দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে দশহরা দিবসে ভক্ত পরিবৃত শ্রীরামকৃষ্ণ বলছেন, গুরুবাক্যে সুদৃঢ় বিশ্বাস যদি হয় তাহলে আর বেশী খাটতে হবে না। ব্যাসদেবের দৃষ্টান্ত দিয়ে বলছেন, গোপীদের কাছ থেকে তিনি সব খেলেন কিন্তু বলছেন, আমি যদি কিছু না খেয়ে থাকি তাহলে যমুনার জল দুভাগ হয়ে যাবে, আমরা পার হয়ে যাব। আর যমুনার জল দু ভাগ হয়েও গেল অর্থাৎ বিশ্বাসে অসম্ভব যা তা-ও সম্ভব হয়। ‘এই দৃঢ় বিশ্বাস। আমি না, হৃদয়মধ্যে নারায়ণ; তিনি খেয়েছেন’ অর্থাৎ আমি কর্তা নই, কর্তা ভোক্তা সব সেই ভগবান স্বয়ং। জীব অল্পবুদ্ধির জন্য নিজেদের কর্তা। ভোক্তা বলে মনে করে। জ্ঞানী দেখেন, ঈশ্বরই নিজে কর্ম করেন, আবার নিজেই তার ফল ভোগ করছেন।
উপনিষদ বলছেন, তিনি ছাড়া আর কেউ শ্রোতা নেই, আর কেউ মন্তা নেই ইত্যাদি। যা কিছু কর্ম ঘটছে, যা কিছু ভোগাদি হচ্ছে সমস্ত তাঁরই হচ্ছে আর কারো নয়। তাঁরই চৈতন্যে জগৎ চৈতন্যময়। সেই চৈতন্য অন্যত্র প্রতিফলিত হয়ে সেই বস্তুকে চেতন করছে। বেদান্তে একটি দৃষ্টান্ত দেওয়া হয়, একটি লোহা আগুনে গরম হয়েছে, গায়ে লাগলে মনে হয় লোহাটা পোড়াচ্ছে। আসলে লোহা তো পোড়ায় না, পোড়ায় লোহার ভিতরে যে আগুন আছে, যা আমরা দেখতে পাচ্ছি না। খালি লোহাটাকে দেখছি আর মনে করছি, সেই লোহাটাই পোড়াচ্ছে। সেই রকম কর্তৃত্বাদি যা কিছু হচ্ছে, জীবের দেহ মন দিয়ে যা কিছু ঘটছে, আমরা মনে করছি সেগুলি আমরা করছি কিন্তু আমাদের ভিতরে চৈতন্য শক্তি রয়েছে তার দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হয়ে সেগুলি ঘটছে। আমরা নিজেদের আর সেই চেতন্য শক্তি থেকে পৃথক করতে পারছি না। অথবা এই দেহাদি থেকে আমি নিজেকে পৃথক করে সেই চৈতন্য স্বরূপ বলে নিজেকে ভাবতে পারছি না। সুতরাং আমাদের ‘আমি কর্তা, আমি ভোক্তা’ এই ভ্রম হচ্ছে।
মনে রাখতে হবে, শাস্ত্রের বাক্য শুধু পড়লে, মুখস্থ করলে, হবে না, তাতে বিশ্বাস থাকা চাই। অনেক সময় মুখে বলি বা মনে করি, আমাদের ভগবানে বিশ্বাস আছে কিন্তু সত্যি সত্যি বিশ্বাস নেই, থাকলে আমাদের ব্যবহার সেই বিশ্বাসের অনুরূপ হোত। আমরা দুঃখে হাহাকার করি কেন বা সুখে নিজেকে হারিয়ে ফেলি কেন? তার কারণ আমি নিজেকে কর্তা, ভোক্তা বলে মনে করছি, তাই সুখ-দুঃখাদির দ্বারা অভিভূত হয়ে পড়ি। এর দ্বারাই প্রমাণিত হচ্ছে যে, আমরা মুখে বলি বটে ‘বিশ্বাস করি’ কিন্তু সত্যি সত্যি বিশ্বাস করি না। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, ‘নৈব কিঞ্চিং করোমীতি যুক্তো মন্যেত তত্ত্ববিৎ’ (৫।৮)-তত্ত্বজ্ঞ ব্যক্তি এই-রকমই জানবেন যে তিনি কিছুই করেন না। তিনি কর্মও করেন না, কর্মফল ভোগও করেন না। তিনি শুদ্ধ আত্মা, এই কথাগুলি কেবল আবৃত্তি করলেই হবে না, এতে দৃঢ় বিশ্বাস রাখতে হবে। এটি ধারণা করতে হবে। দৃষ্টান্ত স্বরূপ ঠাকুর চণ্ডাল-শঙ্করাচার্য এবং জড় ভরতের প্রসঙ্গ উল্লেখ করলেন।
স্বামী ভূতেশানন্দের ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত-প্রসঙ্গ’ থেকে