সুদীপ্ত রায়চৌধুরী: ‘মানুষের ইতিহাসে সবচেয়ে বড়ো ঘটনা।’ ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপকে এক লাইনে এভাবেই ব্যাখ্যা করেছিলেন ফিফা প্রেসিডেন্ট গিয়ান্নি ইনফান্তিনো। সংখ্যার বিচারে তাঁর দাবি নেহাত অমূলক নয়। এই প্রথমবার তিনটি দেশ—আমেরিকা, কানাডা ও মেক্সিকো যৌথভাবে বিশ্বকাপের আয়োজন করছে। অংশ নিচ্ছে ৪৮টি দল। ম্যাচের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১০৪। আয়তন, বাণিজ্যিক সম্ভাবনা এবং দর্শকসংখ্যার দিক থেকে দেখলে মনে হবে ইনফান্তিনো ঠিকই বলেছেন। এটা নিঃসন্দেহে ইতিহাসের বৃহত্তম বিশ্বকাপ।
তার পরেও এই বিশ্বকাপকে শুধুমাত্র ‘সবচেয়ে বড়ো’ বললে ভুল হবে। অথবা ঠিক পুরোটা বলা হবে না। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপকে ঘিরে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা হয়তো ফুটবলের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। যেখানে ফুটবলের পাশাপাশি আলোচনায় রয়েছে ট্রাম্পের অভিবাসন নীতি, ভিসা জটিলতা, আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি, নিরাপত্তা, পরিবেশ সংকট এবং বিশ্বকাপের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিকীকরণ।
ফুটবল ও রাজনীতি
খেলা ও রাজনীতিকে আলাদা রাখার কথা যুগে যুগে মহাজনেরা বলে গিয়েছেন। বাস্তবে তা কখনো সম্ভব হয়নি। ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ সেই বাস্তব চিত্রকে আরও একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। এই প্রথম এমন একটি বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যেখানে আয়োজক দেশ (আমেরিকা) এমন একটি দেশের (ইরান) সঙ্গে যুদ্ধে ব্যস্ত, যারা একই টুর্নামেন্টে অংশ নিচ্ছে। এই আগুনে ঘৃতাহুতি দিয়েছে ভিসা সমস্যা। দিনকয়েক আগেই ইরানের ফুটবল ফেডারেশনের তরফে জানানো হয়েছে, তাদের দেশের সমর্থকদের জন্য যে টিকিট ধার্য করা হয়েছিল, তা শেষ মুহূর্তে আচমকা বাতিল ঘোষণা করেছে ফিফা। তেহরানের দাবি, ফিফা টিকিট বাতিল করলেও কলকাঠি নেড়েছে আমেরিকাই। ইরান দলের বেসক্যাম্প স্থানান্তর থেকে শুরু করে ভিসা জটিলতা,কর্মকর্তা- সমর্থকদের প্রবেশাধিকার নিয়ে প্রশ্ন—সবই দেখিয়ে দিচ্ছে যে বিশ্বকাপ আর শুধুই ফুটবলে সীমাবদ্ধ নেই। তার গতিপথ নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নিরিখে। সোমালিয়ার রেফারি ওমর আরতানকে দেশে ফেরত পাঠানো নিয়েও জলঘোলা হয়েছে বিস্তর। ফিফা অবশ্য তার জন্য মার্কিন অভিবাসন নীতির দিকেই আঙুল তুলে দায় ঝেড়ে ফেলেছে। মার্কিন মুলুকের এই কঠোর মনোভাবের জন্য প্রশ্নের মুখে পড়েছে বিশ্বকাপের মৌলিক দর্শন—সবার জন্য উন্মুক্ততা। খেলোয়াড়রা মাঠে নামবেন, কিন্তু তাঁদের সমর্থকরা যদি স্টেডিয়ামে পৌঁছাতেই না পারেন, তাহলে প্রশ্নচিহ্নের মুখে পড়ে যাবে বিশ্বকাপের ‘বিশ্বজনীন’ ধারণা।
ট্রাম্প ফ্যাক্টর
২০২৬ সালের বিশ্বকাপে প্রতিযোগী দলগুলিকে আলোচনায় টেক্কা দিচ্ছেন একজনই—ডোনাল্ড ট্রাম্প। আমেরিকার স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তির আবহে আয়োজিত এই টুর্নামেন্ট মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসাবে ট্রাম্পের দ্বিতীয় ইনিংসের বড়ো টার্নিং পয়েন্ট হতে পারে। সেখানেই উঠছে বেশ কিছু প্রশ্ন। ফুটবল এমন একটি খেলা, যা সাধারণ মানুষের আবেগ। সেই আবেগকে রাজনৈতিক বার্তা ও রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি নির্মাণের কাজে ব্যবহার করার প্রবণতা নতুন নয়। অতীতে রাশিয়া ও কাতার বিশ্বকাপকে ঘিরে ‘স্পোর্টসওয়াশিং’-এর অভিযোগ উঠেছিল। এবারেও মানবাধিকার সংগঠনগুলি একই ধরনের আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। বিশেষত অভিবাসন নীতির কারণে আটক, সীমান্ত-নীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে।
ফিফার লাভ, সমর্থকদের ক্ষোভ
বিশ্বকাপের সঙ্গে ব্যবসা সবসময়ই জড়িত। কিন্তু এবার বাণিজ্যিকীকরণের মাত্রা নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। ফিফার মতে, ২০২৬ সালে তাদের আয় হবে প্রায় ৯০০ কোটি ডলার—যা বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে রেকর্ড। সম্প্রচার স্বত্ব, স্পনসরশিপ এবং টিকিট বিক্রি থেকে আসবে এই বিপুল অর্থ। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই অর্থের বোঝা বহন করছেন কারা? টিকিটের দাম নিয়ে শুরু থেকেই তীব্র সমালোচনা হয়েছে। সাধারণ সমর্থকদের নাগালের বাইরে চলে গিয়েছে বহু ম্যাচের টিকিট। চাহিদা অনুযায়ী মূল্য বাড়ানো বা ‘ডায়নামিক প্রাইসিং’ নিয়ে সরব হয়েছেন অনেকে। এর মধ্যেই ফিফার রি-সেল মার্কেটে ঢুকেছে ১ লক্ষ ৭৬ হাজার টিকিট। বলা হচ্ছে, দামের জন্যই এত টিকিট এখনও বিক্রি হয়নি। তাই আবার সেগুলি বিক্রির চেষ্টা করা হচ্ছে। আয়ের ঝুলি ভরাতে এবারে এক নতুন কৌশল নিয়েছে ফিফা। মাত্র (!) ৭৯ ডলার দিলেই ম্যাচের সময়ে জায়ান্ট স্ক্রিনে নিজের নাম তোলা যাবে। এসব দেখে এবারের বিশ্বকাপকে অনেকেই ‘এলিট’ বিশ্বকাপ বলে ডাকতেও শুরু করেছেন।
বাজার অর্থনীতির হাল
এই বিশ্বকাপ ঘিরে বিপুল পরিমাণ লাভের আশা করেছিল আমেরিকার হোটেল, এয়ারলাইন্স, রেস্তরাঁ এবং পর্যটন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত সংস্থাগুলি। সেই হিসাব ছিল অত্যন্ত সহজ—বেশি ম্যাচ, বেশি দল, বিপুল দর্শক, কোটি কোটি ডলারের লেনদেন। প্রাথমিক পূর্বাভাস ছিল, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যটকদের অনুপাত হবে প্রায় সমান সমান। কিন্তু বাস্তব চিত্রটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। সাম্প্রতিক সমীক্ষায় আমেরিকান হোটেল অ্যান্ড লজিং অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, প্রায় ৮০ শতাংশ হোটেলের বুকিং প্রত্যাশার তুলনায় অনেকটাই কম। ট্রাভেল ডেটা বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, আন্তর্জাতিক পর্যটকদের উপস্থিতি আশঙ্কাজনকভাবে কম। অধিকাংশ বুকিংই দেশীয় পর্যটকদের। যা চিন্তা বাড়িয়েছে ব্যবসায়ীদের। পর্যটন অর্থনীতির সাধারণ নিয়মে বলে—একজন আন্তর্জাতিক পর্যটক অভ্যন্তরীণ পর্যটকের তুলনায় গড়ে ৪-৫ গুণ বেশি অর্থ খরচ করেন। ইউএস ট্রাভেল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, একজন আন্তর্জাতিক পর্যটকের গড় খরচের অঙ্ক যেখানে ৫ হাজার ডলার ছাড়িয়ে যায়, সেখানে অভ্যন্তরীণ পর্যটকরা তার ধারেকাছেও থাকেন না। আন্তর্জাতিক দর্শকদের অনুপস্থিতি আয়োজক শহরগুলির প্রত্যাশিত আয়কে ব্যাপকভাবে কমিয়ে দিয়েছে। এর নেপথ্যে রয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতি, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, ভিসা পাওয়ার জটিলতার মতো বিষয়গুলি। শেষ মুহূর্তে ক্ষোভ সামাল দিতে প্রশাসন ৫০টি দেশের জন্য প্রযোজ্য ১৫,০০০ ডলারের ‘ভিসা বন্ড ডিপোজিট’ মকুব করে। বলা হয়, যাঁদের কাছে বিশ্বকাপের ম্যাচের টিকিট থাকবে, তাঁদের ক্ষেত্রে এই নিয়ম শিথিল হবে। কিন্তু ততক্ষণে অনেকটাই দেরি হয়ে গিয়েছিল। ভিসা ইন্টারভিউয়ের দীর্ঘ লাইনের কারণে হাজার হাজার ফুটবল ভক্ত সময়মতো তাঁদের ভিসা হাতে পাননি। অন্যদিকে, আমেরিকার সাধারণ মানুষও তেলের দাম বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সংক্রান্ত জটিলতার কারণে বিলাসবহুল ভ্রমণের বাজেট কাটছাঁট করতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে বিশ্বকাপে যে পরিমাণ ব্যবসা হওয়ার প্রত্যাশা ছিল, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
এয়ারলাইন্স হাব (ইউনাইটেড, আমেরিকান, সাউথওয়েস্ট এয়ারলাইন্স) হওয়ার কারণে এবং লাতিন আমেরিকার সঙ্গে ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক যোগসূত্রের কারণে ডালাস বা হিউস্টনের মতো শহরগুলি তুলনামূলকভাবে ভালো ব্যবসা করছে। সেখানে সিয়াটেলের মতো বড়ো আয়োজক শহরের অবস্থা শোচনীয়। সিয়াটেলে গত বছরের জুন মাসের তুলনায় এবার ফ্লাইট বুকিং প্রায় ২১ শতাংশ কমে গিয়েছে। এমনকি মেক্সিকোর তিনটি প্রধান আয়োজক শহরও গত বছরের তুলনায় অনেকটা পিছিয়ে।
বিশ্বকাপকে ঘিরে হোটেল শিল্প যে বিপুল লাভের আশা করেছিল, তাও এখনও অধরা। কারণ অনেক হোটেলই শুরুতে রুমের ভাড়া অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু প্রত্যাশা অনুযায়ী বুকিং না হওয়ায় দাম কমাতে বাধ্য হয়েছে। ফলেআগে বেশি দামে বুক করা গ্রাহকরা বুকিং বাতিল করে ফের কম দামে বুক করছেন। অন্যদিকে, তুলনামূলক কম খরচে পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে থাকার সুযোগ মেলায় চাহিদা বাড়ছে এয়ার-বিএনবি’র মতো স্বল্পমেয়াদি ভাড়ার প্ল্যাটফর্মগুলির। ফলে বিশ্বকাপের পর্যটন অর্থনীতির বড়ো অংশ ক্রমশ ঐতিহ্যবাহী হোটেল শিল্পের বাইরে চলে যাচ্ছে।
নিরাপত্তা ও মানবাধিকার
বিশ্বকাপের মতো এত বড়ো টুর্নামেন্ট আয়োজনের সঙ্গে নিরাপত্তা ঝুঁকিও বহুগুণ বেড়ে যায়। ১৬টি শহরে ১০৪টি ম্যাচ, লক্ষ লক্ষ দর্শক, অসংখ্য রাষ্ট্রপ্রধান-কূটনীতিক, আন্তর্জাতিক স্তরে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম—সব মিলিয়ে এবারের বিশ্বকাপ নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। পাশাপাশি, একাধিক মানবাধিকার সংগঠন জানিয়েছে, নিরাপত্তার নামে অতিরিক্ত নজরদারি, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক গোষ্ঠীগুলোর উপর চাপ বাড়তে পারে। বিশ্বকাপের জন্য কানসাস সিটির মতো কিছু শহরে গৃহহীন মানুষদের শহরের কেন্দ্র থেকে অন্যত্র সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
জলবায়ু সংকট
বিশ্বকাপে সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি উঠেছে পরিবেশ নিয়ে। ফিফা ২০৩০ সালের মধ্যে তাদের কার্বন নিঃসরণ ৫০ শতাংশ কমানো এবং ২০৪০ সালের মধ্যে নেট-জিরো লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছানোর দাবি করেছে। কিন্তু তিনটি দেশে ছড়িয়ে থাকা ১৬টি ভেন্যুতে ম্যাচ আয়োজনের ফলে প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে ফুটবল নিয়ামক সংস্থাকে। কারণ কার্বন ফুটপ্রিন্টের ৮০-৯০ শতাংশই আসে বিমান চলাচল থেকে। আর তিন দেশে ছড়িয়ে থাকা ভেন্যুগুলোর মধ্যে যাতায়াতের জন্য বিপুল বিমানযাত্রা প্রয়োজন হবে। ফলে আগের কয়েকটি বিশ্বকাপের তুলনায় কার্বন নিঃসরণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হবে।
ইতিবাচক দিক
এই বিশ্বকাপের দীর্ঘমেয়াদি লাভ লুকিয়ে রয়েছে শহরের স্থায়ী পরিকাঠামো উন্নয়নে। ডাউনটাউন ওমূল শহরের মধ্যে লাইট রেল ব্যবস্থা এবং সাইকেল ও হাইকিং ট্রেলের এক বিশাল নেটওয়ার্ক বা ‘গ্রিন করিডোর’ চালু করেছে হিউস্টন। অন্যদিকে, কানসাস সিটি গত ১৮ মে ১ মাইল দীর্ঘ স্ট্রিটকার এক্সটেনশন জনসাধারণের জন্য খুলে দিয়েছে।
শেষ কথা
ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে হয়তো এটিই সবচেয়ে বড়ো টুর্নামেন্ট। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটি স্মরণীয় হবে কোন কারণে—অসাধারণ ফুটবলের জন্য নাকি বিতর্কের জন্য? সেই উত্তরের অপেক্ষায় গোটা বিশ্ব।