


গত পাঁচ দশকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে রাজনৈতিক বিতর্কে উত্তাল হয়েছে বাংলা, তা হল ‘কেন্দ্রের বঞ্চনা’র অভিযোগ। এই দীর্ঘ সময় ধরে রাজ্যের শাসক দল (৩৪ বছর বামফ্রন্ট, ১৫ বছর তৃণমূল কংগ্রেস) দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে বঞ্চনার অভিযোগকে অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করেছে। এই অভিযোগকে ভোটের প্রচারে ব্যবহার করে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার নজিরও রয়েছে। অর্ধশতকাল পরে গত ৯ মে কেন্দ্রের সঙ্গে রাজ্যেও একই দলের সরকার গঠন হওয়ায় পশ্চিমবঙ্গবাসী কায়মনোবাক্যে আশা করতে শুরু করেছে যে, আর নিশ্চয়ই ‘কেন্দ্রের বঞ্চনা’র কথা শুনতে হবে না। পঞ্চাশ বছর ধরে চর্চিত এই শব্দবন্ধ বাংলার রাজনৈতিক ব্যাকরণ থেকে মুছে দেবে পশ্চিমবঙ্গের প্রথম বিজেপি সরকার। এবারে নির্বাচনি প্রচারে রাজ্যের উন্নয়নের স্বপ্নকে বাস্তবায়নে সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়েছে বিজেপি। রাজ্যের চেহারাটা পালটে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল তাদের বক্তব্যে। সেই প্রত্যাশাকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে তোলে ‘মোদির গ্যারান্টি’, ‘অমিত শাহের সংকল্প ঘোষণা’ এবং ‘ডবল ইঞ্জিন’-এর জয়ধ্বনি। এখন নির্বাচন সম্পন্ন, ফলাফল ঘোষিত। রাজ্যে ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার প্রতিষ্ঠিত। বাংলা আবার পিছিয়ে পড়ার বদনাম ঘুচিয়ে ভারতশ্রেষ্ঠ হওয়ার দৌড়ে শামিল হবে— বিপুল জনাদেশের আশা তো তেমনই।
এরাজ্যে যখন বাম সরকার অধিষ্ঠিত, কেন্দ্রে তখন কংগ্রেস সরকার। আবার বামেদের হটিয়ে যখন ২০১১ সালে তৃণমূল সরকার তৈরি হয়, তার তিন বছর পর থেকেই কেন্দ্রে রয়েছে মোদি সরকার। দীর্ঘকাল ধরে কেন্দ্রে ও রাজ্যে দুই মেরুর সরকার থাকায় বারবার সংঘাত চরমে উঠেছে। বাম অথবা তৃণমূল সরকারের মূল অভিযোগ ছিল, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হওয়ার কারণে পশ্চিমবঙ্গকে মূলত আর্থিকভাবে বঞ্চিত করে ভাতে মারার চেষ্টা করেছে কেন্দ্র। যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থার নিয়ম-নীতিকে পদদলিত করেছে কেন্দ্র। উলটো দিকে দিল্লির শাসকরা মনে করেছেন, নিজেদের ব্যর্থতা, দুর্নীতি, কেন্দ্রের দেওয়া টাকা যথাযথভাবে খরচ করতে না পারার অপদার্থতার কারণেই পশ্চিমবঙ্গের উন্নয়ন স্তব্ধ হয়েছে। এ জন্যই এই রাজ্য ক্রমশ পিছিয়ে পড়েছে অন্যদের থেকে। বাম আমলে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড়ো অভিযোগ ছিল, মাশুল সমীকরণ নীতি নিয়ে। অভিযোগ ওঠে, এই নীতি চালু থাকায় খনিজ উৎপাদনকারী রাজ্যগুলির তুলনায় পশ্চিমবঙ্গ শিল্পে পিছিয়ে পড়েছে। কারণ এরাজ্যের কাঁচামালের দাম গোটা দেশে সমান ছিল। ১৯৯১ সালে অবশ্য মাশুল সমীকরণ নীতি প্রত্যাহার করে কেন্দ্রের কংগ্রেস সরকার। বাম সরকারের অভিযোগ ছিল, কেন্দ্র থেকে রাজ্য যে পরিমাণ করের টাকা ভাগ পায়, তা প্রয়োজনের তুলনায় কম। আরও অভিযোগ ছিল, রাজ্যে শিল্প স্থাপনে বাধা সৃষ্টি করেছে কেন্দ্র। ২০১১ সালে রাজ্যে এবং ২০১৪ সালে কেন্দ্রে সরকার বদল হলেও কেন্দ্রীয় বঞ্চনার অভিযোগে কোনো নড়চড় হয়নি। বরং তা আরও তীব্র হয়েছিল। তৃণমূলের মূল অভিযোগ ছিল, ১০০ দিনের কাজ, আবাস যোজনার মতো কেন্দ্রীয় প্রকল্পের টাকা আটকে দিয়েছে কেন্দ্রের মোদি সরকার। রাজ্যের এক্তিয়ারে কেন্দ্রের হস্তক্ষেপের অভিযোগও ওঠে তৃণমূলের জমানায়। মমতা সরকারের দাবি ছিল, ন্যায্য প্রাপ্য প্রায় ২ লক্ষ কোটি টাকা দেয়নি কেন্দ্রীয় সরকার। ফলে উন্নয়নের অনেক কাজ আটকে গিয়েছে।
কেন্দ্র-রাজ্যে এবার একই দলের সরকার থাকায় পাঁচ দশকের এই চেনা রাজনৈতিক আকচা-আকচি এবার বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। সাত দিনও হয়নি রাজ্যে এই সরকারের বয়স। ইতিমধ্যে কেন্দ্রের সব প্রকল্পে পুরোমাত্রায় অর্থ সাহায্যের প্রতিশ্রুতি মিলতে শুরু করেছে দিল্লির তরফে। বড়ো শিল্প স্থাপনে পুঁজির বিনিয়োগ টানতে কেন্দ্রের নড়াচড়া শুরু হয়েছে। সীমান্তে অনুপ্রবেশ আটকাতে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার জন্য বিএসএফকে জমি হস্তান্তর, রেললাইন ও জাতীয় সড়ক সম্প্রসারণের জন্য সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রীয় মন্ত্রকগুলিকে জমি দেওয়ার ঘোষণায় কেন্দ্র-রাজ্যের মধ্যে চেনা বৈরিতার ছবিটা আস্তে আস্তে মুছতে শুরু করেছে। ভোটের প্রচারে দেওয়া বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি রক্ষায় বিপুল অর্থের প্রয়োজন। রাজ্যের সামগ্রিক উন্নয়নের প্রাথমিক হিসাবে পরিকাঠামো উন্নয়নেও প্রয়োজন বহু শত কোটি টাকা। আসলে রাজ্যের আর্থিক স্বাস্থ্য ততটা ভালো নয়। এই অবস্থায় অন্ধ্রপ্রদেশ, ওড়িশা, বিহারের মতো পশ্চিমবঙ্গও যাতে বিশেষ আর্থিক প্যাকেজ পেতে পারে, তার জন্য দিল্লিতে দরবার করা শুরু হয়েছে রাজ্যের তরফে। এতেও ইতিবাচক ফলের আশা করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে অন্যান্য ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকারের রাজ্য নিয়ে বহু অভিযোগ উঠলেও পশ্চিমবঙ্গে কেন্দ্রের সহায়তায় সুফল মিলবে, বঞ্চনার অভিযোগকে ঠান্ডা ঘরে পাঠিয়ে, কেন্দ্র-রাজ্যের বিতর্ককে পিছনে ফেলে বাংলার উন্নয়নের রথ এগবে—এই আশা তো করাই যায়। কারণ এ তো ‘মোদির গ্যারান্টি।’