Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বৈধী ভক্তি

জ্ঞান-মিশ্রা ভক্তিতে ঈশ্বর যেমন অনন্ত, তাঁহার নাম রূপ ও ভাব এবং তাঁহাকে লাভ করিবার উপায়ও তেমন অসংখ্য।

বৈধী ভক্তি
  • ২৩ এপ্রিল, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

জ্ঞান-মিশ্রা ভক্তিতে ঈশ্বর যেমন অনন্ত, তাঁহার নাম রূপ ও ভাব এবং তাঁহাকে লাভ করিবার উপায়ও তেমন অসংখ্য। ভক্ত কূপমণ্ডুকের ন্যায় অনন্তভাবময় ভগবান্‌কে কোন বিষয়ে শান্ত করেন না। তাঁহার মতে ইহা অভক্তের লক্ষণ। হিন্দুধর্মের উৎস বেদে আছে, ‘ঈশ্বর এক হইয়াও বহু রূপ।’ ঈশ্বরকে লাভ করিবার বহু উপায় আছে এবং সকল উপায়ই সত্য। 

Advertisement

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলিয়াছেন, ‘‘যে যেভাবে আমার উপাসনা করে, আমি সেই ভাবেই তাহাকে কৃপা করি। হে পার্থ, মনুষ্যগণ সর্বপ্রকারে আমার পথেরই অনুসরণ করে। যাহারা ইন্দ্রাদি দেবতার উপাসক, তাহারাও আমারই ভজনমার্গ অনুবর্তন করে; কারণ, ইন্দ্রাদি রূপেও আমিই উপাস্য।’’ এই কারণে ভক্ত বিশ্বাস করেন যে, বিভিন্ন নদীসমূহ যেমন একই সমুদ্রগামী, বিভিন্ন ধর্ম তেমন একই ঈশ্বর লাভের বিভিন্ন পথ। 
ভক্ত ভগবানের কোন নাম রূপ বা ভাব এবং তাঁহাকে লাভ করিবার কোন উপায়ের প্রতি অবস্থা প্রকাশ করেন না। তবে, কোন মানুষের পক্ষেই অনন্ত ঈশ্বরকে অনন্ত নামে, অনন্ত রূপে, অনন্ত ভাবে, অনন্ত পথে একই সময়ে উপাসনা করা সম্ভব নয়। কারণ, মানুষ তাহার একটি মনকে সমকালে একাধিক বিষয়ে নিযুক্ত করিতে সম্পূর্ণ অসমর্থ। এই জন্য অভিজ্ঞ গুরু প্রত্যেক শিষ্যের প্রকৃতি অনুযায়ী এক দেবতা বা একজন অবতার এবং তাঁহাকে লাভ করিবার একটি মাত্র পথ নির্দেশ করেন। ভক্ত-সাধক গুরুর নির্দেশ অনুসারে তাঁহার সমগ্র শক্তি এক লক্ষ্যে নিয়োজিত করিয়া সাধন-সমুদ্রে নিমগ্ন হন। শ্রীরামকৃষ্ণদেব বলিয়াছেন, ‘‘সমুদ্রে এক রকম ঝিনুক আছে, তারা সর্বদা হাঁ করে জলের উপর ভাসে; কিন্তু স্বাতি নক্ষত্রের এক ফোঁটা জল মুখে পড়লে তারা মুখ বন্ধ করে একেবারে জলের নীচে চলে যায়, আর ওপরে আসে না। তত্ত্বপিপাসু বিশ্বাসী সাধকও সেই রকম গুরুমন্তরূপ এক ফোঁটা জল পেয়ে সাধনার অগাধ জলে একেবারে ডুবে যায়, আর অন্য দিকে চেয়ে দেখে না।’ ভক্তিশাস্ত্রে ইহারই নাম অব্যভিচারিণী ভক্তি। ইহার অর্থ—বিভিন্ন সম্প্রদায়ভুক্ত বিভিন্ন শ্রেণীর ভক্তের বিভিন্ন ইষ্ট এবং তাঁহাদিগকে লাভ করিবার বিভিন্ন প্রণালীর প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করিয়া কেবল স্বীয় ইষ্ট ও স্বীয় সাধন-প্রণালীর প্রতি শ্রদ্ধাসম্পন্ন হওয়া নয়। পরন্তু, আপনার ইষ্ট ও আপনার প্রণালীর প্রতি অত্যন্ত নিষ্ঠাযুক্ত থাকিয়াও অপরের ইষ্ট ও সাধন প্রণালীর প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধা প্রদর্শনই ইহার তাৎপর্য। ইহা কিরূপে সম্ভব তাহা বুঝাইতে যাইয়া শ্রীরামকৃষ্ণদেব বলিয়াছেন, ‘‘কি রকম জান? যেমন বাড়ীর বউ! দেওর, ভাসুর, স্বামী, সকলের সেবা করে, পা ধোবার জল দেয়, গামছা দেয়, পিঁড়ে পেতে দেয়, কিন্তু এক স্বামীর সঙ্গেই তার অন্য রকম সম্বন্ধ।’’ অন্যত্র তিনি বলিয়াছেন, ‘যশোদাকে উদ্ধব বললেন, ‘মা! তোমার কৃষ্ণ সাক্ষাৎ ভগবান্‌, তিনি জগৎ-চিন্তামণি, তিনি সামান্য নন।’ যশোদা বললেন, ‘ওরে, তোদের চিন্তামণি নয়, আমার গোপাল কেমন আছে জিজ্ঞাসা করছি।—চিন্তামণি না, আমার গোপাল।’’
স্বামী সুন্দরানন্দের ‘যোগচতুষ্টয়’ থেকে

সম্পর্কিত সংবাদ