মৃণালকান্তি দাস: শুরু হয়েছিল সেই ২৮ ফেব্রুয়ারি। প্রায় সাড়ে তিন মাসের যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে সমঝোতা। মিটতে চলেছে ১০৮ দিনের যুদ্ধ-উত্তেজনা। যুদ্ধ যে এত দিন চলবে, তা শুরুতে অনুমান করতে পারেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুরুর দিকে তিনি বলেছিলেন, তিন-চার সপ্তাহেই যুদ্ধ মিটে যাবে। হয়নি। পরিণতিতে আমেরিকা-ইরান সংঘর্ষ নাড়িয়ে দিয়েছে গোটা বিশ্বকে। হরমুজে ‘অবরোধ’-এর প্রভাব পড়েছে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে। ভারতও তার ব্যতিক্রম নয়।যুদ্ধের দগদগে ক্ষত বুকে নিয়ে শেষ পর্যন্ত শান্তিচুক্তির পথে হাঁটতে চলেছে আমেরিকা এবং ইরান। দু’দেশের মধ্যে মউ স্বাক্ষরিত হয়েছে। তাতে সই রয়েছে ট্রাম্প, ভ্যান্স এবং ইরানি পার্লামেন্টের স্পিকার মুহাম্মদ বাঘেই গালিবাফের। তবে দেড় পৃষ্ঠার চূড়ান্ত চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হবে আগামীকাল। শুক্রবার। স্বাভাবিকভাবেই এই চুক্তিকে ‘ট্রাম্পের বিশ্বাসঘাতকতা’র চোখেই দেখছে ইজরায়েল। তার প্রতিফলন হিব্রু দৈনিক ‘ইয়েদিওত আহরোনত’-এর শিরোনামে: ‘বাজে চুক্তি’। এই চুক্তি যে ইজরায়েল মানবে না তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট নেতানিয়াহু।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরুর দিন ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ইরানের সামরিক শক্তি নির্মূল করে দেবেন তাঁরা। পরমাণু প্রকল্প বন্ধ করে দেবেন। সে দেশের ধর্মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ভেঙে ফেলা হবে। সেখানকার মানুষ প্রকৃত স্বাধীনতার স্বাদ পাবেন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার এক সপ্তাহ পরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করেছিলেন, চুক্তি করার জন্য ইরানের সামনে একটাই পথ— ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’। ট্রাম্প আসলে সেই সময় হরমুজের জল মাপতে ভুল করেছিলেন। সেখানে গিয়ে যে এমন করে ‘হাবুডুবু’ খেতে হবে, বোঝেননি ট্রাম্প।
প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, তিন মাস আগে যে লক্ষ্যে ইরানে হামলা শুরু করেছিল আমেরিকা-ইজরায়েল, তা কি পূরণ হল? ইরান কি বন্ধ করে দেবে তাদের পরমাণু প্রকল্প? মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে যে মউ স্বাক্ষরিত হয়েছে, তার অন্যতম মূল স্তম্ভই হল পরমাণু বিষয়ক। আর সেই মউ-এই উল্লেখ করা হয়েছে, শুধু উল্লেখ করাই নয়, ইরানও সম্মত হয়েছে, তারা পরমাণু পর্যবেক্ষকদের প্রবেশের অনুমতি দেবে। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি কোন পর্যায়ে দাঁড়িয়ে, তাদের হাতে থাকা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামই বা কোথায়, তা খতিয়ে দেখবে।
ইরানের সংবাদসংস্থা ‘মেহর’ জানিয়েছে, চুক্তির খসড়ায় ১৪টি শর্তের কথা বলা হয়েছিল। ১) লেবানন-সহ পশ্চিম এশিয়ার সব প্রান্তে দ্রুত পাকাপাকি ভাবে যুদ্ধ বন্ধ করা হবে। ২) ইরানের সার্বভৌম ক্ষমতা এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাবে না আমেরিকা। ৩) ৩০ দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালীর নৌ অবরোধ তুলে নেবে আমেরিকা। ৪) ইরান এবং সে দেশের সংলগ্ন এলাকা থেকে আমেরিকা সেনা প্রত্যাহার করে নেবে। একইসঙ্গে ইরানের দাবি, অবিলম্বে লেবাননে ইজরাইলের হামলা বন্ধ করতে হবে। ৫) ইরানের ব্যবস্থাপনায় ৩০ দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল অবাধ এবং স্বাভাবিক করা হবে। তবে হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলির উপর নির্দিষ্ট কিছু ‘পরিষেবা’-র বিনিময়ে আপাতত ফি আরোপের সুবিধা আদায় করে নিয়েছে ইরান। একেবারে শেষ মুহূর্তে একটি সংশোধনীর মাধ্যমে এই সুবিধা আদায় করেছে তেহরান। এমনই দাবি, ইরানের আধা-সরকারি সংবাদসংস্থা ফার্স নিউজের। তবে কী ধরনের পরিষেবা দেওয়া হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। ৬) ইরানের তেল এবং জ্বালানি দ্রব্যের উপর যাবতীয় বিধিনিষেধ এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে। ৭) যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরান পুনর্গঠনের জন্য ৩০০ কোটি ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় ২৮ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি) দেবে আমেরিকা এবং সহযোগী দেশগুলি। যদিও তা খারিজ করে দিয়েছেন ট্রাম্প। ৮) ইরানের পরমাণু কর্মসূচির বিষয়ে আলোচনার জন্য ৬০ দিন ধরে আলোচনা করবে দুই দেশ। ৯) পরমাণু অস্ত্র প্রসার রোধ চুক্তি অনুসারে ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরি করার না-বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে। ১০) পরমাণু সংক্রান্ত বিষয়ে দুই দেশের আলোচনা চলার সময় আমেরিকা পশ্চিম এশিয়ায় অতিরিক্ত কোনো সামরিক বাহিনী মোতায়েন করবে না। ইরানের উপর নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করবে না। ১১) আলোচনা চলার সময় আমেরিকা ইরানের যে সম্পদ বাজেয়াপ্ত করেছে, তা ফিরিয়ে দেবে। জানা গিয়েছে, ইরানের দাবি, বাজেয়াপ্ত প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার অবিলম্বে ফেরত দিতে হবে। ১২) সমঝোতাপত্রে উল্লিখিত শর্তগুলি মানা হচ্ছে কি না, তা দেখতে একটি নজরদারি ব্যবস্থা রাখা হবে। ১৩) রাষ্ট্রসংঘে সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারক গোষ্ঠী নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবনা মেনেই চূড়ান্ত বোঝাপড়া করবে আমেরিকা এবং ইরান। ১৪) বাজেয়াপ্ত সম্পদ ইরানকে ফিরিয়ে দেওয়ার পর এবং তেহরানের তেল বিক্রির উপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পরেই চূড়ান্ত পর্যায়ের আলোচনা শুরু হবে। প্রাথমিক সমঝোতা চূড়ান্ত হওয়ার পর ইরানের পরমাণু সমৃদ্ধকরণ কিংবা ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হবে। যদিও চূড়ান্ত চুক্তি পত্রে কী আছে তা এখনও স্পষ্ট নয়।
তবে যুদ্ধ বন্ধের চুক্তিতে পৌঁছানো মাত্র নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘আমি হরমুজ প্রণালীকে সম্পূর্ণ টোলমুক্তভাবে চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করার অনুমতি দিচ্ছি। একইসঙ্গে মার্কিন নৌবাহিনীর অবরোধও অবিলম্বে তুলে নেওয়ার নির্দেশ দিচ্ছি। বিশ্বের জাহাজগুলি, তোমাদের ইঞ্জিন চালু করো। তেলের প্রবাহ চলুক।’ প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক— তবে কি ইরান যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গিয়েছে? ট্রাম্প ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে বলেছেন, ‘ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের কথা যদি বলেন, তবে আমি কখনোই শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন নিয়ে মাথা ঘামাইনি। বর্তমানে ইরানের তৃতীয় সারির নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে। আগের দুই স্তরের নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। যে দলটির সঙ্গে আলোচনা করছি, তাদের মধ্যে সবচেয়ে যুক্তিবাদী দল।’ ট্রাম্প ও তাঁর সমর্থকরা বলছেন, এই যুদ্ধের বড়ো সাফল্য— ইরানের শীর্ষ নেতাদের কয়েকটি স্তরকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া। এ ছাড়া ইরানের ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক কর্মসূচির আরও ক্ষতি করা এবং দেশটির প্রথাগত নৌবাহিনীকে নির্মূল করা হয়েছে। তাতেই সন্তুষ্ট ট্রাম্প।
তবে খুশি হয়নি ইজরায়েল! ইজরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রী ইতামার বেন-গাভিরের বক্তব্য, আন্তর্জাতিক কোনো সমঝোতার জন্য ইজরায়েল কখনো নিজের নিরাপত্তাকে অবহেলা করবে না। সমাজমাধ্যমে তিনি লেখেন, ‘ইজরায়েল কোনো দুর্বল রাষ্ট্র (ব্যানানা রিপাবলিক) নয়। ট্রাম্পের চুক্তি আমাদের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক নয়। ইজরায়েল আমেরিকার অন্তর্গত নয়। আমরা একটি স্বাধীন এবং সার্বভৌম রাষ্ট্র।’ এভাবে শান্তিচুক্তির বিরোধিতা করায় নেতানিয়াহু প্রসঙ্গে ক্ষুব্ধ ট্রাম্প বলেছেন, “উনি খুব জটিল প্রকৃতির মানুষ। সত্যি বলতে ওর আমাদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। কারণ, ইরানের কাছে যদি পারমাণবিক অস্ত্র থাকত, তা হলে ইজরায়েল দু’ঘণ্টাও টিকতে পারত না।”
আসলে আমেরিকা-ইরান শান্তিচুক্তি নেতানিয়াহুর জন্য ‘রাজনৈতিক দুঃস্বপ্ন’ হয়ে এসেছে— এই ভাষাতেই লিখেছেন বিবিসির পশ্চিম এশিয়ার প্রতিনিধি লুসি উইলিয়ামসন। এখন নেতানিয়াহুর সামনে যেসব পথ খোলা রয়েছে, সেসব তাঁর জন্য সুখের নয়। ইজরায়েলের বিরোধীদলের নেতা ইয়ার লাপিদ নেসেটে (পার্লামেন্ট) বলেছেন, পথ একটাই— হয় ইজরায়েলের সর্বশ্রেষ্ঠ মিত্রের (আমেরিকা) সঙ্গে সরাসরি ও ধ্বংসাত্মক বিরোধে যাওয়া, অথবা নতমস্তকে ইজরায়েলের স্বার্থগুলিকে বিসর্জন দেওয়া।
এবার কোন পথে যাবে তেল আবিব? এর উত্তরের অপেক্ষায় থাকতে চান না মার্কিন প্রেসিডেন্ট। আমেরিকার কাছে ইজরায়েল আপাতত ব্রাত্যই থাকবে, তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন ট্রাম্প! আর ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি ও ইতালি জানিয়ে দিয়েছে, চুক্তি হলে ইরানের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে তারাও। ইতিহাস ক্ষত-বিক্ষত হলেও ভবিষ্যৎ যে ইরানের পক্ষে তা নিশ্চিত করে দিয়েছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। ফক্স নিউজকে বলেছেন, ‘ইরানিরা যদি এই চুক্তি মেনে চলে, তবে এটাই আগামী ৫০ বছরের জন্য পশ্চিম এশিয়াকে মৌলিকভাবে বদলে দেবে।’