় নাকি? কিন্তু পশ্চিম এশিয়ার ভয়াবহ যুদ্ধপরিস্থিতি আমাদের নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে। দেশের নিত্যপ্রয়োজন মেটাতে খনিজ তেল ও গ্যাসসহ বহু পণ্য আমাদের নিয়মিত আমদানি করতে হয়। তার জন্য বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বেরিয়ে যায়। এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে বৈদেশিক মুদ্রাভাণ্ডারের উপর চাপ আরো বেশি করে পড়ছে, এবং তা রোজ বাড়ছে বললেও অত্যুক্তি হয় না। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে খনিজ তেল ও গ্যাসের দর ঊর্ধ্বমুখী এবং সেসব সংগ্রহের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। ওইসঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেশীয় মুদ্রামানের অবনমন—মার্কিন ডলারের প্রেক্ষিতে ভারতীয় মুদ্রা বা রুপির দাম নিম্নমুখী। অর্থাৎ ভারতের সমস্যা এই মুহূর্তে দ্বিমুখী। আবার দেশের বাজারে সোনার চাহিদাপূরণও আমদানিনির্ভর। আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দামও চড়া। তাই সোনা আমদানিতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা প্রয়োজন। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে কেন্দ্রীয় সরকার পেট্রপণ্য এবং সোনার ব্যবহারে আপাতত লাগাম চায়। স্বয়ং দেশের প্রধানমন্ত্রীই সরকারের মনোভাব খোলসা করে দিয়েছেন। তিনি চান, অন্তত একবছর খুব জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ভারতবাসী যেন সোনা না কেনেন। তাতে সোনার আমদানি কমানো যাবে এবং হলুদ ধাতু বাবদ অনেকখানি বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা সম্ভব হবে।
কিন্তু শুধু মুখের কথায় কজন আর সংযত হবেন? সেটা অনুমান করেই সোনা ক্রয়ে রাশ টানতে কেন্দ্রীয় সরকার আমদানি শুল্ক এক ধাক্কায় ৬ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করেছে। একই হারে আমদানি শুল্ক বসেছে রুপোতেও। কলকাতাসহ সারা দেশেই সোনার বাজারে বুধবার থেকেই এই সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়েছে। যেমন ওয়েস্ট বেঙ্গল বুলিয়ান মার্চেন্টস অ্যান্ড জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য বলছে, মঙ্গলবার শহরে ২৪ ক্যারেট বিশুদ্ধতার ১০ গ্রাম সোনার দাম ছিল ১ লক্ষ ৫৩ হাজার টাকা। বুধবার তা বেড়ে হয় ১ লক্ষ ৬১ হাজার ৬০০ টাকা। অর্থাৎ, একদিনের তফাতে দামবৃদ্ধির পরিমাণ ৮,৬০০ টাকা! বুধবার ২২ ক্যারেটের গয়না সোনার দামও ব্যাপক বেড়েছে। ১০ গ্রামের দাম গিয়েছে ১ লক্ষ ৫৩ হাজার ৬০০ টাকা। এর দাম মঙ্গলবার ছিল ১ লক্ষ ৪৫ হাজার ৪০০ টাকা। কলকাতায় এক কেজি খুচরো রুপোর দর ১৭,৫৫০ টাকা বেড়ে হয়েছে ২ লক্ষ ৮৭ হাজার ৩৫০ টাকা! করোনা পরিস্থিতির পর থেকেই বিশ্বজুড়ে সোনা ও রুপো অগ্নিমূল্য! দাম নিয়ন্ত্রণে আসার কোনো লক্ষণ নেই। স্বভাবতই উদ্বেগ দেখা দিয়েছে ক্রেতা, বিক্রেতা-ব্যবসায়ী, স্বর্ণশিল্পী সংশ্লিষ্ট সকল মহলেই। ৬৫ লক্ষ গয়নার কারিগর শুধু পশ্চিমবঙ্গেরই। তাঁদের মধ্যে অন্তত ৩৫ লক্ষ পরিযায়ী—মুম্বই, দিল্লি বা সুরাত প্রভৃতি নগরে কাজ করেন। এই পরিস্থিতিতে তাঁদের রুটিরুজি রক্ষার বিষয়টি কেন্দ্রের মোদি সরকার এবং রাজ্যের শুভেন্দু সরকারকে মানবিক দিক থেকে আন্তরিকতার সঙ্গেই ভেবে দেখতে হবে। এত বড়ো একটি ‘বিশ্বকর্মা’ শ্রেণি বিপাকে পড়লে তা হবে বাংলাসহ সারা দেশের অর্থনীতির জন্যই এক দুঃসংবাদ।