


সমৃদ্ধ দত্ত: দিল্লি বাংলাকে কোনোদিন সুনজরে দেখেনি। স্বাধীনতার আগেও নয়। স্বাধীনতার পরেও নয়। এমন নয় যে, বাংলায় ডবল ইঞ্জিন সরকার স্বাধীনতার পর বাংলা কখনো পায়নি। দুই দফায় পেয়েছে। কিন্তু অভিজ্ঞতা অত্যন্ত তিক্ত ও হতাশাজনক। আর তাই তৃতীয়বারের জন্য আবার যখন বাংলায় ডবল ইঞ্জিন সরকার স্থাপিত হল, তখন একদিকে যেমন আশাবাদের সঞ্চার হয়েছে, তেমনই দোলাচলও রয়েছে যে, এবার সেই কেন্দ্রীয় বঞ্চনার ব্যতিক্রম হবে তো? নাকি ৫ বছর দেখা যাবে বাংলা যথাযোগ্য সহায়তা পেল না? আশা করা যায় ইতিবাচক পথেই হাঁটবে বাংলা এবং দিল্লির সরকার। সেক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নতুন একটি পথ চলার সূত্রপাত হতে পারে বঙ্গবাসীর। সেই অর্থনৈতিক কাঠামো বদলের পাশাপাশি বাঙালির ধর্ম ও সংস্কৃতি যাপনেরও একটি বড়োসড়ো পরিবর্তন ঘটতে পারে। কারণ, এই প্রথম বাংলার রাজনীতির পট পরিবর্তনে ধর্ম একটি বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করেছে। উদ্বাস্তু, খাদ্যসংকট, কর্মহীনতা, নকশালপন্থী আন্দোলন, শিল্পসমাধি, ভূমি সংস্কার, পঞ্চায়েত, প্রাথমিক শিক্ষায় নীতি বদলের রাজনীতির জেরে নতুন এক মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদয়, প্রধানত ভাতাকেন্দ্রিক অর্থনীতির মাধ্যমে দুর্বল শ্রেণির হাতে টাকা প্রদান, দুর্নীতি ইত্যাদির পথ পেরিয়ে এই প্রথম বাংলায় হিন্দুত্ব বসেছে রাজনৈতিক চেতনার প্রথম সারিতে। এবং সেটি উচ্চকিত। যদিও এখনও একটি বড়োসড়ো অংশ শাসক দলের বিরুদ্ধেই ভোট দিয়েছে। এত ঝড়ের মধ্যেও তৃণমূল কংগ্রেস কেন ৪১ শতাংশ ভোট পেয়েছে, এটি চমকপ্রদ রাজনৈতিক গবেষণার বিষয় হতে পারে।
১৯৪৭ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত প্রথম ডবল ইঞ্জিন সরকারে বাংলাকে চরম বঞ্চিত করা হয়েছিল সার্বিকভাবে। আয়করের যে প্রাপ্য বাংলার পাওয়ার কথা সেটা বৃদ্ধির বদলে কমিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ছিল ২০ শতাংশ। দেওয়া হয়েছিল ১২ শতাংশ। কারখানা স্থাপনের যে লাইসেন্স দেওয়া হয় কেন্দ্র থেকে, সেই সংখ্যা কমানো হয়। পরিবর্তে মহারাষ্ট্র, গুজরাত অনেক বেশি লাইসেন্স পায়। অথচ ১৯৪৭ সালে গোটা দেশের মধ্যে সবথেকে বেশি রেজিস্টার্ড কারখানা ছিল বাংলায়। শিল্পোৎপাদনের হার সর্বোচ্চ ছিল বাংলায়। জিডিপি হার ছিল প্রথম সারিতে। ১৯৬২ সালের মধ্যে এই তাবৎ আর্থিক উন্নতির ধ্বংস শুরু হয়। যে পরিমাণ উদ্বাস্তু এসেছে, তার সঙ্গে জনসংখ্যার অনুপাতে কেন্দ্রীয় অনুদান দেওয়া হয়নি।
১৯৪৭ সালের পর সবথেকে বেশি সংকট নেমে এসেছিল পশ্চিমবঙ্গে। কারণ দেশভাগের যন্ত্রণা। লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তু চলে আসায় বাংলার আর্থিক ভারসাম্য নড়বড়ে হয়ে যায়। দুর্ভাগ্যজনক হল, এত বড়ো দেশে এতগুলি রাজ্য। কিন্তু কোনো রাজ্য উপযাচক হয়ে এই অতিরিক্ত উদ্বাস্তুর ভার ভাগাভাগি করে নিতে রাজি হয়নি। তাই বাঙালিকে আন্দামান যেতে হয়, দণ্ডকারণ্য যেতে হয়। বন্যপ্রাণীদের সঙ্গে লড়াই করে, জঙ্গল সাফ করে বসতি নির্মাণের জন্য।
বাঙালির একাংশ বলে থাকে যে, অন্য রাজ্যে গেলে বোঝা যায় যে, বাংলা কত পিছিয়ে আছে। অন্য রাজ্য কত ঝকঝকে। কত কর্মসংস্থান। কত পরিকাঠামো। বঙ্গবাসীর এই অংশের ইতিহাসচেতনা নেই। কারণ তারা জানেই না যে, বাংলার উপরে বিগত ৮০ বছরে কত ঝড় বয়ে গিয়েছে। এই ঝড়ের এক শতাংশও ওইসব বড়োলোক রাজ্যের শরীরে লাগেনি।
২০২৬ সালের নির্বাচনের বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, বাংলার গত ৮০ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাসে আবার একটি বড়োসড়ো বাঁকবদল এসেছে। উদ্বাস্তু সমস্যা এবং তার জেরে বামপন্থীদের শক্তিশালী হওয়া। কংগ্রেস সরকারের আমলে ১৯৪৭ থেকে ১৯৬৭ পর্যন্ত এই যে সময়কাল ছিল, সেই সময় বাংলার রাজনীতি প্রধানত জীবনযাপনের সংগ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। মূলত হিন্দু উদ্বাস্তু আসছে দলে দলে এবং জীবনযাপনের লড়াই করছে। স্বাভাবিকভাবেই এই উদ্বাস্তু সমস্যাকে নিজেদের রাজনৈতিক উত্থানের হাতিয়ার করতে পারত হিন্দু মহাসভা, ভারতীয় জনসংঘ ইত্যাদি হিন্দুত্বভিত্তিক দলগুলি। অথচ বিস্ময়কর হল, সেটা তারা পারল না। ১৯৫২ সালের ভোটে বাংলার ২৩৮ আসনের মধ্যে কংগ্রেস একাই পেয়েছিল ১৫০ আসন। হিন্দু মহাসভা এবং জনসংঘ পেয়েছিল মাত্র ১৩ টি আসন। সেখানে বামপন্থীরা দখল করেছিল ৪১ আসন। রাজনৈতিক শক্তি তাদের হাতে চলে গেল।
১৯৫৭ সালের নির্বাচনে হিন্দুত্ববাদী দলগুলির আরও বেহাল দশা। বিস্ময়করভাবে হিন্দু মহাসভা ও জনসংঘ উভয় দলই বিধানসভা ভোটে শূন্য হয়ে গেল। পক্ষান্তরে সংযুক্ত বাম নির্বাচনি কমিটি পেল ৮৫ আসন। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই বামপন্থীরা একচ্ছত্রভাবে বিরোধী দলের মর্যাদা ও শক্তি পেয়েছিল। যা অত্যন্ত বিস্ময়কর। কারণ, এভাবে বামপন্থীদের কেন ফাঁকা মাঠ ছেড়ে দিয়েছিল হিন্দুত্ববাদী দলগুলি সেটা বোধগম্য নয়। উদ্বাস্তুরা মুসলিমদের দ্বারা অত্যাচারিত হয়ে পূর্ব পাকিস্তান থেকে এসেছিল। তাদের মনের মধ্যে সেই ক্রোধ, ক্ষোভ, ক্ষত থাকাই স্বাভাবিক। সেই ক্রোধকে হিন্দুত্ববাদী দলগুলি কাজে লাগাতে ব্যর্থ হল। বরং ওই উদ্বাস্তুদের মধ্যে ধর্মীয় ক্রোধের পরিবর্তে অন্ন বস্ত্র বাসস্থানের সংগ্রামকে অনেক বেশি জাগ্রত করে বামপন্থীরা তাদের পাশে পেয়ে গেল। সেই শক্তি বৃদ্ধি পেল ক্রমাগত।
১৯৬৭ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস সেই প্রথমবার পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা থেকে সরে গেল। বাংলা কংগ্রেস ও সিপিএম ক্ষমতাসীন হল। এই যে ক্ষমতায়ন হল বামপন্থীদের, ঠিক এই সময় থেকেই বাংলার একটি অন্য সর্বনাশ শুরু হল। যেটি বামপন্থীরা প্রতিরোধ করতে পারত। কিন্তু কেন করেনি সেটাও বোধগম্য নয়। সেটি হল অকারণে কলকারখানা বন্ধ করা, হরতাল, ধর্মঘট, শিল্পবিরোধী একটি ইমেজ নির্মাণ। দলে দলে শিল্প সংস্থা বাংলা ছেড়ে দিল। যেহেতু কেন্দ্র বিরোধী যুক্তফ্রন্ট সরকার, তাই স্বাভাবিকভাবেই কেন্দ্র থেকে কোনো সাহায্য পেল না বাংলা।
১৯৭২ সালে আবার ডবল ইঞ্জিন সরকার হল বাংলায়। কিন্তু লাভ কী হল? বাংলাদেশ যুদ্ধের জেরে আবার উদ্বাস্তু আগমন। সব চাপ বাংলার উপর। অথচ বাংলা কোনো প্যাকেজ পায়নি। তারপর জাতীয় রাজনীতি টালমাটাল। ইন্দিরা হটাও আন্দোলন। জরুরি অবস্থা। ১৯৭৭ সালে বাংলা ও কেন্দ্র উভয় সরকারের পতন। আবার কেন্দ্র ও রাজ্যে ভিন্ন দলের সরকার। সুতরাং অব্যাহত রইল বঞ্চনা।
১৯৬৭ সাল থেকে বাংলায় উগ্র বামপন্থার আগমন ঘটে। শহর ও গ্রামের মধ্যবিত্ত সমাজ বদলের লক্ষ্যে নকশালপন্থায় আগ্রহী হয়েছিল। কিন্তু যখনই হত্যার রাজনীতি শুরু হল সেই আন্দোলন বিপথে চলে যায় এবং অরাজক প্রবণতার ইঙ্গিত বহন করে, তখনই বোঝা যায় যে, ওই আন্দোলন ব্যর্থ হতে চলেছে। ১৯৭৭ সালে গ্রাম পঞ্চায়েত, ভূমি সংস্কারের মাধ্যমে বামফ্রন্ট সরকার বাংলায় একদিকে গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে রাজনীতির একটি সমন্বয় ঘটিয়ে তুলতে সাফল্য পায়। পাশাপাশি কৃষক, শ্রমিক পার্টির মধ্যে প্রবেশ করে শিক্ষক শ্রেণি। এবং সরকারি কেরানির অংশ। সূক্ষ্মভাবে সিপিএমের নীতি-আদর্শগত একটি বদল হয়। তৈরি হয় নিও মিডল ক্লাস। ক্রমেই এই শ্রেণি পার্টির মধ্যে ওপিনিয়ন মেকার হয়ে যায়। তারাই ডমিনেট করতে শুরু করে কৃষক শ্রমিক ভোটব্যাংক আধিপত্যকে সরিয়ে। নয়ের দশকের শেষভাগ থেকে বাংলায় চলে আসে একটি অ্যাসপিরেশন ক্লাস। ফ্ল্যাট, গাড়ি, বেসরকারি চাকরির অনুপ্রবেশ ঘটে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত সমাজে।
আর ঠিক তখন থেকেই কিন্তু হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির উদ্ভব ঘটল। সিপিএম, কংগ্রেসের বাইরে আরও কোনো তৃতীয় বিকল্প আছে কি না সেই সন্ধান করল বঙ্গবাসী। সেই সুযোগটি আরএসএস পেয়েছিল। হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি। সেটি তাদের দ্বিতীয় শৈশব। ১৯৪৭ সালের পর প্রথম শৈশবে ভোটব্যাংক ছিল। কিন্তু সেটিকে ধরে রাখা যায়নি। অটলবিহারী বাজপেয়ি ১৯৯৯ সালে কেন্দ্রে সরকারে আসীন হওয়ার পর ফের বাংলায় বিজেপির প্রসারের একটি সুযোগ হল। আরএসএস এবং বিজেপি অবিশ্বাস্য সাফল্য পেল নীরবে। ২৭ বছর ধরে লেগে থেকে বঙ্গীয় সমাজের অন্দরে প্রবেশ করে। কেউ এই বদল ধরতে পারেনি।
প্রথমে কংগ্রেসের সমাজবাদী দক্ষিণপন্থা, তারপর বামপন্থা, ক্রমে তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনৈতিক আদর্শ অথবা অভিমুখহীন একটি ভোটব্যাংককেন্দ্রিক দক্ষিণপন্থার পর এবার বাংলায় এসেছে সরাসরি ধর্মীয় দক্ষিণপন্থা। সেটা ভালো না মন্দ সেটি বলার সময় আসেনি। সমাজ ও রাজনীতি পরস্পরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। সুতরাং কতদিন থাকবে এই হিন্দুত্ববাদী সমর্থনের জোয়ার সেটির কোনো পূর্বাভাস হয় না। তবে কোনোদিন এই মনোভাবটি অন্তর্হিত হবে না। এই হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি স্থায়ী হবে। কারণ নতুন এক সমাজের আগমন ঘটেছে বঙ্গে। আপাতত যেটি হবে, সেটি হল হিন্দুত্ব ডেমোক্রেসি। কিন্তু নতুন সরকারের দায়িত্ব হল ডেমোক্রেসিকে লঘু না করা। ধর্মীয় বিদ্বেষকে নিয়ন্ত্রণ করা। কারণ, দাঙ্গাহীন
হিন্দুত্ব আছে, ডেমোক্রেসিও আছে এবং উন্নয়নও হচ্ছে—একমাত্র এই ফরমুলাই নতুন সরকারকে স্থায়িত্ব দেবে। কর্মসংস্থান, শিল্প, মাথাপিছু আয় এবং সার্বিক শান্তিপূর্ণ সুস্থির সমাজ। বাংলার ডবল ইঞ্জিন সরকার এই অনুভূতিগুলি যদি বঙ্গবাসীকে দিতে পারে, তাহলেই একমাত্র সেটি হবে বাংলার জন্য দ্বিতীয় স্বাধীনতা!