Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ভ্যানিশ!

ভ্যানিশ!
  • ২৭ জুলাই, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সময়টা আশির দশক। এক অমাবস্যার রাতে আমেরিকার ‘স্ট্যাচু অব লিবার্টি’ অদৃশ্য করে বিশ্বে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন মার্কিন জাদুকর ডেভিড কপারফিল্ড। আর এক বঙ্গসন্তান আবার হাজারও চোখের সামনে আস্ত একটি ট্রেন, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল এবং আগ্রার তাজমহল উধাও করে দিয়েছিলেন। তাঁর নাম পি সি সরকার। এ সবই ছিল আসলে ‘ইন্দ্রজাল’, একবারেই সত্যি ঘটনা নয়। এমনই আরও একটা দিন ছিল শুক্রবার। তৃণমূলের রাজ্যসভার এক সাংসদের একগুচ্ছ প্রশ্নের জবাবে কেন্দ্রীয় গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রী লিখিতভাবে যে উত্তর দিলেন, তা ম্যাজিকের মতো মনে হলেও ঘোর বাস্তব। দেশজুড়ে একশো দিনের কাজে রাজ্যগুলির জন্য বরাদ্দ ও বকেয়ার যে তালিকা দিয়েছেন মন্ত্রী, তাতে দেখা গেল পশ্চিমবঙ্গের নামই নেই! ম্যাজিকের ভাষায়, একেবারে ভ্যানিস! এই নিয়ে কোনও সংশয় নেই যে দেশের বিরোধীশাসিত রাজ্যগুলিকে নানাভাবে হেনস্তা করতে কেন্দ্রের মোদি সরকার নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের প্রধান অস্ত্র হল রাজ্যগুলিকে তার ন্যায্য প্রাপ্য থেকে ধারাবাহিকভাবে বঞ্চনা করে যাওয়া। এবং এই বঞ্চনার তালিকায় যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার দিল্লির এক নম্বর টার্গেট তা বিভিন্ন সরকারি তথ্যেই দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। কিন্তু তাই বলে বকেয়া ও প্রাপ্তির রাজ্যওয়াড়ি তালিকায় পশ্চিমবঙ্গের নামই থাকবে না! এই অসহনীয় বিষয়টা সম্ভব করে দেখাল মোদি সরকার। তৃণমূল অবশ্য আগামী সপ্তাহেই এই ‘ভ্যানিসে’র অর্থ ও কারণ জানতে চাইবে বলে ঠিক করেছে।

Advertisement

মূলত একশো দিনের কাজ, গ্রামীণ আবাস যোজনার মতো কেন্দ্রীয় প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দ করা নিয়ে গত সাড়ে তিন বছর ধরে কেন্দ্র-রাজ্যের বিরোধ তুঙ্গে উঠেছে। দুর্নীতির দোহাই দিয়ে গত ২০২২-২৩ অর্থবর্ষ থেকে ১০০ দিনের কাজ এবং তার পরের বছর থেকে গ্রামীণ আবাস যোজনায় বাংলাকে কানাকড়িও দেয়নি কেন্দ্রীয় সরকার। যে দুর্নীতি বা ভুয়ো জব কার্ড তৈরি করে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ তুলেছে কেন্দ্র, তাতে দেখা যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে কয়েক যোজন এগিয়ে রয়েছে বিজেপি শাসিত উত্তরপ্রদেশ। যেমন, গত অর্থবর্ষে উত্তরপ্রদেশে ভুয়ো জব কার্ড পাওয়া গিয়েছে সাড়ে ৩ হাজার। আর পশ্চিমবঙ্গে মাত্র ২টি। তবু বাংলা টাকা পাচ্ছে না, উত্তরপ্রদেশে টাকা দেওয়া একদিনের জন্যও বন্ধ হয়নি। এই নির্লজ্জ বৈষম্য ও বঞ্চনা চলছেই। গরিব মানুষের স্বার্থরক্ষায় সম্প্রতি কলকাতা হাইকোর্ট ১ আগস্ট থেকে ১০০ দিনের প্রকল্পের টাকা বাংলাকে দিতে কেন্দ্রকে নির্দেশ দিয়েছে। যদিও গরিব মানুষের জন্য এই প্রকল্প দুটিই চালু রাখতে রাজ্য সরকার নিজের তহবিল থেকে টাকা দিচ্ছে। একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থায় কেন্দ্রের তরফে এই অনাচার, বঞ্চনা, বৈষম্য কতদিন, কীভাবে চলতে পারে, তা নিয়ে জোরালো প্রশ্ন উঠেছে। কিন্তু এই বিতর্কের মধ্যেই ১০০ দিনের প্রকল্পের তালিকা থেকে পশ্চিমবঙ্গের নামটাই মুছে দেওয়ার পিছনে নতুন চক্রান্তের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। ব্রাত্য সেই বাংলাই!
প্রশ্ন ছিল, ১০০ দিনের কাজ বা মনরেগা প্রকল্পে ২০২২ সাল থেকে রাজ্যগুলির বরাদ্দ ও বকেয়া কত? কেন্দ্রের গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান চার পাতার লিখিত উত্তরে রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল মিলিয়ে ৩৩টি রাজ্যের বকেয়ার বিস্তারিত খতিয়ান দেন। তাতেই দেখা যায়, পশ্চিমবঙ্গের নামই নেই! প্রশ্ন উঠেছে, যে রাজ্যের ক্ষেত্রে প্রকল্পের বকেয়া নিয়ে গত তিন বছর ধরে রীতিমতো ‘যুদ্ধ’ চলছে কেন্দ্র-রাজ্যের মধ্যে, যে রাজ্যে ১০০ দিনের কাজ দেখতে বারবার কেন্দ্রীয় প্রতিনিধিদল ঘুরে গিয়েছে, যে প্রকল্প নিয়ে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী একাধিকবার চিঠি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীকে, যে প্রকল্পের প্রাপ্য বকেয়া চেয়ে দিল্লিতে আন্দোলন, ধর্না হয়েছে, যে প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগে টাকা বন্ধের কথা জানিয়ে বারবার বিবৃতি দিয়েছেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সেই ১০০ দিনের কাজ প্রকল্পে কী করে সেই রাজ্যের নামটাই কাটা পড়তে পারে! তবে কি আদালতের নির্দেশ কার্যকর করা এড়াতেই কেন্দ্রের এই নতুন কৌশল? নাকি রাজ্যে বিধানসভা ভোট আসছে বলে মমতা সরকারের উপর চাপ বাড়াতে নজিরবিহীন এই পদক্ষেপ করল কেন্দ্র? উদ্দেশ্য যাই হোক, এর স্পষ্ট উত্তর চায় রাজ্যবাসী। জানতে চায়, কেন গরিবের পেটে লাথি মারার কৌশল নেওয়া হচ্ছে? কেন বাদ পড়ল পশ্চিমবঙ্গের নাম?

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ