


রাজনীতির ওঠাপড়া, হিমাংশু সিংহ: এই রাজা আসে, ওই রাজা যায়,জামা কাপড়ের রং বদলায়...দিন বদলায় না! কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
বদলের ঝড় যেমন ক্ষমতার ঝাঁপি উপুড় করে দেয় তেমনি মনে করিয়ে দেয় পুরানো ইতিহাসও। অতি সম্প্রতি পৈলানে দিলীপ মণ্ডলের বিশাল প্রাসাদ ও তার চারপাশের বাঘ-হরিণের স্ট্যাচু দিয়ে ঘেরা রিসর্টে পুলিশের হানাদারি মনে করিয়ে দিল একসময় লালগড়ে সিপিএমের অনুজ পান্ডের বাড়ি ঘিরেও এলাকাবাসীর এমনই ক্ষোভ-বিস্ফোরণের দৃশ্য? তফাতটা শুধু দেড় দশকের। মাঝে দু’বার শাসক বদলেছে, কিন্তু পরিবর্তনের ছবিটা অমলিন। এই হচ্ছে পালাবদলের শিক্ষা! প্রথমটায় একে ধরে ওকে ধরে। চার্জশিট, গ্রেপ্তারি, অফিসার বদল। এক পতাকা নামিয়ে অন্য পতাকা ওড়ে সগৌরবে। কিন্তু সময় এতই বলবান যে লাল নীল গেরুয়ার বহমান মেলায় রাজা একটু পুরানো হলেই একই অভিযোগ ফিরে ফিরে আসে।
এগারো সালে বাম শাসনের অবসানের পর পালা করে জেলায় জেলায় কঙ্কাল খুঁজে পাওয়া এখনও স্মৃতিতে টাটকা। হলদিয়ার বেতাজ বাদশার গ্রেপ্তারি, ভোট লুটের খতিয়ানও কেউ ভোলেনি। ‘পাওয়ার করাপ্টস অ্যান্ড অ্যাবসোলিউট পাওয়ার করাপ্টস অ্যাবসোলিউটলি।’ ক্ষমতার এই সংক্রামক অসুখ থেকে নিস্তার নেই কারও! বদলের দিনে যাঁরা
মহীয়ান, নটেগাছটা মুড়োলেই তাঁদের গ্রহণযোগ্যতাও কমে সময়ের ব্যারোমিটারে। একেই বোধহয় বলে ‘ল অব ডিমিনিশিং রিটার্ন’! সেদিনের সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আজও একইরকম আছে, খুব একটা দিন
বদলায়নি সেখানকার একজন মানুষেরও! মধ্যিখানে বদলে গিয়েছে দু’দুটো সরকার। সময়ের দাবি মেনেই লাল, নীল গিয়ে বাংলার মসনদ আজ গেরুয়ায় উদ্ভাসিত। ভয় কাটিয়ে নতুন করে বেঁচেবর্তে থাকার স্বপ্ন সফল হতেই হবে। রং নয়, দল নয়, নয় কোনো সম্প্রদায়, সবার উপরে শিল্প, কর্মসংস্থান, শিক্ষা আজ জরুরি, আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার স্বার্থেই। এইখানেই নতুন সরকারের বিশাল দায়িত্ব।
ইতিহাসে পরিবর্তনের রং চিরদিনই এক। যেকোনো সম্পর্কের লাজুক পয়লা দিন থেকে নতুন সরকারের চিরকুমার নায়কের যাত্রাপথের আবেগ খুব একটা ভিন্ন হয় না। আস্থা, নির্ভরতা এবং দু-তরফেরই ভয়মুক্ত যাপনই এই চলার অন্তরঙ্গ অনুষঙ্গ। ষোলোআনা আশা প্রত্যাশায় ভরা। সময় যত এগোয় ক্ষমতার বিষ্ঠা গায়ে চেপে বসে। পুরানো মলিনতা, নীতিভ্রষ্ট হয়ে পড়ার ক্লেদ বিসর্জন দিতেই বারবার বদলের আহ্বান। প্রায় ৫০ বছর আগে সংবিধানকে ঘুম পাড়িয়ে জরুরি অবস্থার ঘৃণ্য অত্যাচার, বাংলার বুকে সিদ্ধার্থবাবুদের বাড়াবাড়ি, বাহাত্তরের নৃশংস নির্বাচন, সংবাদপত্রের উপর দমনপীড়নের বিরুদ্ধে বজ্রনির্ঘোষ প্রতিবাদই বামেদের রাতারাতি শাসন ক্ষমতায় এনেছিল। বাংলার আকাশে-বাতাসে একটাই ধ্বনির প্রতিধ্বনি শোনা গিয়েছিল, এই সরকারটা গরিব শ্রমিক, সর্বহারা কৃষক, খেটেখাওয়া মানুষের শৃঙ্খলমোচনের হাতিয়ার। সেদিন মহাকরণের সামনে মানুষের ক্ষমতায়নের উচ্ছ্বাস বাঁধ ভেঙেছিল। ক্ষমতার অলিন্দে জ্যোতিবাবুর ধবধবে সাদা ধুতি আর বিলিতি বাঙালিয়ানার মডেলে বুঁদ ছিল বাঙালি। দোসর প্রমোদ দাশগুপ্তর সাংগঠনিক শক্তি। ধন্যি ধন্যি পড়ে গিয়েছিল রাজ্যজুড়ে। আশা ছিল, মালিকশ্রেণি, পুঁজিপতিদের একাধিপত্যের দিন শেষ। ভোটবাজারে কত কথাই তো বলা হয়, তার কত শতাংশ শেষপর্যন্ত জনগণের দরজায় কাজ হয়ে পৌঁছায়। পাঁচ, দশ, পনেরো বছর পর প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার বিষম মার সব কেড়ে নেয়, শুষে নেয় জনমোহিনী ক্ষমতা। ৩৪ বছর শাসন করেও ঘামে ভেজা মানুষের ক্ষমতায়নের স্বপ্নপূরণ করতে ব্যর্থ বামেরা। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখোপাধ্যায়, প্রফুল্ল সেনদের তুলনায় বহু লোকাল-জোনাল কমিটির নেতার ফুলেফেঁপে কলাগাছ হওয়া, কামানেওয়ালা ট্রেড ইউনিয়ন নেতার দাপাদাপিতে সন্ত্রস্ত ব্যবসায়ীরা পুঁজি গুটিয়ে পাড়ি দিয়েছেন ভিনরাজ্যে। সেই থেকেই বাংলা শিল্প-শ্মশান। বাধ্য হয়ে বাঙালি মেধার পলায়ন ঘটেছে মুম্বই, হায়দরাবাদ, পুনে পেরিয়ে বিদেশের মাটিতে। অন্ধকারে ডুবে গিয়েছে জি টি রোড, বাংলার ‘শেফিল্ড’, বি টি রোডের বিস্তীর্ণ দু’ধার। ক্ষমতার বিষম অসুখেই ধীরে ধীরে বামেরা সাধারণ মানুষের থেকে দূরে সরতে সরতে আজ কখনো শূন্য আবার কখনো বা চাঁদের কলঙ্ক কাটিয়ে মহামূল্যবান একের আশ্চর্য দোলাচলে। মানুষের দারিদ্র ঘুচল না অথচ ট্রেড ইউনিয়ন নেতাদের বিশাল অট্টালিকায় ভ্রূ কুঁচকে গেল সাধারণ মানুষের। নন্দীগ্রাম, সিঙ্গুর, নেতাই... বামেদের মহাপতন। বুদ্ধদেববাবুর মতো পক্বকেশ নিপাট সজ্জন ভদ্রলোকও ক্ষমতার দম্ভে বলে ফেলেছিলেন, আমরা ২৩৫ আর ওরা...। শাসকের এই দুরারোগ্য ক্যানসারের নিরাময় ভগবানেরও অসাধ্য!
৩৪ বছরের বাম অচলায়তন কাটিয়ে মমতা যেদিন রাজভবন থেকে পায়ে হেঁটে রাইটার্সের পথে গিয়েছিলেন সেদিনটাও ছিল বাংলা ও বাঙালির ইতিহাসে পালাবদলের আর এক শুভক্ষণ। সেদিনের উন্মাদনাও সহজে ভোলার নয়। বাংলার অধিকাংশ মানুষই একটা ভালো কিছু হবে, এই উপলব্ধি নিয়েই সেদিন নিঃশ্বাস নিয়েছিলেন ঠিক সাতাত্তরের মতো। ৫০ বছর আগে ছিল বামেরাই হাল ফেরাবে। আর ১৫ বছর আগে মানুষের স্থির বিশ্বাস কেন্দ্রীভূত হল একটি বিন্দুতে, ‘কালীঘাটের মেয়েটাই পারবে’। ওই যে বললাম নিষ্ঠুর সময়ের টানাপোড়েনে পুরানো সম্পর্কের মতোই বিশ্বাসও ক্রমশ ফিকে হয়। ভরসা এবং আশ্রয়ের ছাদফুটো হয়ে বৃষ্টির জল চুঁইয়ে পড়ে বারো ঘর উঠানে। ২৬ হাজার শিক্ষকের চাকরি হারানো, টাকার বিনিময়ে পুরসভার চাকরি বিক্রির অন্যায়। আর জি কর কাণ্ড। শূন্য পাওয়া ওএমআর শিটের প্রার্থীদের জাদুবলে সফল তালিকায় অর্ন্তভুক্ত করার চক্রকে খোলাছুট? পাড়ায় পাড়ায় নেতাদের তোলাবাজি, সিন্ডিকেট। আবার প্রমাণ হল কোনো শাসকই ইতিহাসে চিরস্থায়ী নয়। ক্ষমতার ভূত মাথায় চেপে বসলেই ভয় দেখিয়ে জনসমর্থন আদায়ের প্রতিযোগিতা শুরু হয় সুদূর হাতরাস থেকে ফলতায় একই কায়দায়। ছাব্বিশের বদলে ভূমিষ্ঠ হয়েছে যে নবজাতক এখনও বয়সে সে নিতান্তই শিশু। জন্মের পর মাসও ঘোরেনি। সব শিশুর মধ্যেই যেমন আকাশভরা সম্ভাবনা তেমনি সময় মতো ভ্যাকসিন না দিলে, স্বাস্থ্যে নজর না দিলে নানারকম রোগে দুর্বল হওয়ার আশঙ্কাও থেকে যায়। যে যখন আসে বিজয়কেতন উড়িয়েই আসে। এ শিশুর কাছেও প্রচুর প্রত্যাশা। আশা কাঁথির অধিকারী পরিবারের রাজপুত্র শুভেন্দুকে ঘিরেও।
সব বদলই ‘নিঃশব্দ বিপ্লব’ হয়ে থেকে যায় ইতিহাসে। এগারোর চুপচাপ ফুলে ছাপের কনভিকশনই ১৫ বছর পর কোন মন্ত্রে বদলে গেল পদ্মের অভিযাত্রায় তা বলতে পারবে একমাত্র জনতা জনার্দনই। সোনার বাংলার স্বপ্নে বাঙালি আজ বিভোর। দুর্নীতি থাকবে না। নেতারা টাকার বিনিময়ে গরিবকে ঠকাবে না। দেদার বেসরকারি পুঁজি আসবে। গঙ্গার দুপারে ঝিমিয়ে পড়া বিস্তীর্ণ উপত্যকায় শিল্পায়নের জোয়ার না হোক মানুষ খেয়ে পড়ে বাঁচবে। সবার হাতে কাজ। জমজমাট সিঙ্গুর, পূর্ব মেদিনীপুর, আসানসোল-দুর্গাপুর এবং পাহাড় জঙ্গলে ঘেরা সম্ভাবনাময় উত্তরবঙ্গ। এখানেই কাজ পাবে বাঙালি তরুণ তরুণী। বিনা অনুমতিতে বহুতল উঠবে না অসৎ চক্রের ফাঁসে। অসৎ পথে গেলেই প্রোমোটারের টুঁটি চেপে ধরবে সরকার। কোনো অবস্থাতেই সততার সঙ্গে আপস নয়। শমীক ভট্টাচার্য এবং শুভেন্দু অধিকারীরা এই অঙ্কটা মিলিয়ে দিতে পারলেই পাঁচবছর পরও প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার ভুলভুলাইয়ায় কিছুতেই হারিয়ে যাবে না ইভিএমের অভূতপূর্ব জনসমর্থন। মাথা তুলতে পারবে না কোনো জাহাঙ্গির-শওকতরা।
ট্র্যাজেডিটা এইখানেই। স্বপ্ন এবং বাস্তব সবসময় মেলে না। সিনেমা ও রাজনীতির প্লটও এক সরলরেখায় চলতে চলতে কখন যেন বদলে যায়। কিন্তু এই আর্থসামাজিক পরিবেশে কাজটা যে কঠিন, তা বোধ করি শমীকবাবুদের অজানা নয়। অজানা নয় দিল্লির পোড়-খাওয়া নেতৃত্বেরও। যদি সব ভাতা বজায় রেখে দ্বিগুণ হয় অন্নপূর্ণা, রাজকোষে তার
চাপ পড়বে কতখানি? লেখা যতটা সহজ, ইস্তাহারে বেঁধে দেওয়া টার্গেট বাস্তবে করে দেখানো ততোধিক কঠিন। ক্ষমতার বাসরঘরের ছিদ্র দিয়ে ঢুকে পড়া বিষধরে তাই লখিন্দরের মতো নেতারা বারেবারে পরাজিত হন। ২০০৬ সালে ২৩৫ পেয়ে
বুদ্ধবাবু নিজেকে অপরাজেয় ভেবেছিলেন। এগারো সালে অষ্টম বামফ্রন্ট সরকার গড়ার স্বপ্ন সফল হয়নি। দু’দিন আগে মমতাও ভাবতে পারেননি তাঁর সাজানো বাগান এভাবে শুকিয়ে যাবে। নির্মম ইতিহাস কিন্তু কোনো একটা বিন্দুতে দাঁড়িয়ে
থাকে না। আজকের সাফল্য, বিজয়োল্লাস কাল অতীত। ২০৩১, ২০৩৬, ২০৪১...ইতিহাস কিন্তু বদলের উপাদান খুঁজেই চলে প্রতিনিয়ত। প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা কিন্তু কোনো শাসককেই আজ পর্যন্ত ছেড়ে কথা বলেনি। বলবেও না। চরৈবেতি চরৈবেতি...। আমি নয়, আমরা। সংকীর্ণ স্বার্থ নয়, সব মত ও পথের কাজে নিয়োজিত এবং অনুপ্রেরণা নয়, মানুষের জন্য সমর্পিত।
ক্ষমতার নেশা এই সত্যটাকেই বারবার ভুলিয়ে দেয়। যেমন ধূমকেতুর মতো ক্ষমতা আসে, তেমনি একদিন হাত থেকে বেরিয়েও যায়। বলবান সময় কোনো শাসককেই রেয়াত করতে রাজি নয়। শুভেন্দুবাবু যদি এই ধারণার বদল ঘটাতে পারেন তবে বাঙালির ইতিহাস তাঁকে আরও বড়ো আসন দেবে। আমরাও সেই দিকেই তাকিয়ে।